রবিবার, ২৬ মে ২০২৪, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

অন্য অঙ্গনে ক্ষমতার খোঁজে ফুটবলে নিষিদ্ধ সোহাগ

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:৩১ পিএম

ফুটবল ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পদাক আবু নাঈম সোহাগকে ফিফার দুই বছরের নিষেধাজ্ঞার বছরপূর্তী হলো আজ। এই এক বছরে বিতর্কিত এই ব্যক্তি নানাভাবে চেষ্টা চালিয়েছেন অন্য অঙ্গনে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠার। এতে তিনি খানিকটা সফলও হয়েছেন। দুনিয়াজুড়ে ফিফার নিষেধাজ্ঞায় যেখানে অস্পৃষ্ট হয়ে পড়েন অপরাধীরা, সেখানে এই সোহাগ নগর পরিকল্পনাবিদদের সংগঠনের ব্যানার ব্যবহার করে দিব্যি সরকার ও সমাজের প্রভাবশালীদের সান্নিধ্য লাভ করছেন নিয়মিত। এমনকি ফুটবলের কর্তাদের সঙ্গেও নানা অনুষ্ঠানে দেখা গেছে তাকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের নানা কর্মকান্ড ফলাও করে যেন বোঝাতে চাইছেন, এই নিষেধাজ্ঞায় তার কিছুই আসে যায় না।

এক বছর আগে এই সন্ধ্যায় কী ঘটেছিল?

এক বছর আগে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে দেশের ফুটবল অঙ্গনে তোলপাড় হয়েছিল ফিফার ৫১ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদনে। সেদিন সন্ধ্যায় ফিফার স্বাধীন এডজুডিশিয়াটরি চেম্বার অফ দ্য ইথিকস কমিটি সোহাগের বিরুদ্ধে পাওয়া নানা জালিয়াতির অভিযোগের সত্যতা সবিস্তার প্রকাশ করে। মোটা দাগে ফিফার বরাদ্দের নয়-ছয়ের গুরুতর অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পায় এই কমিটি। তারা সোহাগকে ফুটবল সংক্রান্ত সকল কর্মকান্ড থেকে ২ বছর নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি ১০ হাজার সুইস ফ্রাঁ জরিমানা করে। 

অথচ এর আগে এই ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন ফুটবল প্রশাসনের দন্ডমুন্ডের কর্তা। তার ইশারায় চলতো ফুটবল। ফেডারেশনের শীর্ষ কর্তাদের ছত্রছায়ায় সোহাগ ফেডারেশনে কায়েম করেছিল দুর্নিতি ও অনিয়মের রাজত্ব। এ নিয়ে নানা সংবাদ মাধ্যমে বিচ্ছিন্নভাবে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে দিস্তায় দিস্তায়। তাছাড়া সোহাগের অনিয়ম-জালিয়াতির অভিযোগ নানাভাবে পৌঁছে গিয়েছিল ফিফার কাছে। সেগুলো আমলে এনে দীর্ঘ তদন্ত চালিয়েছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্তা সংস্থা। যার প্রেক্ষিতে কেবলমাত্র ফিফার তহবিল ব্যবহারে নানা দুর্নিতি ও জালিয়াতির প্রমাণ মিলে। যার প্রেক্ষিতে সোহাগকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয় ফিফা। সেটা করতে গিয়েই নানা বানোয়াট বিল-ভাউচার ফিফার কাছে পেশ করে ধরা পড়েন সোহাগ। তার বিরুদ্ধে চারটি অভিযোগের সুষ্পষ্ট প্রমাণ পেয়েই ফিফা নেয় নিষেধাজ্ঞার গুরুতর সিদ্ধান্ত।

ফিফার শাস্তি থেকে বাঁচাতে না পেরে ভোল পাল্টে কঠোর বাফুফে

সোহাগের বিরুদ্ধে ফিফার এই সিদ্ধান্ত শুরুতে মেনে নিতে পারেননি বাফুফের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন। ভীষণ আস্থাভাজন বলেই অপ্রকাশ্যে সোহাগকে নানাভাবে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। একটা সময় বাফুফে প্রধানকে বলতে শোনা গেছে, সোহাগ পরিস্থিতির শিকার। আবার বাফুফের সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী বলেছিলেন, সোহাগের বিরুদ্ধে সরাসরি অর্থ নয়ছয়ের অভিযোগ আসেনি। পরে অবশ্য অবস্থা বেগতিক দেখে ভোল পাল্টে ফেলে বাফুফে। সোহাগকে ফুটবল থেকে আজীবন নিষিদ্ধ করে নিজেদের পিঠ বাঁচায়। তার বিরুদ্ধে ফিফার ৫১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন আরও খতিয়ে দেখতে বাফুফের সহ-সভাপতি কাজী নাবিল আহমেদের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করে ফিফা। বিরতিহীন তদন্ত শেষে এই কমিটি একটি প্রতিবেদনও বাফুফেতে জমা দিয়েছিল। তবে সোহাগের নিষেধাজ্ঞার বছরপূর্তী হয়ে গেলেও সেই প্রতিবেদনের ব্যাপারে এখনও বাফুফে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তাতে দানা বাঁধছে সন্দেহ। সোহাগকে আর বেশি ঘাটানোর পক্ষে নন বাফুফের বড় কর্তারা। তাতে যদি নিজেদের গোমর ফাঁস হয়ে যায়। জোড়া নিষেধাজ্ঞায় অবশ্য সোহাগ এই সমাজে অস্পৃশ্য হয়ে পড়েননি। ফুটবলকে কলঙ্কিত করা এই বিতর্কিত ব্যক্তি ফিফার ধাক্কা সামলে দ্রুতই প্রকাশ্যে আসেন ভিন্ন পরিচয়ে।

কিভাবে সোহাগের উত্থান

নতুন পরিচয় নিয়ে আলোচনার আগে খানিকটা অতীতে ফিরে যাই। পিকে হালদারের পর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) পেয়ে যায় আরেক আর্থিক কেলেঙ্কারির খলনায়ক। বুয়েট থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর সোহাগ হতে পারতেন নগর পরিকল্পনাবিদ। তা না হয়ে তিনি বনে যা ফুটবল দুর্নীতির মহাপরিকল্পনাকারী। ২০০৬ সালে যোগ দেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনে কম্পিটিশন্স ম্যানেজার হিসেবে। দেশের ফুটবলে তখন ঘোড় কলিকাল। তাই পেশা হিসেবে সেই চাকুরি মোটেই লোভনীয় কিছু নয়। তারপরও তিনি থেকে গেলেন কোনো এক অদৃশ্য কারণেই। পনের বছর পর ১৪৩০ বাংলা বছরের শুরুর দিনে জানা গেল কী কারণে বাফুফেতে এতগুলো বছর কাটিয়ে দিলেন সোহাগ। ছাপোশা কম্পিটিশন ম্যানেজার থেকে ভাগ্যজোড়ে সোহাগের কাছে ২০১১ সালে চলে আসে বাফুফের নির্বাহী ক্ষমতা। প্রথম বেতনভুক্ত সাধারণ সম্পাদক আল মুসাব্বির সাদীর অকাল মৃত্যুর পর সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন সোহাগকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ দেন। পরের বছর থেকে তিনি পুরোদস্তুর সাধারণ সম্পাদক। সেই থেকেই সালাউদ্দিনের ঘনিষ্ট সহচর হয়ে ধীরে ধীরে মহীরুহ রূপ নেন সোহাগ। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করে অনিয়ম দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য বানিয়ে ফেলেছিলেন বাফুফেকে।

ফুটবল কলঙ্কিত করে সোহাগ এখন নগর পরিকল্পনাবিদদের নেতা

ফুটবলের বারোটা বাজিয়ে নিজে হয়েছেন নিষিদ্ধ। তবে তার আগে ফুটবলকে দেউলিয়া করে গড়েছেন টাকা ও অবৈধ সম্পদের পাহাড়। সেটাকে পুঁজি করে এখন তিনি নিজের পুরানো পরিচয়ে ফিরে গেছেন। বনে গেছেন নগর পরিকল্পনাবিদদের নেতা। ফুটবল থেকে বিতাড়িত সোহাগ তক্কে তক্কে ছিলেন নতুন একটা পরিচয় পাওয়ার। সেই সুযোগটা তাকে করে দিয়েছে বাংলাদেশ ইনিস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। নগর পরিকল্পনাবিদদের এই সংগঠনের কাজ পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিষয়ে সরকারকে নানা পরামর্শ দেওয়া। সেই সংগঠন কীনা একজন প্রমাণিত জালিয়াতকে আপন করে নিয়েছে! ঠাঁই দিয়েছে নতুন নির্বাহী কমিটিতে। 

বিআইপি’র সভাপতি আদিল মোহাম্মদ খান সম্প্রতি সোহাগের বিষয়ে একটি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘আমাদের সংগঠনে আড়াই হাজার সদস্য, তাদের ভোটে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন। এখানে তো কিছু করার নেই।’ 

নয়া পরিচয়টাকে চাউড় করতে জুড়ি নেই সোহাগের। সরকারের মন্ত্রী, এমপিদের সঙ্গে ছবি তুলে তিনি নিয়মিতই ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছেন। নানা টক শোতে নগরবিদ হিসেবে গলাবাজি করছেন সমানে। আবার বাফুফে ও ফুটবলের অনেক ব্যক্তির সঙ্গেও এক মঞ্চে বসে থাকতে দেখা গেছে তাকে।

পরিশেষে...

মোহাম্মদ বিন হাম্মামের কথা নিশ্চয় ভুলে যাননি। এশিয়ার ফুটবলের এক সময়ের শীর্ষ কর্তাকে ফিফা ঘুষ দিয়ে কাতারকে ২০২২ বিশ্বকাপের আয়োজক সত্ত্ব পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সেই হাম্মাম কিন্তু এক যুগেও আর প্রকাশ্যে আসতে পারেননি। ফুটবল দূরে থাক, অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মেই তাকে আর দেখা যায়নি। কিন্তু এ দেশে অপরাধ করেও প্রকাশ্যে ঘুঁড়ে বেড়াচ্ছেন সোহাগ। ফুটবলকে কলঙ্কিত করেও দিব্যি অন্য অঙ্গনে হয়ে উঠছেন সম্মানের পাত্র। নিষেধাজ্ঞার বছরপূর্তীর দিন তাই খুব আশঙ্কা হচ্ছে, আসছে নববর্ষের পরের দিন না আবার ফুটবলে ফেরার ঘোষণা দিয়ে বসেন সোহাগ। খোদ বাফুফেতেই যে তাকে বরণ করার লোকের অভাব নেই। 

ভয়টা আরও বেড়ে যায় যখন তার হারানো সাধারণ সম্পাদক পদে এক বছরেও দেখা যায় না একজন যোগ্য লোককে। সোহাগের বিকল্প হয়েছেন বাফুফে সভাপতিরই আরেক আস্থা ভাজন ইমরান হোসেন তুষার। সোহাগ অনিয়মের রাজত্ব কায়েম করে গেছেন। সেই ধাক্কা সামলে বাফুফের প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর মতো দৃশ্যত কিছুই করেননি ইমরান। ‘কাঠপুতুল সাধারণ সম্পাদক’ হয়ে সভাপতির আজ্ঞাবহ থাকাতেই তুষ্ট তিনি। আগ বাড়িয়ে নিজ থেকে কোনো দায়িত্ব নেন না তিনি। পাছে কলঙ্কের ভাগিদার যদি হতে হয়। তারচেয়ে বরং আজ্ঞাবহ ও নখদন্তহীন নির্বাহী প্রধান হয়ে মাসে মাসে মোটা অঙ্কের বেতন মিলে গেলে ক্ষতি কী?

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত