ভদ্রলোকের খেলা ক্রিকেট থেকে ভদ্রতা ক্রমেই খসে পড়ছে। বাড়তি টাকার আশায় খেলোয়াড়রা জড়িয়ে পড়েন ম্যাচ পাতানো, তথ্য পাচারসহ নানান অনৈতিক কর্মকাণ্ড। তবে সতীর্থের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ব্যবসা বোধহয় বাংলাদেশ বাদে বিশ্বের কোনো দেশের ক্রিকেটাররা করেননি। মঙ্গলবার একটি টিভি চ্যানেলে প্রচারিত সংবাদ এবং পরবর্তী সময়ে বুধবার তামিম ইকবালের সঙ্গে মুশফিকুর রহিম, মেহেদি হাসান মিরাজ ও মাহমুদউল্লাহর লাইভে এসে দেওয়া বক্তব্যগুলো থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, ক্রিকেটাররা অর্থের বিনিময়ে যে কোনো কিছুই করতে রাজি।
জনপ্রিয়তার সঙ্গে বাণিজ্যের যোগসূত্র সবসময়েই, কারণ প্রচারেই প্রসার। অর্থের বিনিময়ে ক্রিকেটাররা অনেকেই অনেক পণ্যের দূত হিসেবে হাজির হন পর্দায়। ক্রেতার মনোজগতে প্রভাব বিস্তার করেন একটি নির্দিষ্ট পণ্য কিনতে। বিশেষ করে ভারতে ক্রিকেটারদের বিপুল জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে পণ্যের প্রসার ঘটাতে তৎপর বাণিজ্যিক গোষ্ঠীগুলো। শচিন টেন্ডুলকার, মাহেন্দ্র সিং ধোনি থেকে শুরু করে হালের বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মারা হাজার হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যিক চুক্তি করলেও কেউ নিজেকে বা নিজের ব্যক্তিসত্তাকে বিকিয়ে দেননি। টেন্ডুলকার কোনো অ্যালকোহলিক পানীয় কিংবা তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন করেননি। নিজের বাবাকে দেওয়া কথা রাখতেই কখনো এই ক্ষতিকর পণ্যের বিজ্ঞাপন করেননি টেন্ডুলকার, ‘আমার বাবা আমাকে বলেছিলেন যে তুমি হচ্ছো রোল মডেল। অনেকেই তোমাকে অনুসরণ করে, যে কারণে আমি কখনো কোনো তামাকজাত পণ্য ও অ্যালকোহলিক পানীয়ের বিজ্ঞাপন করিনি। দুই বছর আমার ব্যাটে কোনো স্টিকার ছিল না, অন্যদের তখন দুটো করে স্পন্সর। উইলস আর ফোর স্কয়ার, আমি তবুও তামাকের বিজ্ঞাপন ব্যাটে নিইনি’, ২০২০ সালে ‘সালাম ক্রিকেট’ নামের একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন ভারতের ক্রিকেট কিংবদন্তি।
ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে অ্যালকোহলিক পানীয়ের লোগো অঙ্কিত জার্সি পরতেন না দক্ষিণ আফ্রিকার হাশিম আমলা, যখন ‘ক্যাসেল’ ছিল প্রোটিয়াদের জার্সি স্পন্সর। কেভিন পিটারসেন কিংবা মাইকেল ক্লার্কের সঙ্গে একটা সময় সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায় তাদের নিজ নিজ দলের সতীর্থদের। তবুও কেউ এই সব নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খোলেননি বা বিজ্ঞাপনেও ব্যক্তিগত সম্পর্ককে বাণিজ্যিক রূপ দেননি। তামিম, মুশফিক, মিরাজরা সেটাই করলেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপণন বিভাগের অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, এসব আচরণের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস পায়। ফোনে দেশ রূপান্তরকে তিনি জানান, ‘নগদের ক্যাম্পেইনে এরা যেটা করেছে সেটাকে বলে ড্রামাটাইজেশন, অর্থাৎ কোনো ব্যাপারকে নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই কৌশলটা পুরনো কৌশল, নতুন কিছু না। মানুষের কাছে এমনভাবে বিষয়টা উপস্থাপন করা হবে, যেন মনে হবে নাটকের দৃশ্য। এটা যে নগদই করাচ্ছে সেটা যেন আবার একটু অস্পষ্ট থাকে। এটা আমাদের দেশে খুব একটা দেখিনি।
বিপণনের সূত্রটা হচ্ছে, কেউ নিজের ভাবমূর্তি যত বেশি ব্যবহার করবে তার নিজের থেকে সেটা ততবেশি কমবে। সিনেমার নায়ক, রাজনীতিবিদ বা রেফারেন্স গ্রুপ, যাদের কথায় মানুষ প্রভাবিত হয় বা শোনে, তারা যদি অতিমাত্রায় কোনো পণ্য বা প্রতিষ্ঠানের জন্য নিজেদের ইমেজকে ব্যবহার করেন তাহলে তাদের ইমেজভ্যালু সেই পরিমাণ কমবে, যার জন্য করছে তার বাড়বে। যেমন টেন্ডুলকার ‘বুস্ট ইজ দ্যা সিক্রেট অব আওয়ার এনার্জি’ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে বাচ্চাদের মনে বুস্টের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়েছিলেন। সবচেয়ে বড় ইমেজ হচ্ছে ট্রাস্টওয়ার্দিনেস, মানুষ যেটা বিশ্বাস করে। কেউ যদি অতিমাত্রায় ব্যবহৃত হন তাহলে সেই পরিমাণ তার নিজের ভ্যালু কমে যাবে।’
ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে আগে নগদ-এর বিজ্ঞাপনে এক হয়েছিলেন সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল। অথচ এক সময়ের দুই মানিকজোড়ের মধ্যে বিরোধ এখন তুঙ্গে। টিভিতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাকিব যে ভাষায় তামিমের সমালোচনা করেছেন, সেটা অতীতে কোনো ক্রিকেটার করেছেন এমন নজির নেই। তামিম ইকবালও পাল্টা ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছেন। বিশ্বকাপে না খেলা, জাতীয় দলে না খেলা, নিজের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ ইত্যাদি নানান বিষয়ে মাঝেমধ্যেই তিনি শিরোনাম হওয়ার চেষ্টা করে কোনো সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দেন, কখনো বাসার সামনে সংবাদ সম্মেলনে ডাকেন। বিশেষ করে কোনো আন্তর্জাতিক সিরিজ শুরুর প্রাক্কালে এভাবে স্পটলাইটটা নিজের ওপর টানার চেষ্টাটা অভ্যাসে পরিণত করেছেন তামিম।
সরাসরি কিছু না বলে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে যা বলতে চাইছেন, তার সারাংশ দাঁড়ায় চন্ডিকা হাথুরুসিংহে কোচের ভূমিকায় থাকলে তিনি আর বাংলাদেশ দলে খেলবেন না। তার এই অভ্যাসে সংবাদকর্মীদের একটা বড় অংশও বিরক্ত, সেই সঙ্গে ফেসবুকে সাধারণ মানুষও তার সমালোচনা করছে। তবে তামিম নগদের ক্যাম্পেইনে লাইভে এসে হাসিমুখেই বলেছেন, ‘মানুষ আমাকে গালায়ে উড়ায় ফেলতেসে’। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার এবং জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক যখন এভাবে নিজেকে খেলো বানান তখন ক্রিকেটারদের ওপর গণমানুষের শ্রদ্ধাবোধ কমে আসে। যার প্রমাণ ফেসবুকে নিন্দার স্রোত।
