লাল বলে অনভ্যাসেই ব্যাট হাতে সর্বনাশ

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২৪, ০১:০৯ এএম

অনভ্যাসের ফোঁটা কপাল চড়চড় করে- বাংলা প্রবাদটি যেন সত্যি হলো বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্য। সিলেটে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুই টেস্টের সিরিজের প্রথমটিতে, শনিবার ১৮৮ রানে অলআউট হয়েছে বাংলাদেশ। শীর্ষ ব্যাটসম্যানদের কেউই বলতে গেলে রান পাননি। ক্রিকেট বিশ্লেষক নাজমুল আবেদীন ফাহিম ও সাবেক অধিনায়ক রাজিন সালেহ মনে করেন টেস্ট খেলতে নামার আগে প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল বাংলাদেশের। অন্যদিকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের ব্যবস্থাপক শাহরিয়ার নাফীস জানিয়েছেন পর্যাপ্ত প্রস্তুতিই নিয়েছেন ক্রিকেটাররা।

বছরের তৃতীয় মাসের তৃতীয় সপ্তাহে এসে প্রথম টেস্ট খেলতে নেমেছে বাংলাদেশ দল। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, এই ৮১ দিনে একটিও প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেননি বাংলাদেশের টেস্ট দলের কোনো ক্রিকেটার! বছরের শুরুটা কেটেছে জাতীয় নির্বাচনের ডামাডোলে, এরপর শুরু হয়েছে টি-টোয়েন্টি সংস্করণের বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ। এরপরই শ্রীলঙ্কার সঙ্গে সিরিজের শুরুটা টি-টোয়েন্টি দিয়ে, মাঝে ওয়ানডে এবং এখন চলছে টেস্ট। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগও গড়িয়েছে মাঠে। ঠাস বুনোট সূচি, সবই সাদা বলের খেলা। লাল বলে, অর্থাৎ বড় দৈর্ঘ্যরে ম্যাচ বাংলাদেশের টেস্ট দলে থাকা খেলোয়াড়রা সবশেষ খেলেছিলেন ২০২৩’র ডিসেম্বরে। বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ (বিসিএল) এর ২০ ডিসেম্বরে শেষ হওয়া দুটো ম্যাচই বলা যায় মাহমুদুল হাসান জয়, মুমিনুল হক, জাকির হাসান, শাহাদাত হোসেন, খালেদ আহমেদ, নাহিদ রানাদের খেলা লাল বলের সবশেষ ম্যাচ। এরপর জানুয়ারিতে নির্বাচনের পর মাঠে গড়ানো বিপিএলে ব্যস্ত হয়ে গেছেন প্রায় সবাই, তারপর ঢাকা লিগ যেটা দেশের পেশাদার ক্রিকেটারদের আর্থিক সংস্থানের সবচেয়ে বড় আসর সেখানেও খেলেছেন গোটা দুই-তিনেক ম্যাচ। টেস্ট সিরিজ শুরুর আগে কোনো প্রস্তুতি ম্যাচও না থাকায় দীর্ঘ বিরতিতে লাল বলের ক্রিকেট খেলতে নেমে পড়াটাকেই ব্যাটিং ব্যর্থতার অন্যতম কারণ মনে করেন রাজিন, ‘একটা প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে পারলে ভালো হতো। বিদেশি দল এলে বা বাংলাদেশ বিদেশে গেলে সবসময় একটা প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার রেওয়াজ ছিল, আমরাও খেলেছি। যেহেতু সবাই সাদা বলের ক্রিকেটে ব্যস্ত ছিল, তাদের মানিয়ে নেওয়ার জন্য একটা প্রস্তুতি ম্যাচ সেটা তিনদিনের ম্যাচ হোক বা দুদিনের ম্যাচ হোক, আয়োজন করলে ভালো হতো। টেস্ট হচ্ছে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্করণ, এই ফরম্যাটে খেলার আগে সর্বোচ্চ প্রস্তুতিটাই দরকার।’ ক্রিকেট বিশ্লেষক নাজমুল আবেদীন ফাহিমও মনে করেন, কয়েকজন ব্যাটসম্যানের জন্য বিরতিটা একটু লম্বা হয়ে গেছে, ‘মুমিনুল বিপিএলের শুরুতে ছিল না। রংপুরের হয়ে একটা ম্যাচ খেলেছে, এরপরে আর একাদশে জায়গা পায়নি। মাহমুদুল হাসান জয়ও খুলনার হয়ে একাদশে নিয়মিত ছিল না। যারা তিন সংস্করণেই খেলে তারা টানা খেলার মধ্যে আছে ঠিকই তবে কয়েকজনের জন্য বিরতিটা একটু লম্বা হয়ে গেছে। ওরা ঘরোয়া বা আন্তর্জাতিক, কোনো সংস্করণেই মাঝখানে বেশ খানিকটা সময় খেলেনি।’

টানা সাদা বলে খেলে আসায় ব্যাটসম্যানদের বল ছাড়ার প্রবণতা দেখা যায়নি, তেমনি দেখা যায়নি একাগ্রতা ও ধৈর্যও। উইকেট যে ব্যাটিংয়ের জন্য উপযোগী ছিল তার প্রমাণ তাইজুল ইসলামের ব্যাটিং। এই বামহাতি স্পিনার প্রথম দিনের খেলার শেষ বেলায় নেমেছিলেন নাইটওয়াচম্যান হিসেবে। বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে সর্বোচ্চ রানটা তাইজুলেরই, ৪৭। লিটন কুমার দাস ২৫ ও শাহাদাত দীপু করেছেন ১৮ রান। শ্রীলঙ্কাও প্রথম ইনিংসে ৫৭ রানে ৫ উইকেট হারাবার পর ষষ্ঠ উইকেটে ২০২ রানের জুটি গড়েছিল, সিøপে কামিন্দু মেন্ডিসের ক্যাচ শূন্য রানেই ফেলে দিয়েছিলেন জয়। দিনশেষে যে আক্ষেপটা হয়ে উঠতে পারে হারজিতের পার্থক্য।

শ্রীলঙ্কা সিরিজে কেন প্রস্তুতি ম্যাচ রাখা হয়নি টেস্টের আগে? জানতে চাওয়া হয়েছিল নাফীসের কাছে। দেশ রূপান্তরকে সাবেক এই ক্রিকেটার জানান, ‘প্রস্তুতি ম্যাচ রাখাটা নির্ভর করে বিদেশি দলের চাহিদার ওপর। শ্রীলঙ্কা দলের এই ধরনের কোনো চাহিদা ছিল না। তারা যত দ্রুত সম্ভব সিরিজটা শেষ করতে চেয়েছে। নিউজিল্যান্ড সিরিজে প্রস্তুতি ম্যাচ থাকলেও তারা সেটা বাতিল করেছে। সামনে দক্ষিণ আফ্রিকা আসছে, তারাও কোনো প্রস্তুতি ম্যাচ খেলবে না।’ দেশের টেস্ট ক্রিকেটারদের জন্য কোনো প্রস্তুতি ম্যাচ আয়োজন কেন করা গেল না এর জবাবে নাফীস জানিয়েছেন, ‘যারা লাল বলের কেন্দ্রীয় চুক্তিতে আছে তাদের টেস্ট সিরিজের এক মাস আগে থেকেই কর্মসূচি দিয়ে রাখা ছিল। তারা নিয়মিত লাল বলে অনুশীলন করেছে। ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি সিরিজ যখন হয়েছে, তখন এই সিরিজে জাতীয় দলের বাইরে থাকা যারা টেস্টের ক্রিকেটার, তারা লাল বলে অনুশীলন করেছে।’

যদিও আবেদীন ফাহিম মনে করেন, ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের কারণে বছরের যে সময়টা কমে এসেছে সেটাকে জায়গা দিতে কোপ পড়ছে টেস্টের প্রস্তুতিতে, ‘টেস্টের প্রস্তুতি ম্যাচ তো বাদ পড়ছেই, মূল ম্যাচও কমে যাচ্ছে। অনেক সিরিজের সূচি পুনর্নির্ধারিত হচ্ছে, এই সিরিজ এখন খেলব না তখন খেলব হচ্ছে। এখন সাদা বলের সিরিজের পর ঢাকা লিগ শুরু হলো, এখন নিজেদের ভেতর প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার জন্য যতজন ক্রিকেটারকে ছাড়তে হবে সেটাতে তো ক্লাবগুলো রাজি হবে না। সার্বিকভাবেই একটা সমন্বয়ের অভাব আছে।’ এই সিলেটেই নিউজিল্যান্ডকে বাংলাদেশের মাটিতে হারাবার পেছনে জাতীয় লিগের একটা প্রভাব দেখছেন রাজিন, ‘জাতীয় লিগ শেষ হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে টেস্ট ছিল। তাইজুল, মমিনুলরা বিশ্বকাপের দলে না থাকায় জাতীয় লিগে খেলেছিল, টানা খেলার মধ্যে থাকায় তারা ভালো করেছিল।’

ফাহিম ও রাজিন দুজনেরই প্রত্যাশা, দ্বিতীয় ইনিংসে এবং চট্টগ্রাম টেস্টে এরকমটা হবে না। প্রাথমিক অনভ্যস্ততার ধাক্কাটা কেটে যাওয়ার পর ব্যাটসম্যানরা ভালো করবেন। সত্যিই তেমনটা হলেই হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত