বুধবার, ২৯ মে ২০২৪, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আর্থিক ও পারিবারিক টানাপোড়েনে ‘নির্মম পরিণতি’ বেড়েছে

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:৪৩ পিএম

গত ৭ এপ্রিল ঢাকার তালতলার মোল্লাপাড়া এলাকার একটি বাসা থেকে বাবা-ছেলের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ বলছে, ছেলেকে খুন করার পর আত্মহত্যা করেছেন ওই বাবা। তিনি মেয়েকেও মেরে ফেলার চেষ্টা চালিয়েছেন। মশিউর রহমান নামে ওই ব্যক্তি একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানিতে চাকরি করতেন। সেখান থেকে চাকরি চলে যাওয়ার পর কয়েক বছর ধরে বেকার ছিলেন এবং হতাশায় ভুগছিলেন। এরপর তিনি শেয়ার ব্যবসা শুরু করেন। সম্প্রতি তাতেও ক্ষতির মুখে পড়েন। এ হতাশা থেকেই তিনি এমন ঘটনা ঘটিয়েছেন। 

গত ৩০ জানুয়ারি গোপালগঞ্জে বাবার একাধিক বিয়ে নিয়ে শাশুড়ির মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে নিজের হাতে ৩ কন্যা সন্তানকে বিষ খাওয়ানোর পর নিজে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন পলি বেগম নামে এক গৃহবধূ। এ ঘটনায় এক মেয়ে মারা যায়। 

অন্যদিকে গত ২৭ জানুয়ারি কুষ্টিয়ার মঙ্গলবাড়িয়া এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে বাবা ও তার ৭ বছর বয়সী ছেলেকে পাশাপাশি রশিতে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। ছেলেকে হত্যার পর তিনি আত্মহত্যা করেছেন। ২ ফেব্রুয়ারিতে নীলফামারীতে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে শ্বাসরোধে হত্যার পর আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন এক ব্যবসায়ী। ২৭ জানুয়ারি খুলনায় দুই সন্তানকে হত্যার পর এক মায়ের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। 

স্বজনকে হত্যার পর আত্মহত্যা কিংবা একসঙ্গে আত্মহত্যার মতো এমন ঘটনা বেড়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আর্থিক অনিশ্চয়তা ও পারিবারিক সমস্যা থেকে এমন ঘটনা ঘটছে বলে জানা গেছে। পুলিশের তথ্য বলছে, গত তিন বছরই দেশে গড়ে তিন হাজারের বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। করোনাকালে বেশ কিছু নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটে, যেগুলোয় পরিবারের সদস্য বা স্বজনেরাই জড়িত ছিলেন। স্ত্রী, সন্তান বা মা-বাবাসহ পরিবারের ছোট্ট শিশুকে পর্যন্ত হত্যার ঘটনা ঘটে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সামাজিক বন্ধন ও পারিবারিক সম্পর্ক দুর্বল হওয়ায় এ ধরনের ঘটনাগুলো ঘটছে। পরকীয়া, সম্পত্তি ভাগাভাগি, মানসিকভাবে বিকৃতি, অর্থনৈতিক দীনতা পারিবারিক সম্পর্ক দুর্বল এর পেছনের কারণ হিসেবে দেখছেন অনেকে। আবার অপসংস্কৃতি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুল বার্তা, খেলাধুলা কমে যাওয়া, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসন না মানার কারণে এসব ঘটছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিক কেন্দ্রর (আসক)  নির্বাহী পরিচালক ফারুখ ফয়সল দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি মনে করি আমাদের সমাজে একটা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মানুষ মানুষের এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে। এই সামাজিক অস্থিরতা যদি দূর করা না যায় তাহলে মানুষ মানসিকভাবে আরো অসুস্থ হয়ে পড়বে। এই সমাজকে যদি সৎ এবং সহনশীল সমাজে পরিণত করতে না পারি তাহলে এই অস্থিরতা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়। অস্থির সমাজে বসবাস করলে মানুষের মধ্যে অস্থিরতা থাকে। বর্তমানে সাংস্কৃতিক বিকৃতির কারণে পারিবারিক সম্পর্ক দুর্বল হওয়া, সামাজিক বন্ধন নষ্ট হওয়া একটা বড় কারণ হিসেবে রয়েছে ঘটনাগুলোর পেছনে। সামাজিক ও পারিবারিকভাবে এগুলো মোকাবিলা করতে হবে। তাই সমাজের সকলে মিলে সামাজিক ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে এবং সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে এ ধরনের ঘটনা কমানো যাবে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কগুলো দুর্বল হয়ে পড়া। এটা দুর্বল হওয়ার পেছনে কারণ হচ্ছে পারিবারিক পরিবেশে কোনো শৃঙ্খলা নেই। যেমন- পরকীয়া, সম্পত্তিগত বিষয়। পারিবারিক পরিবেশে সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে বড় হওয়ার জন্য অর্থনৈতিকভাবে কষ্টে সেটা বজায় থাকছে না। যার কারণে নিজেদের মধ্যে বন্ডিং নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

এ থেকে উত্তরণে সরকারের চেয়ে বড় দায়িত্ব পরিবার ও সমাজের উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, সামাজিক কাঠামোর মধ্যে বিশৃঙ্খলা আছে। সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসন, রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলাবোধ বজায় রেখে চললে এটা কমানো সম্ভব। এখানে পরিবারকে সংযত হতে হবে এবং ব্যক্তিত্ববোধের জায়গা থেকে সবাইকে অন্যের এবং নিজের বিষয়গুলো বিবেচনাবোধ থেকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তাহলে এ ধরনের ঘটনা অনেক কমে আসবে।

মানবাধিকার কর্মী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল হচ্ছে তার পরিবার। কিন্তু সেই স্থানে এখন সম্পর্কের দুর্বলতা, লোভ, মানবিক মূল্যবোধের অভাব ঢুকে গেছে। এর পেছনে কারণ হচ্ছে সামাজিক অবক্ষয় ও পারস্পরিক বন্ধন কমে যাওয়া। এজন্য রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শাস্তি নিশ্চিত করা এবং আত্মহত্যার ক্ষেত্রে কাউন্সিলিং জরুরি। সবাই মিলে এই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সম্বন্বিতভাবে কাজ করলে এ ধরনের ঘটনা কমবে বলে আশা করছি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত