শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ঘুরছে না তাঁতিদের ভাগ্যের চাকা

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৪, ০২:১৩ এএম

জামদানি নামটি বাঙালি সংস্কৃতির অংশ। এ দেশে জামদানি শাড়ির ইতিহাস কয়েকশ বছরের। প্রাচীনকালের মিহি মসলিন কাপড়ের উত্তরাধিকারী হিসেবে জামদানি শাড়ি বাঙালি নারীদের অতিপরিচিত। জামদানির আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার নোয়াপাড়া বিসিক শিল্প নগরীর জামদানি পল্লী। একসময় জামদানি পেশার সঙ্গে জড়িত ছিল প্রায় ১০ হাজার তাঁতি। আর্থিক অবস্থার উন্নতি না হওয়া এবং বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতায় অন্য পেশায় চলে যাওয়ায় ধীরে ধীরে এই সংখ্যাও কমছে। বর্তমানে জামদানি পল্লীতে তাঁতির সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার।

ঈদ, পহেলা বৈশাখসহ বিভিন্ন বিশেষ দিবসে জামদানির কদর বাড়ে। আর এ সময় জামদানি পল্লীর তাঁতিদের ব্যস্ততা বেড়ে যায় বহুগুণে। এবারের ঈদে ১৫০ কোটি টাকার জামদানি বিক্রির টার্গেট থাকলেও যার সিংহভাগ লভ্যাংশ যায় পাইকার-মহাজন, বড় বড় শপিং মলের দোকানিদের পকেটে। এই লভ্যাংশের নগণ্য অংশ পান তাঁতিরা। 

এখানকার জামদানি দেশের গন্ডি পেরিয়ে ভুটান, ভারত, নেপাল, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে যায়। তাঁতিরা তাদের নিপুণ হাতে বিভিন্ন ধরনের কারুকাজে জামদানি তৈরি করে থাকেন। এখানে একেকটি জামদানি শাড়ি ৫ হাজার থেকে শুরু করে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত দাম হয়ে থাকে। একেকটি শাড়ি তৈরি করতে এক সপ্তাহ থেকে সর্বোচ্চ এক মাস পর্যন্ত সময় লাগে।

জামদানি শাড়ি তৈরি শেষে মহাজন ও পাইকাররা তাদের কাছ থেকে শাড়ি কিনে নিয়ে যান। একেকটি শাড়ি থেকে সব খরচ বাদ দিয়ে একজন তাঁতির সর্বনিম্ন ১ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ থাকে। যে শাড়িতে ২০ হাজার টাকা লাভ থাকে, সেটি তৈরি করতে এক মাসের বেশি সময় লেগে যায়। এসব শাড়ি বড় বড় শপিং মলসহ দেশের বাইরে বিভিন্ন স্থানে পাঠান পাইকাররা। তাঁতিরা একেকটি শাড়িতে লাভ পান ১ হাজার টাকা। সেখানে মহাজন ও পাইকাররা লাভ করেন কয়েক গুণ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, জামদানি পল্লীর তাঁতিরা দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। জামদানি শাড়ি তৈরি করে যে টাকা পাওয়া যায়, তা দিয়ে সংসার খরচ চালানোটাই দায়। জামদানি পল্লীর তাঁতিদের বাড়িঘরেও কোনো উন্নতি হয়নি। এ পেশায় তুলনামূলক আয় না বাড়ায় অনেকে ইজিবাইক, লেগুনা ও বিভিন্ন কল-কারখানায় কাজ করছেন। অনেকে বাপ-দাদার পেশা তাই ছাড়তে পারছেন না। জামদানি পল্লীতে প্রায় ৩০টি শাড়ির শোরুম রয়েছে। তারাও তাঁতিদের কাছ থেকে তুলনামূলক কম দামে শাড়ি কিনে নিয়ে চওড়া দামে বিক্রি করে।   

কথা হয় তাঁতি মিলনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘১০ বছর ধইরা শাড়ি বুনি। সপ্তাহে ৩ হাজার টাহা দেয়। মাসে প্রায় ১২ হাজার টাহা বেতন পড়ে সব মিলাইয়া। এই টাহা দিয়ে সংসার চালানোই কষ্ট হইয়া গেছে।’

তাঁতি ইমরান হোসেন ও তার স্ত্রী সালমা বেগম মিলে ১২ বছর ধরে জামদানি শাড়ি তৈরির কাজ করছেন। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। প্রতি মাসে শাড়ি তৈরি করে তারা দুজন মিলে ৩০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন। তাদের বড় ছেলে দ্বিতীয় শ্রেণি আর মেয়ে নার্সারিতে পড়ে। তারা জানান, বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সংসার চালাতেই কষ্ট হচ্ছে। অথচ তাদের কাছ থেকে যে মহাজনরা শাড়ি কিনে নিয়ে যান, তারা একেকজন কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছেন।

এ ব্যাপারে জামদানি পল্লীর শিল্প নগরীর কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা তাঁতিদের জন্য মেলার আয়োজন করেছি ৫ দিনব্যাপী। তাঁতিরা অনেকে মহাজন বা পাইকারদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে শাড়ি তৈরি করেন, এ কারণে তারা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত