করোনা মহামারীর কারণে দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকা এবং দেশের কর্মজীবীদের আয়-উৎপাদনের সুযোগের অভাবে বাংলাদেশের মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর চাপ আরও বেড়ে গিয়েছিল। ফলে ওই সময় বাংলাদেশে বাল্যবিয়ে বেড়ে যায়। জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনএফপিএর গত মার্চে প্রকাশিত এক জরিপ বলছে, বাংলাদেশে এ মহামারীর সময় বাল্যবিয়ে বেড়ে ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছিল। বাল্যবিয়ের সবচেয়ে বেশি প্রভাব ছিল লক্ষ্মীপুরে, কম ছিল রাঙ্গামাটিতে।
ইউএনএফপিএর এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহামারীর শুরুর দিকে বিভিন্ন সংস্থা আশঙ্কা করেছিল বাল্যবিয়ের হার যে কারণগুলোতে বাড়ে সেগুলো আরও শক্তিশালী হবে এবং পরবর্তীকালে বাল্যবিয়ের হার বৃদ্ধি পাবে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল।
এমজেএফ নামের একটি সংস্থা ইএনএফপিএর হয়ে ১০-১৯ বছর বয়সী মেয়েদের একটি দ্রুত সমীক্ষা পরিচালনা করেছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে এসব তথ্য সংগ্রহ করেছে সংস্থাটি। জরিপের সময় ১০-১৯ বছর বয়সী মেয়েদের মধ্যে বাল্যবিয়ের হার ছিল ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ। জাতিসংঘের এ জরিপে, জেলা পর্যায়ের কিছু চিত্রও তুলে এনেছে। জেলা পর্যায়ের জরিপে দেখা যায়, কভিডের সময় হওয়া এসব বাল্যবিয়ের হার রাঙ্গামাটিতে ছিল সবচেয়ে কম ৪ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে লক্ষ্মীপুর জেলায় বাল্যবিয়ের হার ছিল সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত।
জরিপের তথ্য বলছে, এ মেয়েদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি মহামারী চলাকালে বিয়ে হয়েছিল এর মধ্যে ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ ২০২১ সালে এবং ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ ২০২০ সালে।
জাতিসংঘের এ সংস্থা বলছে, বাল্যবিয়ে মানবাধিকারের লঙ্ঘন এবং বাংলাদেশে বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া ১৮ বছরের কমবয়সী মেয়েদের জন্য আইনত অনুমোদিত নয়। এসব আইন ও নীতির বাইরেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ
সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, মহামারীর শুরুতে বাল্যবিয়ের হার বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। তাই প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমানের সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করেছে জাতিসংঘের এ প্রতিষ্ঠানটি। ইউএনএফপিএ দেখতে চেয়েছে, বাল্যবিয়ে বেড়ে যাওয়ার কতটা প্রত্যক্ষ কারণ ছিল ‘মহামারী’।
জরিপে ১৫-১৯ বছর বয়সী উত্তরদাতাদের মধ্যে ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ বিবাহিত ছিল। আর ১০-১৪ বছর বয়সী মেয়েদের ১ দশমিক ৮ শতাংশ সমীক্ষার সময় বিবাহিত ছিল।
বাল্যবিয়ের কারণে এসব মেয়ের জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ব্যবহারের ধারণা খুব কমই হয়েছিল। ফলে বড় অংশই জন্মনিরোধক সামগ্রী ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিল না। জরিপে দেখা যায়, ১৫-১৯ বছর বয়সী বিবাহিত মেয়েদের মধ্যে ৩৪ শতাংশ এবং ১০-১৪ বছর বয়সী ৩৩ শতাংশ কোনো গর্ভনিরোধক পদ্ধতি ব্যবহার করেনি। তবে যথাক্রমে ৪৪ শতাংশ এবং ৫৫ শতাংশ পিল ব্যবহার করছিল।
নিম্ন আর্থসামাজিক স্তরের মেয়েরা কিছু ধরনের গর্ভনিরোধক ব্যবহার করার সম্ভাবনা বেশি ছিল এবং এসব গরিব মেয়ে ধনী মেয়েদের তুলনায় ইনজেকশন ব্যবহার করার সম্ভাবনা অনেক বেশি ছিল বলে মন্তব্য করা হয়েছে জরিপ প্রতিবেদনে।
করোনার সময় ১৫-১৯ বছর বয়সী মেয়েদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশের (৩২ দশমিক ৬ শতাংশ) বিয়ে হয়েছিল ২০২১ সালে। একই বছর ১০-১৪ বছর বয়সীদের অর্ধেকেরও বেশি (৫৬ দশমিক ৫ শতাংশ) বিয়ে হয়েছিল।
২০২১ বা ২০২০ সালে অল্পবয়সী বিবাহিত মেয়েদের বিয়ে হয়েছিল বলে মনে করে ইউএনএফপিএ। তবে প্রাপ্তবয়স্ক বিবাহিত মেয়েদের বেশিরভাগই মহামারী শুরু হওয়ার আগে বিয়ে হয়েছিল। ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ৮০ শতাংশেরই বিয়ে হয়েছিল জরিপের আগের দুই বছরে।
জরিপের সাক্ষাতের সময় মেয়েরা বাল্যবিয়ে, উৎপীড়ন এবং অন্যান্য ধরনের সহিংসতার জন্য মহামারীতে অন্য সময়ের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছে।
ইউএনএফপিএর এ প্রতিবেদনে পরামর্শ দিয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের ওপর মহামারী এবং লকডাউনের কার্যকারণ প্রভাব বোঝার জন্য আরও কাজ করা দরকার। গবেষণাটি বেশ কয়েকটি প্রশ্ন উত্থাপন করে, যা আরও তদন্তের যোগ্যতা রাখে বলে মনে করে সংস্থাটি।
এসব বাল্যবিয়ের কারণে দেশের জনমিতিক জরিপেও প্রভাব পড়েছে। গত মার্চে স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৩ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। এতে বাল্যবিয়ের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কভিডের কারণে দেশের বাল্যবিয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
দেশে বাল্যবিয়ে বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে : এক বছরের ব্যবধানে দেশে বাল্যবিয়ের হার বেড়েছে। বাল্যবিয়ে বাড়লেও নারীদের সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা কিছুটা কমেছে। ২০২৩ সালে দেশে ১৫ বছরের কমবয়সী নারীদের বিয়ের হার বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ, অথচ এ হার ২০২২ সালেও ছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
জরিপে দেখা যায়, ২০২৩ সালে দেশে ১৫ বছরের কমবয়সী নারীদের মধ্যে বিয়ের হার ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ, ২০২২ সালেও এ হার ছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এ ছাড়া ১৮ বছরের আগে বিয়ের হারও বেড়েছে। গত বছর দেশে এ বয়সী নারীদের বিয়ের হার ছিল ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ, অন্যদিকে ২০২২ সালেও এ হার ছিল ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ।
দেশে হঠাৎ করে বাল্যবিয়ে বেড়ে যাওয়ার ব্যাখ্যায় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের পপুলেশন অ্যান্ড সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ড. আমিনুল হক বলেন, করোনার সময় অর্থাৎ ২০২০-২১-এ যাদের বিয়ে হয়েছিল তাদের যে চাপ, এসব নিতে হচ্ছে তাদের বান্ধবীদের। ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর স্কুল প্রায় বন্ধ ছিল, স্কুল থেকেই অনেক শিক্ষার্থীর মন উঠে গেছে। হয়তো তার নাম আছে স্কুলের খাতায়। ওই সময় যেসব মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, তাদের বান্ধবীর বাবা-মায়েরা এখন এসে সামাজিক চাপে পড়েছেন। তাদের মেয়েদের বিয়ে আটকে যাচ্ছে হয়তোÑ সেই চিন্তায় বাবা-মায়েরা তাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ে দিচ্ছেন। টানা দুই বছর পড়াশোনার গ্যাপের কারণেও কিছুটা প্রভাব পড়েছে।
জরিপের তথ্য বলছে, কখনো বিয়ে হয়নি বর্তমানে দেশে এমন নাগরিক রয়েছে ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে পুরুষের আধিক্যই রয়েছে। ২০২৩ সাল পর্যন্ত কখনই বিয়ে হয়নি এমন পুরুষের হার ছিল ৩৫ দশমিক ৮ শতাংশ, যেখানে নারীদের হার ২১ দশমিক ৭ শতাংশ।
একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মঈনুল ইসলাম মনে করেন, বাল্যবিয়ে ঠেকানোর জন্য সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না। তৃণমূল পর্যায়ে বাল্যবিয়ে নিরোধ যে কমিটি আছে সেগুলো কাজ করছে না। ২০৩০ সালের মধ্যে শূন্যে নামিয়ে আনার যে লক্ষ্যমাত্রা সেটি পূরণ করা সম্ভব হবে না।
দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন দম্পতিরা। বর্তমানে দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহারের হার ৬২ দশমিক ১ শতাংশ, ২০২২ সালেও যা ছিল ৬৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সাহান আরা বানু বলেন, দেশের নারীরা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন কারণ অনেক নারী কর্মজীবী, বিশেষ করে শিক্ষিত নারীরা। তাদের কর্মের কারণে তারা স্বামীর কাছ থেকে দূরে থাকেন। দেশের শিক্ষিত নারীদের দেরিতে বিয়ের প্রবণতাও বেড়েছে।
কমেছে নারীদের প্রজনন হার : প্রজনন হার বলতে বোঝায় ১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী একজন নারী কতজন সন্তান জন্ম দিতে পারেন। ২০২২ সালে নারীদের প্রজনন হার কিছুটা বেড়ে ২ দশমিক ২০ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু বছরের ব্যবধানে ২০২৩ সাল শেষে তা কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ১৭ শতাংশ।
নারীদের প্রজনন হার কমে যাওয়ার ব্যাখ্যা জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ শেখ ইমতিয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের কর্মজীবী নারীর হার বেড়েছে।
দেশের মানুষের গড় আয়ু কিছুটা কমেছে। বিপরীতে দেশের মৃত্যুহারও বেড়েছে। অন্যদিকে দেশের নারীদের প্রজনন হার বছরের ব্যবধানে কমে গেছে। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কারণে বেড়ে গেছে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর দাম। তাই এ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহারও কমিয়ে দিয়েছেন দম্পতিরা।
