জগন্নাথ হলের মাঠে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সকালে যে ভয়ংকর মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, তা ভিডিও করেছিলেন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. নূরুল উলা। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘যে নারকীয় হত্যাকাণ্ড দেখেছি আমার বাসভবনের জানালা থেকে, টেলিস্কোপ লাগিয়ে মুভি ক্যামেরায় তা ধরে রেখেছি’।
সেদিনের ভিডিও ধারণের ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল, না-কি হঠাৎ করে মনে হওয়াতে দৃশ্যধারণ করেছিলেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রদত্ত ঐতিহাসিক ভাষণের পর থেকেই একটা ধারণা হয়েছিল যে এবার একটা বিরাট কিছু পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। তাই তখন থেকেই বিভিন্ন সভা, শোভাযাত্রা, বিক্ষোভ মিছিল, মশাল মিছিল ব্যারিকেড ইত্যাদির ছবি তুলতে আরম্ভ করি।
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন ভিডিও টেপ ক্যামেরাটি ছিল ছাত্রদের হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়ার জন্য। স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রস্তুতিপর্বে তিনি ক্যামেরাটি নিজের কাছে রেখেছিলেন। ৭ মার্চের পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে ছাত্রছাত্রীরা সামরিক প্রশিক্ষণ শুরু করে। গেরিলা যুদ্ধের কলাকৌশল রপ্ত করতে থাকে। বুয়েটের দুটি ছাত্রাবাস কায়েদে আযম হল ও লিয়াকত হলের নাম বদল করে রাখা হয় যথাক্রমে তিতুমীর হল ও সোহরাওয়ার্দী হল। কয়েকজন ছাত্র কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের গবেষণাগার থেকে প্রচুর রাসায়নিক সরিয়ে নেয়। সে সময় বিভাগের প্রধান ছিলেন ড. এ কিউ চৌধুরী। তিনি কয়েকজন ছাত্রকে ডেকে রসায়ন ল্যাবের চাবি দিয়ে বলেন, তোমরা কী কী নেবে আমি কিছু জানি না। আমি কিছু দেখিনি। যদি কিছু করো, সেটা যেন স্বাধীনতার কাজে লাগে।
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ল্যাবরেটরিতে একটি ট্রান্সমিটার ছিল। ছাত্রনেতা সিরাজুল আলম খান, হাসানুল হক ইনু প্রমুখের হয়ে এনামুল হক নামের এক ছাত্র নূরুল উলাকে বলেন দেশের গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে বঙ্গবন্ধু যদি কিছু বলতে চান, ট্রান্সমিটারটি কাজে লাগানো যেতে পারে। নূরুল উলা বললেন, কার কথায় আমি এটি উপযোগী করে তুলব, সে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে অনেক কিছু ভাবার আছে। তবে বঙ্গবন্ধু যদি বলেন, অবশ্যই দায়িত্ব নেব। কয়েকজন ছাত্র তাকে একদিন বঙ্গবন্ধুর কাছে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসভবনে নিয়ে যান। তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলে এসে বলেন, নেতার নির্দেশ পেয়ে গেছি। এরপর দ্রুত তিনি রেডিও ট্রান্সমিটার যন্ত্রটি কেবল সচল করেননি, উন্নতও করেন।
তিনি বলেন, আমাকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির ভেতরের একটা কক্ষে নিয়ে যাওয়ার পরে দেখলাম সেখানে সোফার ওপরে তিনজন বসে রয়েছেন। মাঝখানে বঙ্গবন্ধু। ডানে সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেব ও বাঁ পাশে তাজউদ্দীন সাহেব। আমি ঢুকে বঙ্গবন্ধুকে সালাম করলাম। আগেও অনেকবার তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল। তিনি আমাকে ঘরের এক কোণে নিয়ে কাঁধে হাত রেখে বললেন- ‘নূরুল উলা আমাকে ট্রান্সমিটার তৈরি করে দিতে হবে। আমি যাওয়ার বেলায় শুধু একবার আমার দেশবাসীর কাছে কিছু বলে যেতে চাই। তুমি আমায় কথা দাও, যেভাবেই হোক একটা ট্রান্সমিটার আমার জন্য তৈরি রাখবে। আমি শেষবারের মতো ভাষণ দিয়ে যাব।’ বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ তখন আমার কাছে বাচ্চা শিশুর আবদারের আবেগময় কণ্ঠের মতো মনে হচ্ছিল। এর পরেই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তড়িৎ কৌশল বিভাগের অন্য শিক্ষকদের কাছে সব কথা খুলে বললাম। শুরু হলো আমাদের কাজ। বিভাগীয় প্রধান ড. জহুরুল হকসহ প্রায় সব শিক্ষকই আমাকে সহযোগিতা করতে লাগলেন। ৯ দিন কাজ করার পর প্রস্তুত হলো আমাদের ট্রান্সমিটার। এর ক্ষমতা বা শক্তি ছিল প্রায় সারা দেশব্যাপী। শর্টওয়েভে এর শব্দ ধরা যেত। যাহোক পরবর্তী সময়ে এর ব্যবহার সম্ভব হয়নি। এসবের মধ্যেই আমার মাথায় একটা চিন্তা এলো যদি কোনো হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ বা গোলাগুলি হয় তা আমি ক্যামেরায় তুলে ফেলব। সে থেকেই ক্যামেরাটি আমার সঙ্গে রাখতাম।
জগন্নাথ হলের নারকীয় হত্যাদৃশ্য তোলার সিদ্ধান্ত কীভাবে নিলেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন ২৫ মার্চ রাতে বিকট শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে যায়। আমি ভেবেছিলাম, আগের মতোই হয়তো ছাত্রদের ভয় দেখাবার জন্য ফাঁকা গুলি করা হচ্ছে। অথবা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা আমাদের নির্দেশ ও সহযোগিতায় যে সমস্ত হাতবোমা তৈরি করছিল তারই কিছু হয়তো বিস্ফোরিত হয়েছে। সারা রাত আতঙ্কের মধ্যে কাটালাম। জানালা দিয়ে মাঝে মাঝে জগন্নাথ হলের দিকে তাকাতাম। কিন্তু বিদ্যুৎ লাইন কেটে দেওয়াতে এলাকাটি অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল। রাতে শুধু গোলাগুলির শব্দ শুনছিলাম। একসময় স্পষ্ট বুঝতে পারলাম যে জগন্নাথ হলে ছোটখাটো লড়াই হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে আমার ক্যামেরাটার কথা মনে পড়ে গেল। অপেক্ষা করতে লাগলাম কখন সকাল হবে আর দিবালোকে ছবি তুলতে পারব।
এমনভাবে ক্যামেরা বসানো হয়েছিল যে বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই। পুরো ক্যামেরাটা কালো কাপড় দিয়ে মোড়ানো ছিল। সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যবর্তী সময়ে ক্যামেরা চালু হয়। জগন্নাথ হল সংলগ্ন ছিল বুয়েটের শিক্ষকদের আবাসিক ভবন। ভবনের জানালা দিয়ে দেখা গেল জগন্নাথ হলের সামনের মাঠে কিছু ছেলেকে ধরে বাইরে এনে লাইনে দাঁড় করানো হয়েছে। এ সময়ে ক্যামেরা অন করা হয়। ক্যামেরাটির একটা বিশেষ গুণ ছিল, এতে মাইক্রোফোন দিয়ে একই সঙ্গে শব্দ তুলে রাখা যায়। তিনি টেপের সঙ্গে মাইক্রোফোন যোগ করে ক্যামেরা চালু করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেল ছেলেগুলোকে এক ধারসে গুলি করা হচ্ছে ও একজন একজন করে পড়ে যাচ্ছে। পাকিস্তানি সেনারা আবার হলের ভেতরে চলে গেল। এই ফাঁকে তিনি টেপটা ঘুরিয়ে বাসার টেলিভিশন সেটের সঙ্গে লাগিয়ে ছবি দেখেন ঠিকভাবেই সব উঠছে।
তিনি আবার জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখেন, আরও কিছু লোককে ধরে এনে লাইনে দাঁড় করানো হয়েছে। জগন্নাথ হলের দৃশ্য দেখে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে প্রায় পাগলের মতো হয়ে যান অধ্যাপক ড. নূরুল উলা। তার কাছে বাড়তি টেপ ছিল না। আগের কিছু টেপ মুছে সেই টেপ ব্যবহার করেন নতুন দৃশ্য তোলার জন্য। দুঃখ করে তিনি জানান, যদি নতুন টেপে ছবি তুলতে পারতেন তাহলে পাকিস্তানি সৈন্যদের অপরাধ আরও ভালোভাবে ধরে রাখা যেত। দ্বিতীয় বারের লাইনে দেখলেন, একজন বুড়ো দাড়িওয়ালা লোক রয়েছে। সে বসে পড়ে হাত জোর করে ক্ষমা চাইছে। দাড়ি দেখিয়ে বোঝাতে চেয়েছিলেন তিনি মুসলমান। কিন্তু বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী তার কোনো কথাই শুনতে চায়নি। তাকে গুলি করে মারা হলো। মাঠের পূর্বপার্শ্বে পাকিস্তানি সৈন্যরা একটা তাঁবু বানিয়ে ছাউনি করেছিল। সেখানে চেয়ারে বসে কয়েকজন চা খেতে খেতে হাসি-তামাশা ও আনন্দ উল্লাসে ফেটে পড়ছিল।
ড. নূরুল উলা বলেন, যাদের মারার ছবি ক্যামেরায় রয়েছে তাদের দিয়ে প্রথমে হলের ভেতর থেকে মৃতদেহ বের করে আনা হচ্ছিল। মৃতদেহগুলো এনে সব এক জায়গায় জমা করা হয়। জীবিতদের দিয়ে লেবারের কাজ করার পরে আবার ওদেরই লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। জমা করা মৃতদেহের সংখ্যা দেখে তার মনে হয়েছিল অন্তত ৭০/৮০ জন হবে। ছাত্র ছাড়াও হলের মালি, দারোয়ান, বাবুর্চি এদেরও একই সঙ্গে গুলি করা হয়েছে। কাউকেই গুলি না করে ছেড়ে দেওয়া হয়নি। তবে এই পর্যায়ে একটা বিশেষ ঘটনা দেখলেন ড. নূরুল উলা। তার ভাষ্যে- লাইনে দাঁড় করাবার পরে এক পাকিস্তানি সেনাকে গুলি করার নির্দেশ দিচ্ছিল অফিসার। নির্দেশদাতা অফিসার ছিল গুলি করার দায়িত্বে থাকা সেনার পেছনে। সেনাটিকে গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হলে, সে মুহূর্তের জন্য পেছনের নির্দেশদাতা অফিসারের দিকে তাকায় আর এই ফাঁকে লাইনে দাড়ানো দুজন সামনে মৃতদেহের স্তূপের মধ্যে শুয়ে পড়েন। তাদের একজন ছিলেন কালীরঞ্জন শীল। তিনি আরও প্রায় ৩০ বছর বেঁচেছিলেন ২৫-২৬ মার্চের নারকীয়তার সাক্ষী হয়ে। গুলি করার পর খান সেনারা কয়েক ঘণ্টার জন্য এলাকা ছেড়ে চলে গেল। সেই ফাঁকে ওই দুজন উঠে প্রাণভয়ে পালায়। পরবর্তী সময়ে তাদের একজন নূরুল উলার বাসায় এসে আশ্রয় নিয়েছিল।
ড. নূরুল উলা থেমে থেমে ভিডিও করছিলেন, পাছে টেপ ফুরিয়ে যায়। তাই সব ছবি তুলতে পারেননি। পরে যখন বুলডোজার দিয়ে সব লাশ ঠেলে গর্তে ফেলা হয় সে ছবি তিনি তুলতে পারেননি। পরিবারের সদস্যদের জীবনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তাকে বাসা ছেড়ে চলে যেতে হয়। এ সময় টেপ সঙ্গে করে নেওয়াটা আরও বিপদের ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে বাসাতেই সেগুলো তিনি যত্ন সহকারে রেখে যান। এ ঘটনা তার স্ত্রী ছাড়া আর কেউ জানত না।
১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর তিনি এ টেপের কথা প্রকাশ করেন। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক ও অন্যদের দেখান। জগন্নাথ হলের ছাত্রদেরও দেখানো হয় সেই ভয়ংকর সব দৃশ্য। অনেক বিদেশি সাংবাদিক তার কাছে বহু অর্থের বিনিময়ে এই মূল্যবান টেপের অরিজিনাল কপি কিনতে চাইলে তিনি রাজি হননি।
অসম সাহসী ও দেশপ্রেমিক এই মানুষটি ২৬ মার্চ সকালে যে উপস্থিত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের জীবনের ঝুঁকি সত্ত্বেও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অপরাধ ক্যামেরাবন্দি করে রেখেছেন, সেটা ভাবলে এত বছর পরও শিহরিয়ে উঠতে হয়। ঘটনার ৫৩ বছর পর, সেই ২৬ মার্চই প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ওই অবিস্মরণীয় ঘটনার স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এ উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছে বিশেষ স্মারক-পুস্তিকা, যাতে নূরুল উলা সম্পর্কে একটি বিশেষ লেখার শিরোনাম ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা, বুয়েটের গৌরব’। তিনি ছিলেন হাশিখুশি, ছাত্রদের কাছে আপনারজন। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট সম্প্রতি তার স্মৃতিসংরক্ষণে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে বুয়েটের অনেকে সক্রিয় অবদান রাখেন। এ প্রসঙ্গে বুয়েটের আরেক শিক্ষক ড. জহুরুল হকের কথা বলা যায়। তিনি বুয়েটের ট্রান্সমিটারের বার্তা গ্রহণের জন্য এক ব্যান্ডের রেডিওর সার্কিট ডিজাইন করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে বুয়েটের অনেক ছাত্র মুক্তিবাহিনী ও মুজিব বাহিনীতে যোগ দিয়ে রণাঙ্গনে বীরের মতো লড়েছেন, কয়েকজন আত্মাহুতি দিয়েছেন।
লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক এবং বুয়েটের সিন্ডিকেট সদস্য