বুধবার, ২৯ মে ২০২৪, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ইরানের মাটিতে ইসরায়েলের যত হামলা

  • অনেক বছর ধরেই ইরানে সাইবার হামলা, বিজ্ঞানীদের হত্যা করে আসছে ইসরায়েল
  • ইরানের পারমাণবিক প্রচেষ্টা ইসরায়েলের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলবে এমন ধারণা দেশটির 
আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ০৪:১৩ পিএম

চলতি মাসের শুরুতে সিরিয়ার দামেস্কে ইরানের কনস্যুলেটে ইসরায়েলি হামলার পর ইসরায়েলের ভূখণ্ডে প্রথমবারের মত সরাসরি হামলা চালিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান। শত শত মিসাইল ও ড্রোন দিয়ে ইহুদি রাষ্ট্রটিতে হামলা চালায় ইরান।

এদিকে ইরানের হামলার জবাব দেওয়ার বিষয়ে বিকল্প চিন্তাভাবনা চলছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ইসরায়েলের নেতারা। এছাড়া যেকোন মূল্যে হামলার জবাব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলি সামরিক প্রধান।

কিন্তু ইসরায়েল যদিও ইরানের অভ্যন্তরে সামরিকভাবে পাল্টা আঘাত করে, এটি প্রথমবার হামলা হবে না। এর আগেও বেশ কয়েকবার ইরানে হামলা চালিয়েছে ইহুদি দেশটি।

বেশ কয়েক বছর ধরেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে ইসরায়েল। ইরানের বিরুদ্ধে গোপনে পারমাণবিক বোমা তৈরির অভিযোগ করছে ইহুদি দেশটি। কারণ ইরানের পারমাণবিক প্রচেষ্টা ইসরায়েলের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে এমন ধারণায় কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি।

যার ফলে ইসরায়েল ইরানে ড্রোন হামলা, সাইবার আক্রমণ, বিজ্ঞানীদের হত্যাসহ গোপন তথ্য চুরির প্রয়াস চালিয়ে গেছে। যদিও বেশিরভাগ ঘটনাই অস্বীকার করেছে ইসরায়েল।

ইরানি বিজ্ঞানীদের হত্যা

২০১০ সালের জানুয়ারী: ওই বছর মোটরসাইকেলে রাখা রিমোট-নিয়ন্ত্রিত বোমার মাধ্যমে নিহত হন তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক, মাসুদ আলী-মোহাম্মাদি। তাকে একজন পরমাণু বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচয় দেয় ইরান সরকার। সে সময় ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি জানায় যে, এই পরমাণু বিজ্ঞানীকে হত্যার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাত রয়েছে।

২০১০ সালের নভেম্বর: তেহরানের শহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়ের পারমাণবিক প্রকৌশল অনুষদের অধ্যাপক, মজিদ শাহরিয়ারি। কর্মস্থলে যাওয়ার পথে গাড়ি বিস্ফোরণে নিহত হন তিনি। সেই বিস্ফোরণে তার স্ত্রীও আহত হন। তৎকালীন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেন।

২০১২ সালের জানুয়ারী: রাসায়নিক প্রকৌশল স্নাতক মোস্তফা আহমাদি রোশান। তিনি একজন পরমাণু বিজ্ঞানী ছিলেন এবং নাতাঞ্জ শহরে ইরানের প্রাথমিক ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ গবেষণা কেন্দ্রের একটি বিভাগের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে ছিলেন। তেহরানে তার গাড়িতে একজন মোটরসাইকেল আরোহীর রাখা বোমার আঘাতে নিহত হন তিনি। ইরান এই হামলার জন্য ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে।

২০২০ সালের নভেম্বর: বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী মোহসেন ফাখরিজাদেহ তেহরানের বাইরে রাস্তার পাশে হামলায় নিহত হন। পশ্চিমা ও ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের দীর্ঘদিন ধরেই সন্দেহ ছিল যে ফাখরিজাদেহ ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির জনক। তিনি ২০০৭ সালে জাতিসংঘ এবং ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক অনুমোদিত পরমাণু বিজ্ঞানী হয়েছিলেন।

২০২২ সালের মে: ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এর কর্নেল হাসান সাইয়্যাদ খোদাই তেহরানে নিজ বাড়ির বাইরে পাঁচবার গুলিবিদ্ধ হন। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সদস্য মাজিদ মিরাহমাদি এই হত্যাকাণ্ডটি "অবশ্যই ইসরায়েলের কাজ" বলে অভিযোগ করেন।

ইরানে ইসরায়েলের সাইবার হামলা

২০১০ সালের জুন: ইরানের বুশেহর শহরের পারমাণবিক প্ল্যান্টের কম্পিউটারে স্টাক্সনেট ভাইরাস পাওয়া যায় এবং সেখান থেকে ভাইরাসটি অন্যান্য প্ল্যান্টেও ছড়িয়ে পড়ে। ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে কমপক্ষে ১৪টি পারমানিক স্থাপনায় ৩০ হাজার কম্পিউটার প্রভাবিত হয়েছিল।

ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির তথ্য অনুসারে, সেই ভাইরাসের প্রভাবে ইরানের নাতাঞ্জ পরমাণু স্থাপনায় ৯ হাজার সেন্ট্রিফিউজের মধ্যে অন্তত এক হাজার ধ্বংস হয়েছিল। তদন্তের পর, ইরান ভাইরাস আক্রমণের জন্য ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে।

২০১১ সালের এপ্রিল: ইরানের সাইবার ডিফেন্স এজেন্সি স্টারস নামে একটি ভাইরাস আবিষ্কৃত করেছিল যা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় অনুপ্রবেশ এবং ক্ষতি করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল।

ইরানের প্যাসিভ ডিফেন্স অর্গানাইজেশনের প্রধান গোলাম রেজা জালালি জানিয়েছিলেন, ভাইরাসটি সরকারি ফাইলের তথ্য চুরি এবং কম্পিউটার সিস্টেমে সামান্য ক্ষতি করতে পেরেছিল। এই ভাইরাসের জন্যও ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছিল ইরান।

২০১১ সালের নভেম্বর: ডুকু (Duqu) নামক নতুন একটি ভাইরাস আবিষ্কার কথা জানায় ইরান। বিশেষজ্ঞরা বলেন যে ডুকু ভবিষ্যতে সাইবার আক্রমণের জন্য তথ্য সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে ছিল। ডুকু স্পাইওয়্যারটি ইসরায়েলের সাথে যুক্ত ছিল বলে বিশ্বাস ছিল ইরানের বিশেষজ্ঞদের।

২০১২ সালের এপ্রিল: ইরান ওয়াইপার নামক এক ম্যালওয়্যার ইরানের জ্বালানি মন্ত্রনালয় এবং ন্যাশনাল ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানির মালিকানাধীন কম্পিউটারের হার্ড ড্রাইভ থেকে সব তথ্য মুছে দেয়। এই ম্যালওয়্যারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলকে দোষারোপ করে ইরান।

২০১২ সালের মে: ইরান ঘোষণা করে যে ফ্লেম নামক একটি ভাইরাস সরকারি কম্পিউটার থেকে তথ্য চুরি করার চেষ্টা করেছে। সে সময় ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এই ভাইরাসটিকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য ব্যবহার করেছে।

তৎকালীন ইসরায়েলের ভাইস প্রধানমন্ত্রী মোশে ইয়ালন এই ভাইরাস কান্ডে দেশটির জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত না করলেও ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক ব্যবস্থার ক্ষতি করার জন্য সমস্ত উপায় ব্যবহার করবে বলে মন্তব্য করেছিলেন।

২০১৮ সালের অক্টোবর: স্টাক্সনেটের একটি নতুন ধরনের আক্রমণকে প্রতিরোধ করার কথা জানায় ইরান সরকার। ওই হামলার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করে দেশটি।

২০২১ সালের অক্টোবর: ইরানী নাগরিকদের জ্বালানি তেল কেনার জন্য সরকার-ইস্যু করা কার্ড ব্যবহারের সিস্টেমে সাইবার আক্রমণের ঘটনা ঘটে। যার ফলে ইরানের সমস্ত ৪৩০০টি পেট্রোল স্টেশন ক্ষতির মুখে পড়ে। ভোগান্তিতে পরেন ইরানি নাগরিকরা।

যার ফলে ভোক্তাদের নিয়মিত মূল্যের দ্বিগুণেরও বেশি দাম পরিশোধ করতে হয় এবং স্টেশনে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছিল। এই সাইবার আক্রমণের জন্য ইরান ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছে।

২০২০ সালের মে: ইরানের দক্ষিণ উপকূলে শহীদ রাজাই বন্দরে সামুদ্রিক ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণকারী কম্পিউটারগুলো সাইবার আক্রমণের শিকার হয়। যার কারণে জাহাজগুলোকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে তখন ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছিল, ওই সাইবার হামলার পেছনে ইসরায়েল জড়িত। যদিও ইসরাইল দায় স্বীকার করেনি।

ইরানে ইসরায়েলের ড্রোন হামলা ও অভিযান

২০১৮ সালের জানুয়ারী: ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সদস্যরা তেহরানের একটি স্থাপনায় অভিযান চালিয়ে পারমাণবিক সংরক্ষণাগার থেকে তথ্য চুরি করে।

পরবর্তীতে ২০১৮ সালের এপ্রিলে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা করেন, ইসরায়েল ইরানের এক লাখ গোপন ফাইল আবিষ্কার করেছে যেখানে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি না থাকার বিষয়ে মিথ্যাচার করেছে।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারী: সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত একটি অপ-এডিতে স্বীকার করেন যে ইসরায়েল ইরানের একটি মনুষ্যবিহীন বিমানবাহী গাড়িতে হামলা চালিয়েছে এবং আগের বছরের ফেব্রুয়ারিতে একজন সিনিয়র আইআরজিসি কমান্ডারকে হত্যা করেছে।

২০২২ সালের মে: বিস্ফোরক-বোঝাই কোয়াডকপ্টার আত্মঘাতী ড্রোন দ্বারা তেহরানের দক্ষিণ-পূর্বে পারচিন সামরিক কমপ্লেক্সে আঘাত হানা হয়। এতে একজন প্রকৌশলী নিহত হন এবং একটি বিল্ডিং ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আইআরজিসি কমান্ডার হোসেন সালামি সে সময় অনির্দিষ্ট হামলাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

২০২৩ সালের জানুয়ারী: ইরানের ইস্ফাহান শহরের একটি সামরিক স্থাপনায় বেশ কয়েকটি আত্মঘাতী ড্রোন দ্বারা হামলা চালানো হয়। তবে সে হামলা ব্যর্থ হয়েছিল এবং কোনও ক্ষতি হয়নি। যদিও ইরান তখন তাৎক্ষণিকভাবে হামলার জন্য কাউকে দায়ী করেনি। পরবর্তীতে ইরানের জাতিসংঘের দূত আমির সাইদ ইরাভানি জাতিসংঘ প্রধানকে একটি চিঠি লিখে জানান যে "প্রাথমিক তদন্তে ইসরায়েল দায়ী ছিল"।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারী: ইরানে একটি প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইন আক্রমণের শিকার হয়। ইরানের তেলমন্ত্রী জাভেদ ওজি অভিযোগ করেন যে "গ্যাস পাইপলাইনের বিস্ফোরণ ইসরায়েলি চক্রান্ত"।

সূত্র: আল জাজিরা

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত