শুক্রবার, ৩১ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ছয় মাস যুদ্ধের পরও শান্তি প্রক্রিয়া যেন সুদূরপরাহত

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০৩ এএম

গত বছরের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের ওপর হামাসের হামলার ঘটনায় গাজার ওপর ইসরায়েলের আক্রমণের ছয় মাস অতিবাহিত হয়েছে। হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নারী ও শিশুর হত্যা, বসতি ধ্বংস, লাখ লাখ ফিলিস্তিনি অনাহার ও অভুক্ত অবস্থায় দিন অতিবাহিত করলেও শান্তি যেন সুদূরপরাহত। এখন পর্যন্ত যুদ্ধে ইসরায়েল শুধু ৩৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যাই করেনি পাশাপাশি তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদেরও একটু একটু করে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। বিশ্ব জনমতের চাপে মিত্ররা এখন আর প্রকাশ্যে ইসরায়েলকে সমর্থন দিতে পারছে না। ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়া মানে ফিলিস্তিনিদের রক্তের দায় তাদের ওপর বর্তানো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও জনমতের চাপে ইসরায়েলের ইচ্ছার বিপক্ষে নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাস করতে দিয়েছে। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নিতানিয়াহুর (বিবি) মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্পর্কে একটু হলেও ফাটল ধরেছে।

সেভ দ্য চিলড্রেন-এর হিসাব মতে গাজায় এ পর্যন্ত ১৩ হাজার ৮শ শিশু নিহত হয়েছে ও ১২ হাজার শিশু আহত হয়েছে। অন্যদিকে ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলায় প্রায় ১২শ ইসরায়েলি নিহত হয় এবং হামাস ২৫৩ জনকে জিম্মি করে, এর মধ্যে ১৩০ জন এখনো জিম্মি অবস্থায় আছে, ৩৪ জন নিহত হয়েছে।

হামাসের হামলা নিঃসন্দেহে ইসরায়েলিদের মধ্যে কঠিন ক্ষত তৈরি করেছে। ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের ‘নির ওজ’ শহরে হামলায় সেদিন যারা নিহত হয়েছিলেন বা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন তাদের ও স্বজনদের ক্ষত অনুমান করা যায়। ‘নির ওজ’ শহরে হামাসের হামলা ও ইসরায়েলের গাজা আক্রমণ উভয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘদিনের পারস্পরিক অবিশ্বাসকে আরও বেশি তীব্র করেছে। এমনকি ইসরায়েল ও গাজায় উভয় পক্ষে যারা শান্তির পক্ষে সোচ্চার ছিলেন তারাও যেন শান্তির কোনো সুবাস দেখতে পাচ্ছেন না। সম্প্রতি বিবিসির সাংবাদিক জেরেমি বোয়েন এই শহরে ঘুরে আসেন। তিনি দেখতে পান আক্রান্ত হওয়ার পর বেশিরভাগ বাসিন্দা এখন আর সেখানে থাকেন না, মাঝে মধ্যে কিছু সময়ের জন্য এসে আবার চলে যান। জেরেমির সঙ্গে এ-রকম একজন বাসিন্দার কথা হয় যার নাম ইয়ামিত আভিটাল। ঘটনার দিন ইয়ামিত আভিটাল তেল আবিব ছিলেন, তার স্বামী শিশুদের নিয়ে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন, তবে হামাসের আক্রমণে তার ভাই নিহত হয়। আবার কবে থেকে নিজ বাড়িতে বসবাস শুরু করবেন এই প্রশ্নে ইয়ামিত জানান ‘আমি জানি না। জিম্মিরা ফিরে এলে হয়তো আমরা এখানে বসবাস করার কথা চিন্তা করতে পারি। গাজায় আমার অনেক বন্ধু (জিম্মি) আছে।’

এতো গেল নির ওজ শহরের পরিস্থিতি কিন্তু এই মুহূর্তে গাজার অবস্থা কী? খান ইউনিস-এর ধ্বংসযজ্ঞ বা গাজা সিটি অথবা রাফায় তাঁবুতে ১.৪ মিলিয়ন আশ্রয়গ্রহণকারী ফিলিস্তিনি কী অবস্থায় দিনাতিপাত করছে? বিদেশি সংবাদিকরা সেখান থেকে কোনো খবর পাঠাতে পারেন না। কারণ ইসরায়েল ও মিসর গাজা সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করে এবং সেখানে বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। মাঝে মাঝে কিছু বিদেশি সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয় যাদের আবার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।

নির ওজ ও গাজার পরিস্থিতি বলে দেয় হামাস ও ইসরায়েল উভয়েই যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করেছে। ইসরায়েল সাধারণ গাজাবাসীদের ওপর যে ধরনের শক্তি প্রয়োগ করেছে তা শুধু অবিবেচকই নয় ও ফিলিস্তিনিদের ওপর নৃশংস আক্রোশকেই বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে। ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস ইতিমধ্যে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ তদন্ত করে দেখছে। যদিও ইসরায়েল গাজায় যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হওয়ার যেকোনো অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তবে পারিপার্শ্বিক তথ্য ও প্রমাণ বলে দেয়, যুদ্ধের নামে ইসরায়েল যা করছে তা স্রেফ গণহত্যা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হলোকাস্টের শিকার হওয়া ছয় মিলিয়ন ইহুদি জনগোষ্ঠীর ওপর দিয়ে ইসরায়েল নামক যে রাষ্ট্রের সৃষ্টি তার বিরুদ্ধে এখন গণহত্যার অভিযোগ। শুনতে একটু অদ্ভুতই বটে। যদিও এই ঘটনার জন্য ইসরায়েলের অনেক সমর্থক হামাসের ওপরই সমস্ত দোষ চাপিয়ে দিতে চায়। তবে আজকের এই অবস্থার জন্য ইসরায়েলের নিজের দায় কোনো অংশে কম না। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইসরায়েল নিজেকে অন্তর্ভুক্তমূলক না করে ক্রমাগতভাবে একটি বর্ণবাদী রাষ্ট্র হিসেবে পরিণত করেছে, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বৈষম্য প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করেছে, তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। জেরেমি বোয়েন তার নিবন্ধে দ্রিমিত্রি দিলিয়ানি নামে একজন ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক কর্মীর উদ্ধৃতি দিয়েছেন, ‘শিশুহত্যা শিশু হত্যাই। কোন শিশু হত্যার শিকার হলো তা এখানে বিবেচ্য না। কে হত্যা করল সেটাও এখানে বিষয় না।’ ‘আমি হলোকাস্টকে স্বীকার করি, কিন্তু তার মানে এটা ইসরায়েলিদের আমাদের জনগণ ও অন্যদের ওপর গণহত্যার চালানোর কোনো সবুজ সংকেত না।’

যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইসরায়েল গাজা অবরুদ্ধ করে রেখেছে। গাজাবাসীকে খাদ্য, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করে রাখছে। যদিও আন্তর্জাতিক চাপের কাছে বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে অবরোধ কিছুটা শিথিল করলেও যতটুকু সাহায্য গাজায় পৌঁছাচ্ছে তা নিতান্তই অপর্যাপ্ত। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সাহায্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী গাজায় ফিলিস্তিনিরা এখন দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন। অক্সফাম-এর তথ্য মতে গাজার উত্তরে আটকেপড়া প্রায় ৩ লাখ ফিলিস্তিনি জানুয়ারি থেকে দৈনিক মাত্র ২৪৫ ক্যালোরি দিয়ে জীবনযাপন করে আসছে।

ফিলিস্তিনিদের দুর্দশার কথা প্রতিনিয়ত ফিলিস্তিনি সংবাদিকরা বিশ্ব সংবাদমাধ্যমে তুলে আনছেন। বিভিন্ন সাহায্য সংস্থার প্রতিবেদনেও তাদের দুর্দশার চিত্র ফুটে উঠেছে। তবে সাম্প্রতিক গাজায় ইসরায়েলি নৃশংসতার ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে গত ১ এপ্রিল ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের সাত জন কর্মীর নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে। এই মৃত্যু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইসরায়েলের পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে এবং ইসরায়েলকে আরও বেশি বন্ধুহীন করে দিয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় ইসরায়েল একে একটি সাধারণ ভুল হিসেবে চালিয়ে দিতে চাইলেও শেষে ব্যাপক সমালোচনার মুখে দুই জন সামরিক কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করতে বাধ্য হয়। ফলাফল স্বরূপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইসরায়েলের পশ্চিমা মিত্ররা গাজার ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায় অবরোধ শিথিল করার জন্য ইসরায়েলের ওপরও চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছে। ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেন-এর কর্মীদের নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে যেন আবারও প্রমাণিত হলো, গাজায় শক্তিপ্রয়োগের ক্ষেত্রে ইসরায়েল কতটা খামখেয়ালি আচরণ করে। হয়তো সে কারণেই ইসরায়েলের সমর্থক হওয়া সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও তার উগ্র ডানপন্থি জোটকে আর নিঃশর্ত সুরক্ষা দিতে চাইছেন না। অন্যদিকে এই ঘটনা ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আবারও প্রশ্ন তৈরি করেছে, এই হত্যাকা-কে কেন এত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এটা কি এই জন্য যে নিহতের ছয় জনই পশ্চিমা, যেখানে হাজার হাজার গাজার বেসামরিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে এবং ত্রাণকর্মীদের ওপর ইসরায়েলের আক্রমণও নতুন কিছু নয়।

এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইসরায়েলের ওপর কতটুকু চাপ প্রয়োগ করতে পারে তাই এখন দেখার বিষয়। ভবিষ্যতে চাপ অব্যাহত থাকলে, এই চাপের কাছে নতি স্বীকার করে ইসরায়েল বেসামরিক লোকদের হত্যার ব্যাপারে আরও বেশি সতর্ক হবে, গাজার খাদ্য ও ত্রাণ সরবরাহ বাড়িয়ে সেখানে দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় আরও বেশি সচেষ্ট হবে। আবার নেতানিয়াহুকে বাগে না এনে অন্য কোনো সমঝোতা হলে তিনি তা অগ্রাহ্য করতে পারেন এবং রাফায় সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে অটল থাকবেন। আপাতদৃষ্টিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বেসামরিক জনগণের বাস্তবসম্মত সুরক্ষা পরিকল্পনা ছাড়া রাফায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের বিরোধী।

যুদ্ধের ছয় মাস পরে একদিকে পশ্চিমা চাপ অন্যদিকে দেশের মধ্যেও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ বাড়ছে। হাজার হাজার মানুষ এখন ইসরায়েলি শহরগুলোতে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে। ইসরায়েলি রাজনীতিকদের মধ্যে অনেকেরই ধারণা জন্মেছে যে নেতানিয়াহু যতটা পারছেন যুদ্ধকে প্রলম্বিত করছেন, এভাবে তিনি জাতীয় নির্বাচনকে পিছিয়ে দিতে পারছেন। হামাসের আক্রমণের পর ইসরায়েলিদের মধ্যে জাতিয়তাবোধের ক্ষেত্রে যে ঐক্য তৈরি হয়েছিল তাতে আবার ধীরে ধীরে ফাটল দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলে এতদিনে যুদ্ধ বন্ধের ব্যর্থতা ও জিম্মিদের মুক্ত করতে না পারার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করাকে দেশদ্রোহিতা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। আবার এই যুদ্ধের সুস্পষ্ট বিজয় ছাড়া বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও তার জোট সঙ্গীদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারও হুমকির সম্মুখীন।

অন্যদিকে যুদ্ধের পর গাজার শাসনভার কার ওপর ন্যস্ত করা হবে সে সম্পর্কে কোনো পরিকল্পনা এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের মধ্যে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ক্ষেত্রে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও তার জোট মোটেও আগ্রহী না। ফিলিস্তিনিদের স্বাধিকারের স্বীকৃতি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার না দিয়ে এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা আদৌ কি সম্ভব? একদিকে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও অবিশ্বাস, গাজার বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া ইসরায়েলি গণহত্যা ও অন্যদিকে ঘটনা পরম্পরায় ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থাহীনতা ও দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস যে একটি জটিল পরিস্থিতির তৈরি করেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

(বিবিসি-তে প্রকাশিত জেরেমি বোয়েনের নিবন্ধ অবলম্বনে)

লেখক: উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত