লোকসভা নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করেছে। সর্বভারতীয় দলগুলোর চাণক্যরা নানা মেরূকরণের হিসাবনিকাশ শুরু করে দিয়েছেন এরই মধ্যে। প্রায় দশ বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মসনদে থাকা ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি তথা সংঘ পরিবার অনেকটা প্রত্যাশিতভাবেই মেরূকরণের রেসে এগিয়ে রয়েছে। রাম মন্দির উদ্বোধন থেকে শুরু করে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ), একের পর এক ধর্মীয় তাস তারা খেলে চলছে। সংঘ পরিবার নরেন্দ্র মোদির যে হিন্দুত্বের মেকি ইমেজ তৈরি করেছে তাতে ভর করে ২০১৯-এর পর এবারও নির্বাচনের বৈতরণী পার হতে চাচ্ছে বিজেপি। সিএএ নিয়ে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ বেশ মাঠ গরম করে বেড়াচ্ছেন। ‘সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন প্রত্যাহার করা হবে না’ বলে অমিত শাহ যে হুমকি দিচ্ছেন তার শক্তি যে তিনি নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্বের ইমেজ থেকে পাচ্ছেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে বিজেপির এই হম্বিতম্বিকে রুখে দিতে পারে দক্ষিণ ভারত। বিজেপির অন্দরে এই নিয়ে চাপা দীর্ঘশ্বাস কখনো কখনো আর চাপা থাকছে না। সে কারণেই ৩৭০ প্লাসের টার্গেট ঠিক করে দিয়েও বছরের শুরুতে নরেন্দ্র মোদি নিজেই ছুট লাগালেন দক্ষিণ ভারতে। ৩৭০ প্লাস যে শুধু বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলো থেকে আসবে না, তা বেশ বুঝতে পারছেন তিনি। সেই কারণেই তেলেঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়, কেরালা ও কর্ণাটকে প্রচারে বাড়তি নজর দিচ্ছেন মোদি।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটের হাওয়া এখনো স্পষ্ট নয়। একদা বামফ্রন্ট থেকে যে মুসলিম ভোট তৃণমূল কংগ্রেসে ব্যাপকহারে চলে গিয়েছিল তা সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা ফিরে আসছে। ফলে এবারে তৃণমূল কংগ্রেস ও বামফ্রন্টের মুসলিম ভোট কাটাকাটির জেরে বিজেপি এগিয়েও যেতে পারে। আরএসএস এতকাল ধরে নীরবে সাম্প্রদায়িকতার যে জমি তৈরি করে গেছে পশ্চিমবঙ্গে, তার ফল বিজেপির এই উত্থান। একদা দেশান্তরী বাঙালি হিন্দুর সামনে নাগরিকত্বের মুলো ঝুলিয়ে রেখেছে বিজেপি। খুশি মনে সেটি গিলে ফেললেই বিপদ অনিবার্য। কারণ ফ্যাসিবাদ কখনো জনগণের কথা ভাবে না। জনগণকে তার তখনই দরকার যখন তার ক্ষমতার গদিতে বসতে জনগণকে দরকার। একবার বসে গেলে তারপর আর জনগণ কিংবা জনমত কোনোটিরই তার দরকার হয় না। বিজেপির দশ বছরের শাসনে এমন বহু নজির রয়েছে। দুঃখজনক হলেও এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে, আগের দোর্দণ্ড প্রতাপের কংগ্রেস আর নেই। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত যে কংগ্রেসের জয়জয়কার ছিল, গেরুয়া ঝড়ের কবলে পড়ে বহু বছর ধরে তারা উঠে দাঁড়াতে পারছে না। অতিসাম্প্রতিক সময়ে নতুনরূপে ফিরে আসা রাহুল গান্ধী তার ‘ভারত জোড়ো’ যাত্রা দিয়ে দেশব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন তুলেছেন। যার ফলে কংগ্রেস কিছুটা হলেও জমি ফিরে পেতে চলেছে। এটা স্বীকার করতেই হবে, একক ভাবে ভারতের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার জন্য যে দলীয় কাঠামোর দরকার তা কংগ্রেস ছাড়া আর কারোই নেই। কংগ্রেসের নড়বড়ে সময়ের সুযোগ নিয়ে মাঝেমধ্যে কোনো কোনো আঞ্চলিক দল দিল্লির পথে পা বাড়ানোর ইচ্ছে প্রকাশ করলেও সংগত কারণেই তা হয়ে ওঠে না। তৃণমূল কংগ্রেসের নাম এ তালিকায় ওপরের দিকেই আছে।
লোকসভা ভোটে বিজেপির সহজ হিসাবকে কিছুটা হলেও চ্যালেঞ্জ করতে পেরেছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর ‘ইন্ডিয়া’ জোট। এই জোট আত্মপ্রকাশের ফলে বিজেপি যে অস্বস্তিতে পড়েছিল তা সবারই জানা। বিভিন্ন সরকারি নথিতে ‘ইন্ডিয়া’ নামটি ব্যবহার না করে অনেকটা নীরবে ‘ভারত’ ব্যবহারের প্রচলন শুরু করা হয়েছিল। যদিও ইন্ডিয়া ও ভারত নামের ব্যবহার বিষয়ে রাষ্ট্রীয় ভাবে অফিশিয়ালি কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। এটি সবারই জানা ছিল যে, বিরোধী দলগুলোর জোটের নামকরণ ‘ইন্ডিয়া’ হওয়ার ফলে খুব সাবধানতার সঙ্গে কৌশলে এককভাবে ভারত নামের প্রচলন শুরু করা হয়। বহু বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারত ও ইন্ডিয়া সমানভাবেই পরিচিত নাম। এত বছর পর একটিকে ছেঁটে ফেলার সঠিক কোনো কারণ এটি হতে পারে না। এতকাল ধরে রাহুল গান্ধীকে বহু ব্যক্তি আক্রমণ করা হয়েছে। রাহুলের রাজনৈতিক পরিপক্বতা নিয়েও অনেক কাটাছেঁড়া হয়েছে। লোকসভা নির্বাচনের আগে আগে রাহুলের এই দুই রাজনৈতিক সমন্বয় সব সমালোচনার জবাব হয়েই এসেছে। ইন্ডিয়া জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। একই সঙ্গে প্রশ্নেরও। সবচেয়ে যে প্রশ্নটি বারবার উঠে আসছে, এ জোটের প্রধানমন্ত্রী মুখ কে হবেন?
এই প্রশ্নের কোনো উত্তর জোটের পক্ষ থেকেও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়নি। জোটের অন্দরে এই নিয়ে চাপা ক্ষোভেরও আঁচ পাওয়া যায়। অন্যদিকে বিজেপি মুখে যতই ইন্ডিয়া জোটকে কটাক্ষ করুক না কেন, ভেতরে ভেতরে তারা যে অস্বস্তিতে রয়েছে তার প্রমাণও রয়েছে। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের ইন্ডিয়া জোট ছেড়ে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-তে প্রত্যাবর্তনের জলঘোলা আলাপ ভুলে যাওয়ার কথা নয় কারুরই। এটা স্পষ্টতই জোট ভাঙার একটি চেষ্টা বিজেপির চাণক্যদের। বিজেপি যেভাবে হাইপ তুলছে তাতে এখনই বিভ্রান্ত হবেন না। যত গর্জন সবসময় তত বর্ষণ কখনোই হয় না। দক্ষিণ ভারতের কথা তো আগেই বলেছি, ব্রাহ্মণ্যবাদী রাজনীতির আগ্রাসন রুখতে দীর্ঘকাল ধরে পাঞ্জা কষে লড়াই করে গেছে দক্ষিণ ভারতের মনুবাদবিরোধী দলগুলো। লক্ষ করে দেখবেন, বিজেপি সবসময় বিরোধীদের ভোট কাটাকাটির জোরে অল্প মার্জিনে অনেক ক্ষেত্রে জেতে। এবার ইন্ডিয়া জোট অনেক জায়গাতেই কিন্তু আসন সমঝোতা করে নরেন্দ্র মোদিকে ইতিমধ্যেই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। পাশাপাশি ইলেকটোরাল বন্ডের দুর্নীতি যেভাবে সামনে আসছে তা সমালোচনার মুখে পড়েছে। করপোরেটরা দলে দলে ইলেকটোরাল বন্ড কিনছে নাকি কিনতে বাধ্য হচ্ছে সে নিয়েও কথা শোনা যায়। পাশাপাশি, সিএএ নিয়ে বিরাট সংখ্যক মানুষের মধ্যে যেভাবে সংশয় দেখা দিচ্ছে তা নিঃসন্দেহে বিজেপিকে বিপদে ফেলবে।
লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক
