নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে ক্ষোভ

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২৪, ০২:২৩ এএম

ভারতের নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী (সিএএ) চালু হওয়ার পর গতকাল মঙ্গলবার দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে বন্ধ (ধর্মঘট) কর্মসূচি পালন করেছে ১৬টি সংগঠন। এদিন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জনসভা থেকে সিএএর বিরুদ্ধে কড়া ভাষা ব্যবহার করেছেন এবং তার রাজ্যে আইনটি কার্যকর করা হবে না বলেও জানান। ওদিকে দক্ষিণ ভারতের তামিলনাডুর মুখ্যমন্ত্রী ‘দ্রাবিড় মুনেত্র কাজাম (ডিএমকে)’ দলের প্রধান এমকে স্ট্যালিনও ঘোষণা দিয়েছেন, তার রাজ্যে সিএএ কার্যকর হবে না। তবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, কংগ্রেসসহ বিরোধীরা ‘ভোট ব্যাংক রাজনীতি’ জিইয়ে রাখতে সিএএর বিরোধিতা করছে।

আসামে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা সিএএর পক্ষে জোরালো অবস্থান তুলে ধরছেন। কিন্তু তার রাজ্যেই সিএএর বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ-বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। রাজ্যটিতে কংগ্রেসসহ আরও কয়েকটি দল মিলে ইউনাইটেড অপোজিশন ফোরাম (ইউওএফএ) গঠন করে। তাদের ডাকে গতকাল আসামজুড়ে বন্ধ পালিত হয়।

অসমীয় জাতিসত্তার অধিকারের প্রশ্নে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকা সংগঠন ‘আসু’ ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে যে, সিএএর বিরুদ্ধে তারা আদালতের ভেতরে এবং বাইরে লড়াই চালাবে। সিএএর কপি পুড়িয়েছেন আসু এবং ৩০টি অরাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। গুয়াহাটি, কামরূপ, বরপেটা, লখিমপুর, নলবাড়ি, ডিব্রুগড়, তেজপুরের মতো জায়গায় প্রতিবাদ মিছিল সংঘটিত হয়েছে।

আসামের বিজেপি সরকার প্রতিবাদ দমন করতে আদালতের একটি নির্দেশকে ব্যবহার করছে। গত বছর গুয়াহাটি হাইকোর্টের একটি নির্দেশে বন্ধকে ‘অবৈধ এবং অসাংবিধানিক’ আখ্যা দেওয়া হয়। ওই নির্দেশের ওপর ভর করে ১৬টি রাজনৈতিক দলের শীর্ষনেতাকে আইনি নোটিস দিয়েছে আসামের পুলিশ।

আসামের নৃতাত্ত্বিক অসমীয় জনগোষ্ঠীর মানুষ মনে করছে, সিএএর মাধ্যমে আসামে আবারও শরণার্থীদের প্রবেশ করানো হবে। অসমীয়রা সেখানে বসবাসরত হিন্দু-মুসলিম বাঙালিদের আসামের বাসিন্দা মনে করে না। মুসলিম বাঙালিদের বাংলাদেশ থেকে দেশান্তরী হওয়া বহিরাগত মনে করে তারা। এ ছাড়া তারা অসমীয় সংস্কৃতি ও ভাষার সঙ্গে ভারতের অন্যান্য অংশের ভাষা ও সংস্কৃতি এবং মানুষের সংমিশ্রণও চায় না। আসামে সিএএ-বিরোধী বিক্ষোভের অন্যতম বড় কারণ এটি। আবার আসামের ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চলসহ নানা জায়গায় বসবাসকারী বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে সিএএ নিয়ে স্বাভাবিক ক্ষোভ বিদ্যমান রয়েছে। 

নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী পাস করে। সংশোধনী অনুযায়ী, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো মুসলিম ধর্মাবলম্বী দেশ থেকে যদি সে দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে ভারতে আশ্রয় চান, তাহলে তা গ্রহণ করা হবে। কিন্তু সিএএতে হিন্দু, শিখ, জৈন, বৌদ্ধ, পার্সি এবং খ্রিস্টান শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হলেও সেখানে মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্তদের কথা উল্লেখ করা হয়নি। এখানেই ভারতের প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর মূল আপত্তি। তারা একে বিজেপির সাম্প্রদায়িক নীতির প্রতিফলন মনে করছে।

আবার অনেক মুসলিম মনে করছে, সিএএর মাধ্যমে বিজেপি মুসলিম জনগোষ্ঠীর মানুষকে হয়রানি করতে চাচ্ছে। নানা নিয়মের মারপ্যাঁচে তাদের নাগরিকত্বহারা করা হতে পারে। ভারতীয় প্রমাণ করতে জমিজমাসহ নানা নথিপত্র চাওয়া হতে পারে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ২৮ শতাংশের মতো মুসলিম বাস করেন। সেখানে আইনটি নিয়ে ভীতি রয়েছে। আবার রাজ্যটিতে মতুয়া সম্প্রদায়েরও বড় অংশের বাস যারা গত শতক থেকে এ পর্যন্ত নানা সময় বাংলাদেশ থেকে ভারতে গিয়ে বসতি গড়েছেন। তারা সিএএ নিয়ে ব্যাপক উৎসাহী। কারণ তারা মনে করছেন, এতে তারা উদ্বাস্তু থেকে নাগরিক হবেন।

এ অবস্থায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুরু থেকে সিএএ-বিরোধী অবস্থানে অনড়। গতকাল হাবড়ার প্রশাসনিক সভা থেকে মমতা বলেন, ‘একটা কথা মন দিয়ে শুনে নিন! আপনারা কেউ নাগরিকত্বের জন্য কেন্দ্রের কাছে আবেদন করবেন না। করলেই আপনাদের নাগরিকত্ব চলে যাবে। আপনাকে বেআইনি অনুপ্রবেশকারী বলবে। আপনার সম্পত্তি কেড়ে নেবে। ওই ফাঁদে খবরদার পা দেবেন না!’ মমতা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি বাংলার কারও নাগরিকত্ব যেতে দেবেন না। সবাইকে তিনি আশ্রয় দেবেন।

মমতা ২০১৯ সালে আসামের জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকরণের (এনআরসি) ঘটনা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘২০১৯ সালে আসামে এনআরসির নামে ১৯ লাখ মানুষের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১৩ লাখ বাঙালি হিন্দু।’

আবার মমতার মতো ডিএমকে নেতা তামিলনাডুর মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিন বলেন, তিনি তামিলনাডুতে সিএএ কার্যকর হতে দেবেন না।

বিরোধীরা অভিযোগ করছে, লোকসভা ভোটের আগে সিএএ কার্যকর করা হয়েছে বিজেপির ভোটের রাজনীতিকে সামনে রেখে। এর ওপর ভর করে বিজেপি সাম্প্রদায়িক হাওয়া তুলতে চায় বলে মনে করছে বিরোধীরা। এসব অভিযোগকে কার্যত উড়িয়ে দিয়ে বিজেপি নেতা অমিত শাহ বলেছেন, মুসলিমদের তোষণ করতে কংগ্রেসসহ বিরোধীরা সিএএর বিরোধিতা করছে। মুসলিমদের ভোটব্যাংক মনে করে বলেই এর বিরোধিতা করা হচ্ছে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত