এক দিনের অতিরিক্ত ছুটি ও সাংবাদিকদের রোনাজারি

  • ছুটি নিয়ে গুজব বন্ধ করুন, সংবাদপত্রই এখনো নিয়ন্ত্রক
আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৪, ০২:২৪ পিএম

প্রিন্ট মিডিয়াকে নিয়ে সারা দুনিয়াতেই হা হুতাশ চলমান। আর বাংলাদেশ তো গুজবে আরেক কাঠি সরেস। আমরা যারা এই অধম আছি-প্রিন্ট মিডিয়াতেই কাজ করছি আঁকড়ে ধরে আছি— তারা তো করোনা সংক্রমণের ভয়ের থেকেও প্রিন্ট মিডিয়ার বন্ধ হয়ে যাওয়ার দুঃস্বপ্নে কাটিয়েছি। যাই হোক করোনার কালকে বেশ সম্মানের সঙ্গেই মোকাবিলা করে সংবাদপত্র টিকে আছে। বরং করোনার পর পত্রিকার কাটতি বেড়েছে। আবার কোনো পত্রিকা করোনার সময় পাঠক চাহিদা বেড়েছে।

নিজেদের কানটা নিজেদের চেক করতে হবে। এত বিপন্ন ভাবার কিছু নেই সংবাদ পত্রের বাইরে গত ১৫ বছরে অন্য মিডিয়া কি এমন তোলপাড় করা খবর দিয়েছে যে বাংলাদেশে এর প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাবে। 

কথায় কথায় সারা দুনিয়ার প্রিন্ট মিডিয়ার উদাহরণ দিয়ে থাকেন আমাদের রথী-মহারথীরা। টেলিভিশনে কথা বলেন, নানা মতামত দিয়ে থাকেন। সাজানো বিতর্ক প্রতিযোগিতায় তারা সকলেই যেন মূল বক্তা। তবে মজার বিষয় হলো বক্তব্যের মূল খোরাক আসে প্রকাশিত কোনো সংবাদের জের ধরে। সর্বশেষ একটি পত্রিকার এক রিপোর্ট নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াসহ সব অঙ্গনেই ফিসফাস থেকে শুরু করে আলোচনা সমালোচনার মূল বিষয় সেই রিপোর্ট। 

এবার প্রথমবারের মতো সংবাদপত্র রমজানের ঈদে টানা ছয় দিন ছুটি ঘোষণা করেছে। টানা শব্দটা বলছি এ কারণে যে, স্বাভাবিক নিয়মে এই ছুটিটা টানা চার দিন হতো ঈদের দুই দিন আগে, ঈদের দিন এবং তার পরের দিন। নিয়মমাফিক এই ছুটির হিসেব শেষ হওয়ার কথা শুক্রবার। পরের দিন পত্রিকা অফিসে কাজ চলার কথা।তার পরদিন রবিবার ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ। সংবাদপত্রের ছুটি। তো এবার পত্রিকার সরবরাহকারী মানে হকার সংগঠনগুলো শনিবার মাঝখানে খোলা না রাখার অনুরোধ করেছেন সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নোয়াবকে। হকারদের অনুরোধও যৌক্তিক। একদিনের জন্য তারা দুই দিনের সময়টা নষ্ট করতে চান না। নোয়াবের এই সিদ্ধান্তের ফলে সংবাদপত্রের সকল শ্রেণির পেশাজীবীরা ছয় দিনের ছুটি পাচ্ছেন। 

তাহলে আমরা দেখি মাত্র একদিন অতিরিক্ত ছুটি পেল সংবাদপত্র। এখন এখানে প্রশ্ন আসতে পারে একই পেশায় টেলিভিশন, অনলাইন এবং প্রিন্ট মিডিয়ার ছুটি কমবেশি হবে কেন? একজন সাংবাদিক হিসেবে এই প্রশ্নটাই আমাদের সামনে আনা উচিত। যেভাবে প্রিন্টের সঙ্গে যুক্তরা এবার ছয় দিন ছুটি পেলেন, অন্য মিডিয়ার কর্মীদেরও ছয় দিনের ছুটির অধিকার দাঁড়িয়েছে। অনলাইন ও টেলিভিশন মিডিয়া স্বাভাবিকভাবে তিন বা চার দিনের ছুটি পায়। আবার যারা ঈদের সময় ডিউটি করেন কোনো কোনো হাউস ঈদের ওই সময়ের চেয়ে বেশি তাদের কর্মীদের ছুটি দেন এবং ঈদের ছুটিতে কাজ করার জন্য অতিরিক্ত সম্মানী দিয়ে থাকেন। কাজেই এবারও তাদের ক্ষেত্রে সেই নিয়ম করার জোর দাবি আমি আমার এই লেখার মাধ্যমে জানাচ্ছি। 

এবার আসি এক দিনের অতিরিক্ত ছুটি নিয়ে আমার প্রিন্ট মিডিয়ার বন্ধুদের শবযাত্রার করুন সুর বাজানোর বিষয়ে। গত দুদিন ধরে প্রিন্ট ও সংবাদমাধ্যমের লোকজন অতিরিক্ত এক দিনের ছুটির কারণে পত্রিকার বিদায় ঘণ্টা বাজানো শুরু করেছেন। আচ্ছা পত্রিকা তো পাঠকের জন্য তাই না? তাহলে শনিবার অফিস করে আমরা কি পত্রিকা দেব যার জন্য মানুষ বড় উৎসব নষ্ট করে পত্রিকা পড়বে হুমড়ি খেয়ে। সরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ যেসব জায়গায় পত্রিকার কাটতি বেশি এবং বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশনসহ ছোটবড় বাজারস্থল। সবই থাকবে বন্ধ। খুব বড় ঘটনা ঘটলে টেলিভিশন, অনলাইন এবং হালের সবচেয়ে বড় মিডিয়া ফেসবুক ও ইউটিউব তো আছেই।

আর যদি প্রিন্ট মিডিয়ার সংকট ঘনীভূতই হয় তবে এটাকে তো ২৪ ঘণ্টা চালু রেখেও রুখতে পারবেন না। এত ভয় কিসের! ভয়ের কিছু নেই। ঈদের ছুটিতে বড় কোনো কিছু না হলে সবাই ঘোরাঘুরি করবে এবং নাটক সিনেমা ও বিনোদনমূলক প্রোগ্রামগুলো দেখবে। এটাই হয়ে আসছে। আশার বিষয় হলো এখন প্রত্যেক পত্রিকার অনলাইন রয়েছে এবং টেলিভিশনের মিনি ভার্সন ডিজিটাল রয়েছে। তাদেরও ফেসবুক ও ইউটিউব রয়েছে। প্রত্যেক হাউসের একটি টিম ঈদে কাজ করবে। পরে তারা এই ছুটি অন্য সময় নিয়ে নেবে। আর প্রিন্ট মিডিয়ার বিদায় ঘণ্টা বাজলে কি হবে আপনার জন্য তো কনটেন্টের বাজার খোলা। 

আমি এ নিয়ে ফেসবুকের বন্ধুদের হা হুতাশের উদাহরণ দেই— একজন বলতে বলতে এমনই বলেছেন, যে তিন দিন পর তিনি কি করবেন বুঝতে পারছেন না। কেউ বলছেন, এই কয়দিনে তিনি বোর হয়ে যাবেন। কেউ বলছেন, এই ছয় দিনের ছুটির কারণে এটা স্পষ্ট প্রিন্ট মিডিয়ার প্রয়োজনীয়তা শেষ। কেউ কেউ নোয়াবকে গালমন্দ করছেন।

মিলিয়ে দেবেন ১০ বছর পর। দায়িত্ব নিয়েই বলছি। আমরা যদি নিজেরা সাংবাদিকতাকে— আগে আসলে আগে পাবেন, মাটিকাটা, জি হুজুর, এ বিষয়ে আপনি বলেন মার্কা গতে নিয়ে যেতে থাকি প্রিন্ট কেন সবগুলোই তার প্রয়োজনীয়তা হারাবে। শুধুই থাকবে নিম্নমানের রাজনৈতিক কর্মীদের কুতার্কিক শো আর আকাশ থেকে আজও একটি চাঁদ এসে পড়েছে কপালে। আর এখনকার মতোও যদি সাংবাদিকতা হয় তবে পত্রিকার কাটতি বাড়বে। পাঠক বাড়বে। এখন আমরা নানা ছুতায় সার্কুলেশনটা যদি বন্ধ না রাখি। আমরা জানা মতে এখনো পাঠক চাহিদার চেয়ে অনেক কম ছাপা কাগজ বাজারে আছে। 

ছুটিটা এনজয় করুন। বাংলাদেশ এখনো সংবাদপত্রের দিকেই তাকিয়ে আছে। এখনো মানুষগুলো পশ্চিমা বা ইউরোপিয়ানদের মতো হয়নি যে অন্য বই কিনে কিনে পড়বে। রাস্তায় মেট্রোতে বই পড়বে। আর যারা ছুটিতে বোর ফিল করবেন তারা পত্রিকার অনলাইনগুলোতে নিয়মিত রিপোর্ট দিয়ে নিজেকে হতাশা থেকে দূরে রাখুন। অযথা গুজব ছড়াবেন না। ছুটিকে পরিবার, পরিজন বন্ধুদের সঙ্গে উপভোগ করুন। আর তাতেও যদি চিন্তা দূর না হয়- তাহলে আজই হকারকে বলুন-এই ঈদের পর আর পত্রিকা দেবে না। আমি কিন্তু আর নেই। তবে যাই করুন কোনো অঘটনের মতো সিদ্ধান্ত কেউ নেবেন না যেন। খবরটা ছাপতে হলেও সোমবার মানে ১৫ তারিখের আগে হবে না। 

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত