গোধূলিলগ্নের বিভ্রমেই সর্বস্বান্ত বাংলাদেশ

আপডেট : ১০ মার্চ ২০২৪, ১২:৪৫ এএম

ঘড়ির কাঁটা তখন ৫টার ঘরে, পশ্চিম আকাশে লাল আভা ছড়িয়ে পাটে বসছে সূর্য। দিন আর রাতের সংযোগের এই সন্ধিক্ষণেই প্যাভিলিয়ন প্রান্ত থেকে বল হাতে নুয়ান থুসারার একটা ওভার ছিনতাই করে নিল বাংলাদেশের সিরিজ জয়ের স্বপ্ন। ম্যাচের চতুর্থ ওভারের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ বলে এই পেসার একে একে তুলে নিলেন নাজমুল হোসেন শান্ত, তাওহীদ হৃদয় আর মাহমুদউল্লাহর উইকেট। চোখের পলকে ১৩/১ থেকে ১৩/৪ হয়ে গেল বাংলাদেশের স্কোরকার্ড। এরপর রিশাদ হোসেনের বীরত্ব আর তাসকিন আহমেদের মরিয়া প্রচেষ্টার পরও হার এড়াতে পারল না বাংলাদেশ। সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে শ্রীলঙ্কার কাছে ২৮ রানে হেরে ৩ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজটা ২-১ ব্যবধানে হেরে গেল চন্ডিকা হাথুরুসিংহের শিষ্যরা। ডালাসে এই শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ফের দেখা হবে বিশ্বকাপে, তার আগে টি-টোয়েন্টি সিরিজ থেকে পাওয়া শিক্ষাগুলো কাজে লাগিয়ে ভুল শুধরে নেওয়াটা একান্তই জরুরি।

চলতি সিরিজে শান্ত টস জিতলেন টানা তৃতীয়বারের মতো, নিলেন বোলিং। সবগুলো ম্যাচেই বাংলাদেশ রান তাড়া করল। প্রথমটায় ৩ রানে হার, দ্বিতীয়টিতে ৮ উইকেটে জয় আর শেষ ম্যাচে এসে ২৮ রানে হার। বাংলাদেশ একাদশ অপরিবর্তিত আর শ্রীলঙ্কায় চোটগ্রস্ত মাথেশা পাথিরানার বদলে নুয়ান থুশারা, আভিস্কা ফার্নান্দোর জায়গায় ধনঞ্জয়া ডি সিলভা। আভিস্কার বদলে ধনঞ্জয়া এলেও চিত্রনাট্যটা খুব একটা বদলায়নি, তার মতোই ধনঞ্জয়াও আউট হয়ে গেছেন অল্পতেই। মাত্র ৮ রান করে। দ্বিতীয় ম্যাচে মাঝে একটা ওভারের জন্য সৌম্য সরকারকে বোলিংয়ে এনে ভালো খেলতে থাকা কুশল মেন্ডিসকে আউট করতে পেরেছিলেন শান্ত, কাল কেন সেই পথে হাঁটলেন না সেটাও প্রশ্ন। মেন্ডিস ৫৫ বলে খেলেছেন ৮৬ রানের ইনিংস, আধডজন করে বাউন্ডারি আর আধডজন ছক্কা। ৬০ রান তো কুশল নিয়েছেন মাত্র ১২ বল থেকেই! অন্যদিকে বড় কোনো অবদান নেই, তবে ১২, ১৫, ১০ ও ১৯ রান করা ছোট ছোট ইনিংসগুলোই মেন্ডিসের সঙ্গে মিশে ২০ ওভারে শ্রীলঙ্কার সংগ্রহটাকে পৌঁছে দেয় ৭ উইকেটে ১৭৪ রানে। দুই পেসার তাসকিন আহমেদ ও শরিফুল ইসলাম ভালো বল করেছেন, লেগস্পিনার রিশাদ হোসেনও মার খেয়ে দমে না গিয়ে উইকেট আদায় করেছেন। খরুচে ছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান, ৪ ওভারে দিয়েছেন ৪৭ রান, ৩ খানা করে চার ও ছয় হজম করেছেন।

১৭৫ রানের লক্ষ্যটা সহজ নয়, আবার সিলেটের ব্যাটিং স্বর্গে খুব কঠিনও নয়। এখানে পরে ব্যাট করে দুইশর ওপরেও রান করেছে বাংলাদেশ, ১৬৫ রান তাড়া করেছে হেসেখেলে। শুরুতে একটা সাবলীল জুটিই খুলে দিতে পারত জয়ের তালা। ধনঞ্জয়া ডি সিলভা বোলিংয়ে এলে প্রথম বলেই যেভাবে লিটন সুইপ সদৃশ কোনো একটা শট খেলতে গিয়ে বল আকাশে তুললেন, তার দায়টা তাকেই নিতে হবে। ১১ বলে ৭ রান করে আউট লিটন। নাজমুল শান্ত, ওয়ান-ডাউনে নেমে একটু উইকেটের চরিত্র বুঝছিলেন, শেষ বলে সিঙ্গেল নিয়ে স্ট্রাইকে গেলেন পরের ওভারে। গোধূলি লগ্নে তখন বল হাতে থুসারার ঐ ওভারটাই ছিল সর্বনাশা। ওভারের দ্বিতীয় বলে বোল্ড নাজমুল হোসেন শান্ত, পরের বলে তাওহীদ হৃদয়; দুজনেই বোল্ড। হ্যাটট্রিক ঠেকাতে এলেন মাহমুদউল্লাহ, শোনা যায় করাচিতে নাসিম শাহর হ্যাটট্রিক ঠেকাতে পারেননি বলে রাসেল ডোমিঙ্গো তার ওপর প্রচ- ক্ষেপেছিলেন। থুশারার হ্যাটট্রিকটা ঠেকাতে রিভিউ নিয়েছিলেন, তবুও লেগ বিফোর উইকেট হওয়া থেকে বাঁচতে পারেননি। পরে কুশল মেন্ডিস বলছিলেন, ঐ সময়টায় নাকি থুশারার মধ্যে মালিঙ্গাকে দেখছিলেন!  

সৌম্য সরকার এবং জাকের আলী অনিকও দ্রুত বিদায় নেওয়াতে বাংলাদেশের স্কোর ৮.১ ওভারে ৬ উইকেটে ৩২। খেলার ফল আন্দাজ করা যাচ্ছিল তখনই, তৃতীয় ম্যাচে এসে ভরা গ্যালারি তখন খালি হতে শুরু করেছে। এমন সময় মারমুখি হয়ে উঠলেন রিশাদ হোসেন। ছক্কা মেরেছেন ৭টা, ২৬ বলে করেছেন হাফসেঞ্চুরি। তবে তার মারমুখি ভূমিকায় দর্শকরা আনন্দ পেলেও ম্যাচের রঙ খুব একটা বদলায়নি। রিশাদের ৩০ বলে ৫৩ রানের ইনিংসের সঙ্গে তাসকিনের ২১ বলে ৩১ রানের ইনিংসে হারের ব্যবধানটা কমে হয়েছে ২৮ রান। ১৯.৪ ওভারে ১৪৬ রানেই অলআউট বাংলাদেশ।

হারের পর অধিনায়ক শান্ত বললেন ঐ একটা ওভারেই আসলে অনেকটা পিছিয়ে গেছে বাংলাদেশ। থুশারার বোলিং নিয়ে বলেছেন, ‘ওর অ্যাকশনটা অন্যরকম, সাইড-আর্ম অ্যাকশন। ঐ সময় বল সুইং হচ্ছিল, আর ওর বলে বাউন্স কম। বল একটু নিচে নিচে আসছিল। আমরা জানতাম ও একাদশে থাকতে পারে, পর্যাপ্ত প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। তবে এরকম বোলারকে আমরা খুব বেশি খেলি না আর এরকম একটা ওভার হয়ে গেলে টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোটা কঠিন। ঐ একটা ওভারেই খেলাটা ঘুরে গেছে, আমারও তাই মনে হয়।’

অন্যদিকে টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিতে উদযাপনে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটাররা দেখিয়েছেন ঘড়ির সংকেত। নিদাহাস ট্রফিতে থিসারা পেরেরা আর মুশফিকুর রহিমের কল্যাণে নাগিন ড্যান্স হয়ে উঠেছিল দ্বৈরথের প্রতীক, বিশ্বকাপে অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউসের টাইম আউটের পর সেটা বদলে গেছে ঘড়িতে। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডের ওপরে ঘড়িটা বসানোর পর থেকেই সঠিক সময় দেয়নি, সবসময় ছিল ১০ মিনিট এগিয়ে। বিদেশে ঘড়ির প্রস্তুতকারকদের কাছে পাঠিয়েও লাভ হয়নি। সেই ঘড়ির শূন্যস্থানটা যেমন জানান দিয়ে যায় অস্তিত্ব, তেমনি খালি হাতের কবজিতে ইঙ্গিত করেই শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটাররা মনে করিয়ে দিলেন দিল্লির সেই ঘটনাও। যে উদযাপনে মেতে ওঠার সুযোগটা তাদের করে দিয়েছেন থুসারা, ৪ ওভারে ২০ রান দিয়ে হ্যাটট্রিকসহ ৫ উইকেট নিয়ে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত