দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংক ‘লোপাট’ ও অর্থ পাচারের প্রতিবাদে সচিবালয় অভিমুখে গণতন্ত্র মঞ্চের বিক্ষোভ কর্মসূচি পুলিশের লাঠিপেটায় পণ্ড হয়ে গেছে। গতকাল বুধবার দুপুরে গুলিস্তান জিরো পয়েন্টের কাছে এ ঘটনার সময় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয় মঞ্চের পক্ষ থেকে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গণতন্ত্র মঞ্চের নেতারা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সমবেত হন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংক ‘লোপাট’ ও অর্থ পাচারের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল শুরুর আগে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন তারা। দুপুর ১২টা ৪৭ মিনিটের দিকে সমাবেশ শেষে নেতাকর্মীরা মিছিল করে সচিবালয় অভিমুখে রওনা হন। নেতাকর্মীরা ‘দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়ছে কেন, শেখ হাসিনা জবাব চাই’, ‘জিনিসপত্রের দাম কমাতে হবে, কমাতে হবে’ স্লোগান দেন।
মিছিলের অগ্রভাগে মাহমুদুর রহমান মান্না, সাইফুল হক, জোনায়েদ সাকিসহ মঞ্চের কেন্দ্রীয় নেতারা ছিলেন। তোপখানা রোড দিয়ে মিছিলটি জিরো পয়েন্টের কাছে এলে সচিবালয়ের সড়কের মুখে পুলিশের ব্যারিকেডের মুখে পড়ে। সে সময় কয়েক মিনিট কর্মীদের সঙ্গে ব্যারিকেড নিয়ে ঠেলাঠেলি হয়। পরে কর্মীরা ব্যারিকেড সরিয়ে দিতে গেলে পুলিশের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানে চলে যান। একপর্যায়ে পুলিশ লাঠিপেটা করে কর্মীদের সরিয়ে দিতে চাইলে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে জুতা ছুড়ে মারতে থাকেন। এ সময় পুলিশ ব্যারিকেডের সামনে এসে এলোপাতাড়িভাবে লাঠিপেটা করে। এতে জোনায়েদ সাকিসহ বেশ কিছু কর্মী রাস্তায় পড়ে যান।
পরে মঞ্চের কর্মীরা জিরো পয়েন্টের কাছে বসানো তারকাঁটার ব্যারিকেড ভেঙে এগোতে চাইলে পুলিশ আবারও লাঠিপেটা করে। এতে গণতন্ত্রের মঞ্চের সমন্বয়ক ও গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকিসহ অন্তত ৫০ জন আহত হন।
বিক্ষোভ মিছিল পন্ড হওয়ার পর বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক জিরো পয়েন্টের সামনে আহত জোনায়েদ সাকিকে নিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘কেন উসকানি ছাড়া পুলিশ আমাদের বিক্ষোভে হামলা চালিয়েছে, লাঠিচার্জ করেছে, জোনায়েদ সাকিকে মারাত্মকভাবে আহত করেছে; এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। যে পুলিশ কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে এ হামলা হয়েছে, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার দাবি জানাচ্ছি। হামলা-আক্রমণ করে অতীতে কোনো স্বৈরাচার শেষ রক্ষা করতে পারেনি, বর্তমান ফ্যাসিবাদী ভোটবিহীন এ সরকারও পারবে না।’ সাকিসহ নেতাকর্মীদের হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
আহত জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘পুলিশকে নিরস্ত্র করার জন্য আমি সেখানে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আমার ওপর লাঠিচার্জ করেছে, কর্মীদের অনেকে জখম হয়েছে।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা জোনের এডিসি শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রেস ক্লাবের সামনে একটা সমাবেশ করেছেন তারা। আমরা বলেছি, শেষ করে দিন। তারা বিক্ষোভ মিছিল করে এখানে (জিরো পয়েন্টের কাছে) এসেছেন। তারা কথা দিয়েছিলেন, শান্তিপূর্ণভাবে এসে চলে যাবেন। কিন্তু ব্যারিকেড ভেঙে সচিবালয়ে ঢোকার চেষ্টা করলে আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্তরা তাদের বুঝিয়েছেন। কিন্তু তারা সেটা না শুনে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার চেষ্টা করেছেন, পুলিশ সদস্যদের ওপরে চড়াও হয়েছেন। যেহেতু সচিবালয় কেপিআই এলাকা। এখানে কোনোভাবে অবস্থান করা বা প্রবেশ করা সম্ভব নয়। তাই আমরা মিনিমাম শক্তি প্রয়োগ করে তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি।’ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এর আগে সমাবেশে গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক শহীদুল্লাহ কায়সারের সঞ্চালনায় সাইফুল হক, জোনায়েদ সাকি, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের হাসনাত কাইয়ুম, জেএসডির তানিয়া রব প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
গতকাল বুধবার এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ১২-দলীয় জোটসহ অন্য দল ও সংগঠনগুলো।
গণতন্ত্র মঞ্চের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশি হামলার ঘটনায় ‘দখলদার সরকারের চরম নিষ্ঠুরতার বহিঃপ্রকাশ’ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দুপুরে পুলিশের লাঠিচার্জে জোনায়েদ সাকিসহ নেতাকর্মীদের আহত হওয়ার ঘটনার নিন্দা জানিয়ে গতকাল বুধবার রাতে এক বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘৭ জানুয়ারি ডামি নির্বাচনের পর দখলদার আওয়ামী শাসকগোষ্ঠী মানুষের ভোটের অধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো ক্ষুন্ন করে জনগণসহ বিরোধী দলগুলোর ওপর আরও তীব্র মাত্রায় দমনপীড়ন চালাচ্ছে, নির্মম নিষ্ঠুরতা দেখাচ্ছে। আজকে (গতকাল) আরও একটি নির্মম বহিঃপ্রকাশ ঘটল গণতন্ত্র মঞ্চের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের বর্বরোচিত হামলা, জোনায়েদ সাকিসহ ৫০ জনের বেশি নেতাকর্মীকে আহত করা এবং একজন নেতাকে ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে।’
