পরিবহন শ্রমিকরা ঈদের বাড়তি খরচ কোথায় পাবে?

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৪, ১২:৩১ এএম

ঈদ উৎসবের আমেজ শুরু হয় বাড়ির পথে যাত্রা করার সময়। প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে শহরের অধিকাংশ মানুষ নানা ভোগান্তি ঠেলে গ্রামে ফেরেন। এই ঈদযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকে গণপরিবহনের চালক, সুপারভাইজার ও হেলপার। আর তাদের রক্তে রঞ্জিত হলো আমাদের হাত!

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর জানাচ্ছে, বাড়তি ভাড়া চাওয়ায় কথা কাটাকাটির জেরে যাত্রীদের বেধড়ক পিটুনিতে ইতিহাস পরিবহনের চালক ও হেলপারের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার দুপুরে আশুলিয়ার ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ (ডিইপিজেড) এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। যাত্রীরা এমন বর্বর হবে কজনই বা ভেবেছিল? 

এ ঘটনায় দুটি প্রশ্ন ঘোরপাক খাচ্ছে:  ১. পরিবহন খাত কতটা নিয়ন্ত্রণহীন হলে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকের মধ্যে এমন ঘটনা ঘটতে পারে? ২. বেশি ভাড়া চাইলেই মেরে ফেলতে হবে? হামলা করতে হবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর ভাবতে ভাবতে এবার কিছু বিষয়ে আলোকপাত করা যাক। পরিবহন শ্রমিকদের বাড়তি ভাড়া চাওয়া আইনত বৈধ না হলেও কোন যুক্তিতে তারা এটা দাবি করছে? এর প্রয়োজনীয়তা কোথায়? সহজে কিছু ব্যাপার উঠে আসে। আপনার আমার যেমন ঈদ আনন্দ আছে, তাদেরও আছে। ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে আমাদের যে বাড়তি খরচ হয়, পরিবহন শ্রমিকরা এই আওতার বাইরে নয়। আপনি যদি একজন ব্যবসায়ী হন, তবে রমজান মাসে বাড়তি বিক্রি কিংবা মুনাফা থেকে ঈদের বাড়তি খরচ মেটাতে পারবেন বা খুব সহজে এসব খরচের জোগান দিতে পারেন। চাকরিজীবীদের জন্যও বোনাস আছে। কিন্তু দেশে বর্তমানে অর্ধ কোটিরও বেশি গণপরিবহন শ্রমিক রয়েছে। ঈদে তাদের বাড়তি আয়ের নিয়মতান্ত্রিক কোনো সুযোগ নেই। দৈনিক যে মজুরি তারা পান, সেটাও চলার জন্য যথেষ্ট নয়।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যমতে, দেশে গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত নিবন্ধিত মোটরযান ৫৮ লাখ ৯৭ হাজার ২৪১টি। এ সংখ্যা থেকে ব্যক্তিগত শ্রেণির ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৯৩৪টি গাড়ি বাদ দিলে থাকে ৫৪ লাখ ৩০৭টি। এর মধ্যে বাস ৫৪ হাজার ১৫৮টি, কাভার্ড ভ্যান ৪৭ হাজার ৬৪টি, মাইক্রোবাস ১ লাখ ২০ হাজার ৯৩টি, মিনিবাস ২৮ হাজার ৩০৯টি, হিউম্যান হলার ১৭ হাজার ৩৮৭ এবং মোটরসাইকেল আছে ৪২ লাখ ৬৯ হাজার ৪৩০টি।

১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশ, ২০০৬ সালের শ্রম আইন এবং সর্বশেষ সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী নিয়োগপত্র, বেতন, মজুরি, বোনাস, ভাতা, প্রভিডেন্ট ফান্ড ইত্যাদি বিষয়গুলো লিপিবদ্ধ থাকলেও বেশিরভাগ বেসরকারি পরিবহন মালিক চালক-শ্রমিকদের এসব অধিকার নিশ্চিত করেন না। অর্থাৎ আইন থাকলেও রাষ্ট্রীয় তদারকির অভাবে তার বাস্তবায়ন নেই।

অন্যদিকে কল্যাণ তহবিলের নামে শ্রমিকদের কাছ থেকে শ্রমিক সংগঠন নিয়মিত যে চাঁদা নেয় তা থেকেও দুর্দিনে তেমন কোনো সাহায্য পান না তারা। তাই কোনো দিন গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকলে শ্রমিকদের কাটাতে হয় মানবেতর জীবন। অনেকটা দিনে এনে দিনে খাওয়ার মতো সাদামাটা জীবন তাদের। মোদ্দাকথা মালিক, শ্রমিক সংগঠন ও সরকার— সব পক্ষেরই উদাসীনতার বলি দেশের অন্যতম বৃহৎ এ খাতের শ্রমিকেরা। 

সাপ্তাহিক কিংবা সরকারি ছুটির দিন, আমাদের জীবনে থাকলেও এ খাতের মানুষগুলো কখনো ছুটি নিতে পারেন না। আমাদের গতিময় জীবন নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বছরের প্রতিটি দিন নিরাপদ কোনো ভবিষ্যৎ না থাকা সত্ত্বেও তারা শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। বিরামহীন ঘাম ঝরিয়ে যাওয়া এই মানুষগুলোরও ইচ্ছে হয় ঈদে প্রিয়মুখে হাসি ফোটাতে, প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ কাটাতে। আমাদের মতো ঘরে থেকে পরিবার, স্বজন কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের সুযোগও তাদের নেই। এতে যে আমাদের ঈদযাত্রা, ছুটিতে ঘোরাঘুরি বন্ধ হয়ে যাবে!

আবার নিজেদের ঈদ আনন্দ বিসর্জন দিয়ে এই মানুষগুলো চায় বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তানদের চেহারায় আনন্দ দেখতে। যৎসামান্য ঈদ উপহার পরিবারের সদস্যদের দিতে। আর এটা নিশ্চিত করতে বাড়তি যে অর্থের প্রয়োজন সেটার জোগান আসলে কোথায়? তারা বোনাস পান না, টিপসও নয়। তাই হয়তো কিছু টাকা বাড়তি নেয় ভাড়া হিসেবে। তাতে যদি ঈদ আনন্দটা পাওয়া যায়। সেটা অবশ্য বছরের পর বছর ধরে আমরা দিয়ে আসছি। যদিও তাদের চাওয়ায় আবদারের চেয়ে বেশি উগ্র অধিকারই থাকে। এটাও তাদের সীমাবদ্ধতা। প্রয়োজন আছে বলেই যাত্রীদের কাছ থেকে গলাকাটা ভাড়া আদায় করবে সেটা কখনো কাম্য নয়। ঠিক এই মুহূর্তে আমরা ক্ষুব্ধ হই, অপরাধ জেনেও গায়ে হাত তুলি।

আমরা কি কখনো ভেবেছি পরিবহন শ্রমিকদের ত্যাগ, বঞ্চনার কথা? আমরা শুধু খিটখিটে মেজাজের রূঢ় আচরণটাই দেখি। আমাদের চোখে এরা আজন্ম লোভী, শিষ্টাচারহীন, অশিক্ষিত এক শ্রেণি। সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী বড় কর্মকর্তারা কি লোভহীন? তাহলে হাজার কোটি টাকা যায় কোথায়? যখন সেবাপ্রত্যাশী হিসেবে তাদের কাছে যান তখন কতোটা শিষ্টাচার উনারা প্রদর্শন করেন? এখানেই আমরা চুপ, নিরবে মেনে নিই সব। যত প্রতিবাদ আর ক্ষোভ দুর্বল মানুষগুলোর ওপর। তাদের কাছে সুন্দর আচরণ প্রত্যাশার আগে ভেবে দেখি না হতদরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা মানুষগুলোর বিদ্যার দৌড়ই বা কতটুকু?

যেখানে বড় কর্মকর্তাদের উচ্চতর ডিগ্রি, বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ থাকার পরও সদয় আচরণ অনিশ্চিত, সেখানে লেখাপড়া কম না না জানা, ন্যূনতম প্রশিক্ষণ না পাওয়া এই পরিবহন শ্রমিকদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত ব্যবহার প্রত্যাশা কতটা সমীচীন? আমরা নিজেরাই বা তাদের প্রতি কতটা সম্মান দেখাই? সর্বশেষ কবে তাদের বলেছি, শুভ সকাল, আপনি কেমন আছেন? এসব আমরা ভাবতেও পারি না। সব মিলিয়ে আস্থা আর সম্মানে ব্যাপক পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। এ থেকে সহজে অনুমেয়, উভয়পক্ষের মনে এ ক্ষোভের জন্ম একদিনে হয়নি।

দিনে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম আর রাতে বাসের করিডোর কিংবা ছাদে মশার কামড়ে ঘুমানো। ভাসমান এ জীবন যাদের তাদের জন্য এগিয়ে আসতে হবে রাষ্ট্রকে। পরিবহন খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে শুধুমাত্র দুর্ঘটনা রোধে আইন করে চালক-সহকারীর শাস্তি নিশ্চিত করলেই হবে না, সেইসঙ্গে প্রয়োজন তাদের জীবনমান উন্নয়নে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এজন্য শ্রমিকদের যথাযথ মজুরি, বোনাস, চিকিৎসাভাতা, ইনস্যুরেন্স, প্রভিডেন্ট ফান্ড নিশ্চিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে নজরদারি ও বাস্তবায়নকারী সংস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে; যাতে মালিকপক্ষ ও সরকার উভয়পক্ষের ভূমিকা থাকবে। অর্থের জোগান দেবে মালিকপক্ষ, পৃষ্ঠপোষকতায় থাকবে সরকার। এর পাশাপাশি যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পরিবহন পরিচালনায় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং যাত্রীদের সঙ্গে সুন্দর আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে যাত্রীদেরও সচেতন করতে হবে।

বলা যায়, রাষ্ট্রপক্ষ সরব হলে মালিকপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনগুলো তাদের দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসবে। তাতে যাত্রী-শ্রমিক অসন্তুষ্টি দূর হয়ে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে। সৃষ্টি হবে ন্যায্য ভাড়া চাওয়ার পরিবেশ।

 

লেখক: বিভাগীয় প্রধান, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত