জ্বর-কাশি নিয়ে হাসপাতালে আসা ১১ শতাংশই ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:০০ পিএম

বাংলাদেশে স্বল্প সময়ের জ্বর ও কাশি নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ১১ শতাংশ রোগী ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত। তাদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ১ জন বা ১ শতাংশ রোগী মারা যাচ্ছে। তবে ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত ৬০ বছরের বেশি বয়স্ক ও দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে এই মৃত্যুর হার স্বাভাবিকের চেয়ে তিন গুণ বেশি। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) যৌথভাবে পরিচালিত ‘ইনফ্লুয়েঞ্জা সার্ভিলেন্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে।

আজ বুধবার রাজধানীর মহাখালীর আইইডিসিআর মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে পরিচালিত ইনফ্লুয়েঞ্জা গবেষণার তথ্য তুলে ধরা হয়।

গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইনফ্লুয়েঞ্জা সংক্রমণের প্রকোপ বাড়ে। তাই এই সময়টাকে গবেষকরা ‘ফ্লু মৌসুম’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। গবেষণায় ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস থেকে সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে প্রতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের টিকা বা ফ্লু-শট নেওয়ার সুপারিশ করেন গবেষকরা। এ ছাড়া ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা গ্রহণের জন্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি, ও দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগীদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত বলেও মত দনে তারা।

সেমিনারে আইসিডিডিআর,বির সহযোগী বিজ্ঞানী ডা. ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, বিশ্বে প্রতি বছর দুই লাখ ৯০ হাজার থেকে সাড়ে ছয় লাখ মানুষ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যবরণ করে। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশ তাদের ফ্লু মৌসুমের আগে ফ্লু ভ্যাকসিন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।

গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে আইইডিসিআর ও ন্যাশনাল ইনফ্লুয়েঞ্জা সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরিন বলেন, স্বল্প সময়ের জ্বর এবং কাশির অভিযোগ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এক লাখ পনের হাজারের বেশি রোগীর মধ্যে প্রায় ১১ শতাংশ রোগীর মাঝে ইনফ্লুয়েঞ্জার উপস্থিতি পাওয়া যায়। বাংলাদেশে সারা বছরই ফ্লু সনাক্ত হয়ে থাকে। তবে প্রতি বছর এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাসে ফ্লু সনাক্তের হার বৃদ্ধি পায় এবং জুন থেকে জুলাই মাসে এর প্রকোপ সর্বোচ্চ হয়। এই কারণে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে ইনফ্লুয়েঞ্জা মৌসুম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আইইডিসিআর পরিচালক ফ্লুর মৌসুম শুরুর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা নিয়ে সুরক্ষিত রাখার পরামর্শ দেন ও ইনফ্লুয়েঞ্জা মৌসুমে এন্টিবায়োটিক ব্যবহারে সতর্ক থাকতে বলেন।

সেমিনারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, চলমান ফ্লু মৌসুমে যদি জ্বর, সর্দি, কাশির মতো লক্ষণ দেখা দেয় তাহলে এন্টিবায়োটিক নেওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে, যেন ওষুধের প্রতি রেজিসট্যান্স তৈরি না হতে পারে। এ ছাড়া হাত ধোয়া, মাস্ক পরা এবং কাশি দেওয়ার শিষ্টাচারগুলো সারা বছর মেনে চললে শুধু ইনফ্লুয়েঞ্জা বা শ্বাসতন্ত্রের অসুখ নয়, অন্যান্য সংক্রামক রোগও প্রতিরোধ করা সম্ভব।

২০০৮-২০১০ সালে আইসিডিডিআর,বির বিজ্ঞানী ড. কে জামানের গবেষণার বরাত দিয়ে আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, ওই গবেষণায় দেখা গেছে গর্ভাবস্থায় মাকে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন দিলে মায়ের পাশাপাশি নবজাতকেরও ৬৩ শতাংশ রোগের ঝুঁকি কমে যায়। এই গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তীতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গর্ভাবস্থায় মাদের ফ্লু ভ্যাকসিন দেওয়ার পরামর্শ দেয়।

সেমিনারে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (ইউএস-সিডিসি) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কারিগরি সহায়তায় এই সার্ভিলেন্সটি বাংলাদেশে পরিচালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে দেশের ১৯টি হাসপাতালে চলমান এই সার্ভেইল্যান্সের মুল লক্ষ্য বাংলাদেশে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের সংক্রমণ ও মৌসুমী বৈচিত্র্য বোঝার পাশাপাশি ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের বিভিন্ন ধরন সনাক্ত করা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইনফেকশাস হ্যাজার্ড ম্যানেজমেন্ট অফিসার ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর, ইউএস-সিডিসি-এর এপিডেমিওলজিস্ট, ড. গ্রেচেন কাওম্যান, গ্লোবাল হেলথ ডেভেলপমেন্ট (জিএইচডি)এবং ইস্টার্ন মেডিটার্নিয়ান পাবলিক হেলথ নেটওয়ার্কের প্রতিনিধি অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত