সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দরপত্র আজ থেকে ৬ মাস

আপডেট : ১০ মার্চ ২০২৪, ০২:৪৫ এএম

অবশেষে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)। আজ রবিবার থেকে আগামী ছয় মাস এই দরপত্র জমা দেওয়া যাবে। এতে যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের বহুজাতিক কোম্পানি অংশ নিতে পারে। দরপত্র মূল্যায়ন শেষে চলতি বছরের মধ্যে এ সংক্রান্ত চুক্তি সই হবে বলে আশা করছেন পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ বলছে, উৎপাদন ও বণ্টন চুক্তি বা মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) সংশোধন, বঙ্গোপসাগরে জরিপকাজ শেষ হওয়াসহ নানা কারণে এবারের দরপত্রে বেশ সাড়া পাওয়া যেতে পারে।

সরকারের এই উদ্যোগের ফলে দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকা গভীর সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দুয়ার খুলবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পেট্রোবাংলা সূত্রমতে, দরপত্রে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে দেশি-বিদেশি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের মাধ্যমে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে এ বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হবে। এবার প্রায় ৫৫টি কোম্পানিকে দরপত্রে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোকে (আইওসি) আগ্রহী করে তুলতে আসছে ঈদের পর রোড শোর আয়োজন করবে সরকার। আগামীকাল সোমবার সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই দরপত্র আহ্বানের বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।

সূত্রমতে, ৯ সেপ্টেম্বর দরপত্র জমা দেওয়া শেষ হলে আগ্রহী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বৈঠক করবে পেট্রোবাংলা। এরপর সেগুলো মূল্যায়ন করে চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠান নির্বাচিত হলে তাদের সঙ্গে চুক্তি সই করা হবে।

বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অংশে গভীর সমুদ্রে ১৫টি ও অগভীর সমুদ্রে ১১টি ব্লকসহ ২৬টি ব্লক বা এলাকা রয়েছে। এর মধ্যে ২০১০ সালে গভীর সমুদ্রে দুটি ব্লকে কাজ নেয় কনোকোফিলিপস। দ্বিমাত্রিক জরিপ চালালেও পরে গ্যাসের দাম বাড়ানোর দাবি পূরণ না হওয়ায় কাজ ছেড়ে চলে যায় তারা। একইভাবে চুক্তির পর কাজ ছেড়ে চলে যায় অস্ট্রেলিয়ার সান্তোস ও দক্ষিণ কোরিয়ার পস্কো দাইয়ু। এখন একমাত্র কোম্পানি হিসেবে অগভীর সমুদ্রের দুটি ব্লকে অনুসন্ধান চালাচ্ছে ভারতের কোম্পানি ওএনজিসি। এই দুটি বাদ দিয়ে বাকি ২৪টি ব্লকে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

জ্বালানি বিভাগ জানায়, বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস ও অন্যান্য হাইড্রোকার্বনের বিশাল মজুদের সম্ভাবনার পরও অনুসন্ধান ও উৎপাদন অলাভজনক দাবি করে বিদেশি একাধিক প্রতিষ্ঠান কাজ শুরুর পর চলে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে ২০২০ সালের নভেম্বরে মডেল পিএসসি হালনাগাদ করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। অনুসন্ধানকাজে গতি আনতে গত বছরের ২৬ জুলাই উৎপাদন ও বণ্টন চুক্তি বা মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্টের (পিএসসি) চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।

পেট্রোবাংলা সূত্রমতে, সাগরে কী পরিমাণ তেল-গ্যাস মজুদ আছে, তার সম্ভাব্যতা যাচাই করতে বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে বহুমাত্রিক জরিপ করা হয়েছে ইতিমধ্যে। পাশাপাশি দ্বিমাত্রিক জরিপও করা হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সাগরে খনিজসম্পদের পরিমাণ সম্পর্কে অনুমান করা যায়। এ তথ্য আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর কেনার সুযোগ রয়েছে।

এরই মধ্যে মার্কিন কোম্পানি শেভরন জরিপের ডেটা কিনে এর বিশ্লেষণও করে ফেলেছে। সেই বিশ্লেষণের ফলাফল দেখে কোম্পানিটি ব্লক বরাদ্দ নিতে দরপত্রে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। শেভরন এখন মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের তিনটি গ্যাসক্ষেত্র পরিচালনা করছে। এ তিন ক্ষেত্র থেকে দেশে প্রতিদিন মোট গ্যাস উৎপাদনের ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ উৎপাদন হচ্ছে।

এ ছাড়া অন্য মার্কিন কোম্পানি এক্সন মবিল, কনোকোফিলিপস, ডিভন এনার্জি, যুক্তরাজ্যের ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম, তাল্লো, শেল ও নেপচুন এনার্জি, চীনের চায়না ন্যাশনাল অফশোর অয়েল, চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশন, সিনোপ্যাক, ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস করপোরেশন লিমিটেড (ওএনজিসি) ও অয়েল ইন্ডিয়া, ফ্রান্সের টোটাল এনার্জিস, অস্ট্রেলিয়ার সান্তোস, রাশিয়ার গ্যাজপ্রম, লুকঅয়েলসহ বিভিন্ন কোম্পানির দরপত্রে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এর মধ্যে এক্সন মবিল গভীর সমুদ্রের ১৫টি ব্লক তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ইজারা নিতে গত বছর আগ্রহ প্রকাশ করে। তারা তখন সরকারের কাছে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়। এ নিয়ে কয়েক দফা চিঠিও দেয় মার্কিন কোম্পানিটি। সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের সঙ্গে তাদের আলোচনাও হয়। এক্সন মবিলের প্রস্তাবে সরকারের পক্ষ থেকে তখন বেশ ইতিবাচক সাড়া চোখে পড়ে। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক আরও উন্নত করতে তাদের কাজ করার সুযোগ দেওয়া হবে বলেও তখন মনে করেছিলেন বিশ্লেষকদের অনেকে। তবে শেষ পর্যন্ত তা আর চূড়ান্ত হয়নি।

গত মাসের মাঝামাঝিতে এক্সন মবিলের দুই সদস্যের প্রতিনিধিদল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সঙ্গে বৈঠক করে। কিন্তু তাদের আগের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দরপত্রে অংশ নেওয়ার কথা বলা হয়।

ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. বদরূল ইমাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক দেরিতে হলেও শেষ পর্যন্ত সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে যে দরপত্র আহ্বান করা হচ্ছে, সেটি খুবই ইতিবাচক। এখন বাকি প্রক্রিয়াগুলো দ্রুত শেষ করে অনুসন্ধানকাজ শুরু করতে হবে। আর দেরি করার সুযোগ নেই। তবে এ ধরনের দরপত্র আহ্বানের ক্ষেত্রে দেশে এবং বিদেশে রোড শোর মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানো দরকার।’

তিনি আরও বলেন, ‘বঙ্গোপসাগরে ভারত ও মিয়ানমার তাদের ব্লক থেকে বিপুল পরিমাণ তেল-গ্যাস তুলতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের অংশেও বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। সাগরে তেল-গ্যাস পাওয়া গেলে তা দিয়ে দেশের চলমান জ্বালানি সংকট কাটাতে বড় ভূমিকা রাখবে।’

পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘বহুজাতিক অনেক কোম্পানি আগ্রহ দেখিয়ে যোগাযোগ করছে। তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। চলতি বছরের মধ্যে দরপত্রের কাজ শেষ করার লক্ষ্যে অগ্রসর হচ্ছি, যাতে করে আগামী বছর থেকে চূড়ান্ত করা প্রতিষ্ঠান অনুসন্ধানকাজ শুরু করতে পারে।

দীর্ঘদিন ধরেই দেশে গ্যাসের সংকট চলছে। বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৪ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ৬০০ থেকে ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট আমদানি করা হচ্ছে। বাকি গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে দেশীয় কূপ থেকে। ২০৩৩-৩৪ সাল নাগাদ দেশে গ্যাসের বিদ্যমান মজুদ শেষ হয়ে আসার আশঙ্কা রয়েছে।

বঙ্গোপসাগরে নিজ সীমানায় অনুসন্ধান চালিয়ে এরই মধ্যে বড় সাফল্য পেয়েছে ভারত ও মিয়ানমার। ২০১২ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি হয় মিয়ানমারের। এরপর ২০১৩ সালে সাগরে গ্যাস উত্তোলন শুরু করে দেশটি। বাংলাদেশের সীমানার নিকটবর্তী এলাকার মিয়া ও শোয়ে নামে দুটি গ্যাসকূপ থেকে এরই মধ্যে কয়েক ট্রিলিয়ন গ্যাস উত্তোলন করেছে তারা। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে এই গ্যাস তারা এখন চীনেও রপ্তানি করছে।

এদিকে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ-ভারত সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পর ভারতও তাদের অংশে বিপুল পরিমাণ তেল-গ্যাসের সন্ধান পেয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূল থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরত্বে গভীর সাগরে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের বড় মজুদ আবিষ্কার করেছে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ওএনজিসি। সেখান থেকে দৈনিক ৪৫ হাজার ব্যারেল জ্বালানি তেল এবং ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা যাবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। উত্তোলন কার্যক্রম ভারতের শুরু হলে শুধু জ্বালানি তেল আমদানি বাবদ প্রায় ১০ হাজার কোটি রুপি সাশ্রয় হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত