গত দুদিনের পত্রপত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সবচেয়ে আলোচিত আলাপ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী অবন্তিকার আত্মহনন ও তার লিখে যাওয়া সুইসাইড নোট। এই সুইসাইড নোটটি পড়তে পড়তে আবিষ্কার করি যে, অবন্তিকা কোনোভাবেই দুর্বল মনের কোনো মেয়ে ছিলেন না। অত্যন্ত বলিষ্ঠচিত্তে মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি লড়ে গেছেন। বলাবাহুল্য, আমার এও মনে হয়েছে, আইন বিভাগের শিক্ষার্থী হওয়ার সুবাদে, আইনি জটিলতায় যেন তার পরিবার না পড়েন এবং কে বা কারা তার মৃত্যুর জন্য দায়ী সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নোট তিনি রেখে গেছেন। এখন প্রশ্ন হলো, কেন এ শিক্ষার্থীকে সুবিচার পাওয়ার নিমিত্তে আত্মহত্যার মতো একটি কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হলো? আত্মহত্যা কি মানসিক দুর্বলতা বা বিষণœতা? আত্মহত্যার সামাজিক দায়বদ্ধতা কি নেই?
বিবিসি সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে ২০২১ সালে ১০১ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আঁচল ফাউন্ডেশনের এক গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের (সমমানের মাদ্রাসা শিক্ষার্থীসহ) ৪৪৬ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এর মধ্যে স্কুল ও সমমান পর্যায়ের শিক্ষার্থী রয়েছেন ৩৪০ জন। কলেজ ও সমমান পর্যায়ের আছে ১০৬ জন। এ ছাড়া আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে শুধু মাদ্রাসাগামী শিক্ষার্থী রয়েছে ৫৪ জন। দুর্ভাগ্যক্রমে, আত্মহত্যা বা আত্মহননবিষয়ক গবেষণা খুব একটা হয় না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এর সংখ্যা কত, কী এর কারণ এসব বিষয়ে সঠিক কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য বা উপাত্ত আমার চোখে পড়েনি।
শুরুতেই বলে রাখি, আত্মহত্যা আর আত্মহননের মধ্যে যেমন পার্থক্য আছে, তেমনি আত্মহত্যা আর ইউথেনেশিয়ার তথা স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণের মাঝে বিশদ পার্থক্য বিরাজমান। পৃথিবীতে নির্দিষ্ট কিছু দেশেই শুধু ইউথেনেশিয়াকে আইনগতভাবে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। ইউথেনেশিয়া বা স্বেচ্ছামৃত্যুর ক্ষেত্রে, ব্যক্তিকে অবশ্যই কোনো না কোনো চিকিৎসকের সুপারিশপত্র কোর্টে দাখিল করতে হয়, যেখানে ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার সাপেক্ষে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে, তার শারীরিক কষ্ট সহ্য সীমাকে অতিক্রম করে। তাই সে একটি শান্তিপূর্ণ মৃত্যুবরণ করতে কোর্টের সহযোগিতা কামনা করে। সে ক্ষেত্রে চিকিৎসক, আইন বিশেষজ্ঞ ও একজন নিকটাত্মীয়র কনসেন্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
আবার প্রতিবাদের ভাষা হিসেবেও আত্মাহুতি বা আত্মহত্যার নজির আছে। সাম্প্রতিক অতীতে আরব বসন্ত শুরু হয়েছিল আত্মহননের ঘটনার মধ্য দিয়ে। কিছুদিন আগে গাজায় চলমান গণহত্যার প্রতিবাদে অ্যারন বুশনেলের আত্মাহুতির কথা সবার মনে থাকার কথা। কাঠামোগত বৈষম্যে ব্যক্তি কোণঠাসা হয়ে যখন আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় তার দায় সমাজ বা রাষ্ট্রের। এমিইল ডুরখেইমের বহু আলোচিত বই ‘সুইসাইড’। বইটিতে তিনি দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় ভঙ্গুরতা, সামাজিক সংহতির অভাব, কাঠামোগত বৈষম্য ব্যক্তিকে কীভাবে আত্মহননে উৎসাহিত করে। আবার কখনো আত্মহত্যা বা আত্মহননকে দেখা হয় সম্মান ও সম্ভ্রমের সঙ্গে যুক্ত করে, যার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হচ্ছে জাপান। বলাবাহুল্য, এ ধরনের চেতনা প্রশ্নবিদ্ধ বটেই।
এবার আবার অবন্তিকার প্রসঙ্গে ফেরত আসি। যৌন হয়রানি, হয়রানি বা বুলিংয়ের শিকার একটি প্রাণের নাম অবন্তিকা। সে তার সুইসাইড নোটে লিখেছেন ‘টেকনিক্যাল মার্ডার’। আমি হয়তোবা সেটিকে বলতে চাই সিস্টেমেটিক মার্ডার। অর্থাৎ এ বিষয়টি আত্মহত্যা নয়, বরং প্ররোচিত হত্যার ব্যবস্থাপনা। আমাদের সমাজ, আইন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের ব্যর্থতা ব্যক্তির একচ্ছত্র ক্ষমতার আধিপত্য, সামাজিক নরমেটিভ মূল্যবোধের ন্যক্কারজনক ব্যবহার একটি অত্যন্ত মেধাবী প্রাণকে নিষ্প্রাণ হতে বাধ্য করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবন্তিকার মায়ের মুখে শুনে যা জেনেছি, অবন্তিকার তার কোনো একজন সহপাঠীর যথেচ্ছা মিথ্যাচারিতাকে ঠেকানোর তাগিদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ফেক আইডি খুলে এবং পরবর্তী সময়ে তার অপরাপর সহপাঠী বিষয়টি জানতে পারলে, থানায় অবন্তিকার বিপক্ষে একটি সাধারণ ডায়েরি করে এবং এ সাধারণ ডায়েরিকে কেন্দ্র করেই ২০২২ সাল থেকে শুরু হয় অবন্তিকার ওপর মানসিক নির্যাতন। এই দীর্ঘকালীন সময়ে, অবন্তিকাকে তার এক সহপাঠীর কাছ থেকে নানা ধরনের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, হয়রানি ও যৌন হয়রানির শিকার হয় বলে তিনি অভিযোগ করে গেছেন তার সুইসাইড নোটে। তার ওই সহপাঠীর সঙ্গে খুবই গুরুতরভাবে অভিযুক্ত হিসেবে আমাদের সামনে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহকারী প্রক্টর। বারবার, মৌখিক ও লিখিত অভিযোগ করার পরও অবন্তিকা ও তার পরিবারের কোনো সুরাহা পাননি বলে জানান অবন্তিকার মা। অভিযুক্ত সহকারী প্রক্টর, যিনি কি না জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকও বটে। ঘটনার পরদিন তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘অবন্তিকা মানসিকভাবে বিষণœতায় ভুগছিল, ওষুধ খাচ্ছিল, যা কি না তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’ এখানে এই সহকারী প্রক্টর বিষণœতাকে মুখ্য করে তার নিজস্ব দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। সহকারী প্রক্টরের কথাকে সত্য ধরে নিলেও প্রশ্ন ওঠে, অবন্তিকার এ বিষণœতার কারণ কী ছিল? এ বিষণœতার পেছনে কি কোনো সামাজিক দায়বদ্ধতা ছিল না? আমাদের এ সমাজে কোনো মেয়ে যখন কোনো ধরনের হয়রানি শিকার হয়, তা নির্ভয়ে কোনো জায়গায় প্রকাশ করার মতো কোনো প্ল্যাটফর্মকে আমরা আদৌ তৈরি করতে পেরেছি? কোনো মেয়ে যদি কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হয়, তাহলে তাকেই বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয় নানাভাবে নানা পরিসরে।
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ২০০৯ সালে হাইকোর্টে রায় হয়েছিল যে, সব প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন প্রতিরোধমূলক সেল গঠন করতে হবে। তাহলে কেন এবং কী কারণে সেই রায়ের কার্যকারিতা ২০২৪ সালেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর হয়নি। উপরন্ত এসব কমিটিতে যেসব মানুষকে দেখতে পাওয়া যায়, তারা কি জেন্ডার সেনসিটিভিটি বলে একটি কনসেপ্ট আছে, সেটি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল? এসব সেকশন হ্যারাসমেন্ট কমিটিতে এমন নারীও রয়েছেন, যারা পুরুষতান্ত্রিক সেন্টিমেন্টকে প্রমোট করে। এ আলাপটি শুধু পিতৃতান্ত্রিকতা প্রমোশনের নয়, বরং আলাপটি হচ্ছে বৈষম্যের ধারণা ধারণায়নের। আমরা যদি এসব বাস্তবতা অগ্রাহ্য করি, তাহলে শুধু অবন্তিকা নন, এরকম আরও হাজারো অবন্তিকার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ফলে আমি অনুরোধ করব আত্মহত্যাকে শুধু মানসিক বিষণœতা বা অবসাদগ্রস্ততা, একাকিত্ব দিয়ে নয় বরং তার সামাজিক বাস্তবতা অনুধাবন করা জরুরি। আত্মহত্যা কোনো ব্যক্তিক বিষয় নয়, বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী সি রাইট মিল বলেছিলেন ‘সোশ্যাল ইমাজিনেশন’-এর কথা যেখানে তিনি বলছেন, আজকে আপনি হয়তোবা ভাবছেন আত্মহত্যা একটি ব্যক্তিক বিষয়, কিন্তু এই ব্যক্তিক বিষয়কে যদি আপনি মনোযোগ না দেন, সেটি রূপ নিতে পারে সামাজিক সংকটে; যার ধারাবাহিকতা আমরা অনুধাবন করতে শুরু করেছি।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই, সামাজিক বাস্তবতায় আমাদের তরুণ সমাজ যদি আত্মহত্যা বা আত্মহননকে সমস্যা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হিসেবে গ্রহণ করা শুরু করে, তবে সেটা কি কোনোভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত হয়? যৌক্তিক বিবেচনা বোধে, আত্মহত্যা কখনই কোনো ধরনের সমাধান হতে পারে না, আত্মহত্যা হয়তোবা সাময়িকভাবে একটি জনমত তৈরি করতে পারে, কাঠামোগত ভঙ্গুরতা দৃশ্যমান করে তুলতে পারে, কিন্তু সংকট নিরসনের পথ তৈরি করে না। ফলে বাস্তবতার উত্তরণ ঘটে না। এটিও মনে রাখা প্রয়োজন, আত্মহননের বাস্তবতা একটি সুনির্দিষ্ট সময়ের তীব্র ক্ষিপ্রতাকে নির্দেশ করে। হয়তো সেই সময়টি পার হয়ে গেলে ব্যক্তির মধ্যে আত্মহননের প্রচেষ্টা সীমায়িত করা সম্ভব। বলাবাহুল্য, এ ক্ষেত্রে পরিবার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের দায় থাকে। কাছের মানুষটির মনের যতœ নেওয়া তাই ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের তরুণ সমাজের মধ্যে এই যে আত্মহত্যা করার প্রবণতা, তা নিশ্চিতভাবেই আমাদের শঙ্কিত করে। এ প্রবণতা আমাদের এই বার্তা দেয় যে, ব্যক্তিক ও সামাজিক জীবনের অসহিষ্ণুতা ও লাগামহীন পথে চলা, আমাদের সমাজব্যবস্থাকে কতখানি সংকটময় করে তুলেছে! যতখানি সাহস লাগে একজন অন্যায়ের শিকার হওয়া বিপদগ্রস্ত, অসহায় কিংবা কোণঠাসা মানুষের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে, তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তি সঞ্চয় করে আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো আবশ্যক সম্মিলিতভাবে। যেকোনো ধরনের অন্যায়, নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিপক্ষে কথা বলতে হয়তো আপনি আপনার সব নিকটাত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবকে পাশে পাবেন না। কিন্তু নিজের ওপর আস্থা রাখুন, আত্মবিশ্বাস ও মনোবল যতটা প্রকট হয় আত্মহননের ক্ষেত্রে, তার চেয়ে অনেক কম শক্তি ও সাহস প্রয়োজন প্রতিবাদী হতে। জীবন একটি চলন্ত ট্রেনের মতো, যেখানে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তি ট্রেনের কামড়ায় ওঠে, এসব ব্যক্তির সঙ্গে জীবনের চলতি পথে তাই কখনো ভালো কিংবা তিক্ত অভিজ্ঞতার জন্ম নেয় এ সবকিছু নিয়েই আমাদের জীবন। আমাদের এ তরুণ সমাজের যে আবেগ, আক্ষেপ, অথবা ক্রোধ যেটাই বলি না কেন, তার সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে প্রতিষ্ঠানকে; পরিবার ও রাষ্ট্রকে। মনে রাখা প্রয়োজন, বছরে এই শতাধিক তরুণ প্রাণের আত্মহনন প্রতিরোধে শুধু শোক প্রকাশ করে আর ব্যক্তির দুর্বলতাকে দায়ী করে এড়িয়ে যাওয়ার পথ নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং চালু করা দরকার। শিক্ষকদের বিচক্ষণতা, দায়িত্ববোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের সময় দিতে হবে। মোরাল পুলিশিং বন্ধ করা, হেল্পলাইন চালু করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
