বুধবার, ২৯ মে ২০২৪, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর

তাপপ্রবাহ শুরু হলেই হাসপাতালে রোগীদের চাপ বাড়ে

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ১১:২৮ পিএম

‘গত শুক্রবার আমার মেয়ে শোভার জ্বর হয়; রাতে তার পাতলা পায়খানা শুরু হয়। পরদিন তাকে হাসপাতালে ভর্তি করাই। চিকিৎসকরা আমাকে জানান, ডায়রিয়ার কারণে শোভার শরীরে সোডিয়াম, পটাশিয়াম কমে গেছে। তার শরীর খুব দুর্বল। তাকে হাসপাতালে আরও দুদিন রাখা লাগবে।’ 
রাজধানীর মহাখালীর আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রে (আইসিডিডিআর,বি) এ কথা বলছিলেন ৮ বছরের শিশু শোভার মা আয়েশা বেগম। শুধু শোভাই নয়, ওই হাসপাতালে তার মতো আরও অনেক রোগী ভর্তি হয়েছে। 
চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলমান দাবদাহের কারণে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে, হাসপাতালে ভিড় বাড়ছে। দেশে গরমের মৌসুমে স্বাভাবিকভাবেই জ্বর ডায়রিয়া প্রভৃতিতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। 

১৬ এপ্রিল সরেজমিনে রাজধানীর শিশু হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘুরেও রোগীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। রোগীরা জ্বর, সর্দি-কাশি, হিটস্ট্রোক, পেটের পীড়া, টাইফয়েড ও হেপাটাইটিসে ভুগছে। 
প্রচন্ড গরম, আবহাওয়ার পরিবর্তন, অস্বাস্থ্যকর খাবার ও পানির কারণে এসব রোগ বাড়ছে। সরেজমিনে আরও দেখা গেল, হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি। লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেটে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে অনেকে বাড়ি ফিরছেন, কেউ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। হাসপাতালে শয্যা পেতে বেশ ভোগান্তি হচ্ছে মানুষের। 
আইসিডিডিআর,বিতে ৭ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত ৪ হাজার ৫২৮ জন ভর্তি হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে এ হাসপাতালে দিনে গড়ে ৩৫০ রোগী ভর্তি হয়, বর্তমানে এ সংখ্যা ৫০০ জনের কাছাকাছি। শিশু হাসপাতালে ৭০০ থেকে ৯০০ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও রোগীর চাপ বেড়েছে। 

শিশু হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেল, চার বছরের শিশু ফারদিনের হাতে ক্যানুলা লাগানো। তার হাতে স্যালাইন পুশ করা হয়েছে। ফারদিনের মা রোকেয়া বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত সন্ধ্যায় (১৫ এপ্রিল) ফারদিনের জ্বর হয়, একপর্যায়ে তার খিঁচুনি শুরু হয়। ভয় পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে তাকে এ হাসপাতালে নিয়ে আসি। চিকিৎসকরা তাকে ভর্তি করতে বলেছেন।’ 
সেখানে কথা হয় আরেক রোগীর স্বজন আনোয়ারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে গরমের মাত্রাটা বেড়ে গেছে। আমার ভাগ্নি আইসক্রিম ও ফ্রিজের ঠান্ডা পানি বেশি করে খায়। দিনে একাধিকবার গোসল করে। এতে তার গলাব্যথা ও জ্বর হলে ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাওয়াই। তাতেও কাজ না হওয়ায় হাসপাতালে নিয়ে আসি।’ 
শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তাপপ্রবাহ শুরু হলেই শিশুদের রোগাক্রান্ত হওয়ার হার বেড়ে যায়। রোগীর চাপ বেড়ে যায় হাসপাতালে। এ সময়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকা দরকার। শিশুদের অপ্রয়োজনে বাসার বাইরে যাওয়া বন্ধ রাখতে হবে, স্কুলে যাওয়া-আসার পথে রোদ থেকে বাঁচতে ছাতা ব্যবহার করতে হবে। রাস্তার পাশের হোটেলের খাবার ও পানীয় খাওয়া যাবে না, নিম্ন আয়ের মানুষদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।’ 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কথা হয় মধ্যবয়সী আবু জাফরের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুপুরবেলা বাসার ছাদ পরিষ্কার করছিলাম। গরমে হঠাৎ অচেতন হয়ে যাই, ছাদ থেকে আমাকে বাসায় নিয়ে মাথায় পানি দেওয়া হয়, এতে জ্ঞান ফিরে কিন্তু শারীর দুর্বল হয়ে যায়। বারবার পায়ের পেশিতে টান পড়ছিল। ফলে হাসপাতালে ভর্তি হই। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন আমার হিটস্ট্রোক হয়েছিল।’ 
এপ্রিলে চরম গরম ও অস্বস্তিকর আবহাওয়া বিরাজ করছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব জেলায়। আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে ৫৪টি জেলায় মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বইছে। মঙ্গলবার দেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গায়, ৪০ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আরও কয়েক দিন গরম অব্যাহত থাকবে। ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন। এরপরও জীবিকার জন্য বের হতে হচ্ছে খেটে খাওয়া মানুষদের। 
প্রসঙ্গত, আবহাওয়াবিদদের মতে, ৩৬ থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত মৃদু তাপপ্রবাহ, ৩৮ থেকে ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত মাঝারি তাপপ্রবাহ, ৪০ থেকে ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তীব্র তাপপ্রবাহ এবং ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরের তাপমাত্রাকে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বলা হয়। 

চিকিৎসকরা বলেন, গরমে পানিবাহিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যাই বেশি থাকে। গরম এলেই ডায়রিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। শহরের মানুষজন বাসার বাইরে যে পানি খান তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনিরাপদ। নিম্ন আয়ের মানুষরাও বাসাবাড়িতে যে পানি খান তাও নিরাপদ হয় না। এ ছাড়া অস্বাস্থ্যকর ও অপরিচ্ছন্ন জীবনযাপন এ সময়ে রোগাক্রান্ত হওয়ার বড় কারণ। ঈদের ছুটিতে যারা গ্রামে গিয়েছিলেন তারা ঢাকায় ফিরলে হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়বে। গরম মাত্র পড়েছে, দিন যত যাবে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়বে। 
ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. ইফফাত আরা শামসাদ বলেন, ‘এ সময়ে রোগীর চাপ বাড়েই। আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। ঢামেকে রোগীর চাপ আগামী কদিনে আরও বাড়তে পারে। রোগ থেকে বাঁচতে সচেতনতার বিকল্প নেই।’ 
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গরমে মানুষের বিভিন্ন ধরনের অসুখ হয়। হিটস্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ে। শিশু, নারী ও বয়স্কদের ঝুঁকি বেশি থাকে। উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের রোগীদের বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে। কারণ তাদের হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। যাদের রক্তচাপের সমস্যা আছে, তীব্র গরমে তাদের মানসিক চাপ বেড়ে যায়। এ সময় খাবার গ্রহণে সতর্ক থাকতে হবে। এমন খাবার খেতে হবে, যা সহজে হজম হয় ও যাতে পানির পরিমাণ বেশি। রাস্তায় শরবত, আইসক্রিম খাওয়া যাবে না। অনিরাপদ পানি পান করা থেকে বিরত থাকতে হবে।’ 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত