ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে ভেতরে তদারকি!

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৪, ০৩:১৬ এএম

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) সম্প্রতি স্বামীকে আবাসিক হলে আটকে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণের ঘটনার পর থেকে হল ব্যবস্থাপনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হলের অধিকাংশ প্রাধ্যক্ষ (প্রভোস্ট), ওয়ার্ডেন ও আবাসিক শিক্ষক ক্যাম্পাসে থাকেন না। তারা ক্যাম্পাসের বাইরে থাকায় হল ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। আর এ সুযোগে অছাত্র ও বহিরাগতরা হলে নিয়মবহির্ভূতভাবে অবস্থান করে মাদক কারবার ও যৌন নিপীড়নের মতো অপরাধে জড়াচ্ছে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, হলের ব্যবস্থাপনায় হল প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সবসময় তৎপর থাকে।

জাবির হল ব্যবস্থাপনায় কর্র্তৃপক্ষ সফল নয় বলে মনে করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। সম্প্রতি ধর্ষণকাণ্ডের পর ঘটনাটি খতিয়ে দেখার জন্য তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে ইউজিসি। তদন্ত শেষে পরামর্শ প্রতিবেদন প্রকাশ করে ওই কমিটি। প্রতিবেদনে বলা হয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে হলে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নোটিস দিয়েছে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সফল হয়নি। তাই বিষয়টির কার্যকারিতা শুধু নোটিসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এ ছাড়া হলে যার নামে যে কক্ষ বরাদ্দ সেই কক্ষে অনেক শিক্ষার্থীই থাকেন না। অনেক সময় তারা অন্য হলেও থাকেন। এমনকি শিক্ষার্থীদের হলের বাইরে অবস্থান করার সময় নির্ধারিত থাকলেও বিষয়টি প্রক্টর বা প্রাধ্যক্ষ বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি আবাসিক হলে একজন করে প্রাধ্যক্ষ থাকেন। এর বাইরে হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাসহ সার্বিক বিষয় দেখভালে নিয়োগ দেওয়া হয় একাধিক আবাসিক শিক্ষক, সহকারী আবাসিক শিক্ষক ও ওয়ার্ডেন। এসব শিক্ষকের শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক ও আবাসন সুবিধা নিশ্চিতকরণ এবং খাবারের মান পর্যবেক্ষণসহ যাবতীয় বিষয় দেখাশোনা করার কথা। যার জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাও পেয়ে থাকেন তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিক্ষার্থীদের সার্বিক দেখভালের জন্য হলভেদে ২-১০ জন আবাসিক শিক্ষক ও ওয়ার্ডেন নিয়োগ দেওয়া হয়। যারা হলের বিভিন্ন কাজের দায়িত্বে থাকেন। এসব শিক্ষকের থাকার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসা বা কোয়ার্টার বরাদ্দ থাকে। নির্দিষ্ট পরিমাণ অতিরিক্ত সম্মানী এবং ভাতাও পান তারা। অ্যাকাডেমিক পদোন্নতির ক্ষেত্রেও সুবিধা পেয়ে থাকেন। এ ছাড়া পরবর্তীকালে প্রাধ্যক্ষসহ প্রশাসনিক বিভিন্ন পদে যেতেও সহায়ক ভূমিকা রাখে এই অভিজ্ঞতা।

কিন্তু সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব প্রাধ্যক্ষ ও ওয়ার্ডেনসহ আবাসিক শিক্ষকদের অধিকাংশই ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থান করেন। ক্যাম্পাসের ভেতরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসায় না থেকে বাইরে থাকার ফলে হলের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারেন না তারা। ছাত্রীদের হলগুলোতে ওয়ার্ডেনরা নিয়মিত ও যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করলেও প্রাধ্যক্ষ ও আবাসিক শিক্ষকরা ক্যাম্পাসের বাইরে থাকার কারণে তা পারেন না। ছাত্রদের হলগুলোতে দেখাই মেলে না আবাসিক শিক্ষকদের। বছরে বিশেষ ভোজের মতো হলকেন্দ্রিক দুই-তিনটি কর্মসূচি ছাড়া হলে যান না। নিয়মিত ফ্লোর/ব্লক পরিদর্শনও করেন না।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ছাত্র ও ছাত্রীদের ১৯টি আাবসিক হলে ১৯ জন প্রাধ্যক্ষ রয়েছেন। প্রাধ্যক্ষদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে মাত্র সাতটি বাসা। এর মধ্যে চারটি বাসায় চারটি হলের প্রাধ্যক্ষ থাকেন। খালি রয়েছে তিনটি বাসা। বাকি ১৫ জন ক্যাম্পাসের বাইরে বিভিন্ন স্থানে ভাড়া বাসায় থাকেন। ১৯টি আবাসিক হলে ওয়ার্ডেন ৩৯ জন, আবাসিক শিক্ষক ৩৫ এবং সহকারী আবাসিক শিক্ষক রয়েছেন ৬০ জন। সব মিলিয়ে ১৩৪ শিক্ষকের জন্য বাসা বরাদ্দ রয়েছে ৬০টি। বরাদ্দকৃত বাসাগুলোতে ৬০ শিক্ষক থাকেন। বাকি ৭৪ শিক্ষক ক্যাম্পাসের বাইরে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দ করা এসব বাসায় থাকার জন্য শিক্ষকদের মূল সম্মানী থেকে এক-চতুর্থাংশ কেটে নেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ।

তবে প্রাধ্যক্ষ, ওয়ার্ডেন ও আবাসিক শিক্ষকদের অভিযোগ, প্রাধ্যক্ষদের জন্য আলাদা কোনো বাংলো বা বিশেষ ভবন নেই। তাদের যেসব বাসা বরাদ্দ দেওয়া হয় তা থাকার জন্য মানসম্মত নয়। থাকার পরিবেশও ভালো নয়। দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ে, বৃষ্টির মৌসুমে ছাদ থেকে পানিও পড়ে। এসব বাসায় থাকার জন্য অ্যাকাডেমিক সম্মানী থেকে যে পরিমাণ টাকা কেটে নেওয়া হয়, ওই পরিমাণ টাকা দিয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে ভালো বাসা পাওয়া যায়। এ ছাড়া ওয়ার্ডেন ও আবাসিক শিক্ষকদের জন্য পর্যাপ্ত বাসা নেই।

সম্প্রতি ধর্ষণকান্ডে আলোচনায় আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হল ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের প্রাধ্যাক্ষও ক্যাম্পাসের বাইরে থাকেন।

এ প্রসঙ্গে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক নাজমুল হাসান তালুকদার বলেন, ‘আমাকে জোর করে প্রাধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাধ্যক্ষদের জন্য কোনো আলাদা বাসভবন নেই। যেসব বাসা রয়েছে তা থাকার উপযোগী না বলে ক্যাম্পাসের পাশেই নিজের বাসায় থাকি। হলকেন্দ্রিক কোনো সমস্যা বা প্রয়োজনে সবার আগে যাওয়ার চেষ্টা করি।’

মীর মশাররফ হোসেন হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. সাব্বির আলম বলেন, ‘হল প্রাধ্যক্ষের জন্য যে বাসাটি রয়েছে সেটি ১৫ বছর ধরে পরিত্যক্ত। এজন্য বাধ্য হয়েই ক্যাম্পাসের বাইরে থাকতে হয়।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নূরুল আলমের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তার সাড়া মেলেনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত