সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কোটি টাকার বালু নামমাত্র মূল্যে বেচতে চান ইউএনও

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২৪, ০২:১৭ এএম

কক্সবাজারের পেকুয়ায় বন বিভাগের জব্দ করা বালু একপ্রকার গায়ের জোরে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিতে চাইছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। এ নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে ইউএনও এবং বন বিভাগের মধ্যে। মন্ত্রণালয়ে চলছে পত্র চালাচালি। ৪ লাখ ৬ হাজার ঘনফুট বালু যে বন বিভাগ জব্দ করেছে এ ব্যাপারে পরিবেশ আইনে মামলা করা আছে। পেকুয়ার সংরক্ষিত বনে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি বসিয়ে অবৈধভাবে কয়েকটি সিন্ডিকেট উত্তোলন করে এসব বালু।

বন বিভাগের মতে, ২০২৩ সালের ২৫ মে বারবাকিয়া রেঞ্জের টৈটং বনবিটের মধুখালী (চকরিয়ার হারবাং রিজার্ভ এলাকা) সংরক্ষিত বনের গহীন জঙ্গল থেকে ওই বালু জব্দ করেন বিট কর্মকর্তা জমির উদ্দিন। যার বাজারমূল্য কোটি টাকার বেশি। বন বিভাগের জব্দকৃত সেই বালু সম্প্রতি ফের ভ্রাম্যমাণ আদালত কর্তৃক জব্দ দেখিয়ে তা নিলামে বিক্রির জন্য দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শুরু করেছেন পেকুয়ার ইউএনও সাইফুল ইসলাম।

বন বিভাগ জানায়, সংরক্ষিত বনের ভেতর থেকে বন বিভাগের জব্দকৃত বালু বিক্রির জন্য নিলাম প্রক্রিয়া শুরু না করতে ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা কর্তৃক পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে একটি পত্রও দেওয়া হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মোতাবেক দেওয়া সেই দাপ্তরিক পত্রে রেঞ্জ কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন সংরক্ষিত বনের ভেতর থেকে জব্দকৃত বালু যদি বের করা হয়, তাহলে সংরক্ষিত বনের জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে। এ ছাড়া সংরক্ষিত বনের কোনো কিছু নিলাম দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় থেকে প্রশাসনিক অনুমোদন নিতে হয়। মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়া আগ বাড়িয়ে কিছু করার নিয়ম নেই।

বন বিভাগের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, সিন্ডিকেট সংরক্ষিত বনের ভেতর শ্যালো মেশিন ও ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বালুগুলো উত্তোলন করেছে তারা দাগি অপরাধী। সেখানে হত্যা মামলার আসামির পাশাপাশি একাধিক বন মামলার আসামিও রয়েছে। মূলত এসব অপরাধীর ইন্ধনেই পেকুয়ার ইউএনওর মাধ্যমে বন বিভাগের জব্দকৃত বালু নিলামে তুলে মোটা অঙ্কের টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করার চেষ্টা করছে প্রভাবশালী একটি চক্র।

পেকুয়ার ইউএনও কর্তৃক বন বিভাগের জব্দকৃত বালু নিলামে তোলার প্রক্রিয়ায় উদ্বেগ জানিয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা হাবিবুল হক বলেন, ‘বন বিভাগের জব্দকৃত বালু চাইলেই উপজেলা প্রশাসন নিলামে তুলতে পারেন না। কারণ বনজদ্রব্য নিলামে তুলতে গেলে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু গায়ের জোরে পেকুয়ার ইউএনও বন বিভাগের জব্দকৃত বালু নিলামে তোলার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।’

রেঞ্জ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘টৈটং বনবিটের নিয়ন্ত্রণাধীন সংরক্ষিত বনের মধুখালী এলাকায় যেসব বালু জব্দ করা হয়েছে সেই স্থানটি চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের অধীন। গায়ের জোরে কিছু করতে চাইলে তা রীতিমতো বন বিভাগের সঙ্গে উপজেলা প্রশাসনের মধ্যে দ্বন্দ্বের শামিল।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় পরিবেশ সচেতন একাধিক ব্যক্তি বলেন, ‘বন বিভাগ কর্তৃক জব্দকৃত বালুগুলোর বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক কোটি টাকার বেশি। কিন্তু ইউএনওকে হাত করে বালুদস্যুরা সেই বালু নামমাত্র মূল্যে হাতিয়ে নেওয়ার তৎপরতা চালাচ্ছে। এজন্য কম মূল্যে নিলাম প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে একটি বালুদস্যু সিন্ডিকেট কাজ শুরু করেছে।’

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকতা (ডিএফও) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘বিভাগীয় মামলামূলে সংরক্ষিত বনের ভেতর বন বিভাগের জব্দকৃত বনজদ্রব্য দ্বিতীয়বার অন্য কেউ জব্দ করতে পারে না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে বিধি মোতাবেক নিলামে তোলা যাবে। বন আইনে এটা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।’

পেকুয়ার ইউএনও সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমেই বালুগুলো জব্দ করা হয়েছে। এ নিয়ে বন বিভাগ কী বলছে না বলছে তা আমলে নেওয়ার সুযোগ নেই। আগামী সপ্তাহে এসব বালু নিলামে তোলা হবে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত