বুধবার, ২৯ মে ২০২৪, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ইরান ইসরায়েল হিসাবে ভুলের সম্ভাবনা

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৪, ১০:৫১ পিএম

গত সপ্তাহান্তে ইরানের আক্রমণে ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া আর কী কী হতে পারে, তা দেখার জন্য মধ্যপ্রাচ্য নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে। আঞ্চলিক সংঘাতের ভীতি আগের চেয়ে আরও কাছাকাছি বলে মনে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের আশঙ্কাটি গত অক্টোবরে গাজা যুদ্ধের আগ পর্যন্ত একটি শঙ্কাই ছিল কেবল। সেই আশঙ্কার ভূতটি মোমের মতো গলে গেছে এই ভয়ে যে, গাজা যুদ্ধ একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হবে। যুদ্ধটি ইরান ও তার মিত্রদের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পশ্চিমা দেশগুলোকেও টেনে নিয়ে আসবে।

গত ছয় মাসে, ইসরায়েল এবং ইরান-সমর্থিত বাহিনী, প্রধানত লেবানিজ গ্রুপ হিজবুল্লাহর মধ্যে ‘ঢিলের বদলে পাটকেল’ হামলাসহ বিস্তৃত মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ব্যাপক সহিংসতা হয়েছে। এই আক্রমণগুলো একটি নিয়মিত প্যাটার্ন অনুসরণ করে এগিয়েছে এবং প্রতিটি সহিংস ঘটনাকে ক্রমবর্ধমান মইয়ের একেকটি ধাপে ধীরে ধীরে আরোহণ করার চিহ্ন তৈরি করছে। ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনগুলো লেবানন ও ইসরায়েলের বেশ গভীরে নিক্ষেপ করা হলেও প্রতিটি পক্ষ সেই দূরত্বগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে বাড়িয়েছে এবং উভয়েই লক্ষ্য বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে খানিকটা যতœশীল ও মনোযোগী ছিল। তবে ইসরায়েল ক্রমে আরও দুঃসাহসিক হয়ে উঠেছে, বিশেষত ‘রেড লাইনস’-এর সীমানা প্রশস্ত করার ব্যাপারে। সীমানা বৃদ্ধির কারণ সম্ভবত হিজবুল্লাহকে আক্রমণ করা। কিন্তু বিষয়টি ইসরায়েলকে লেবাননে আরও পুরোদমে বোমা হামলার অজুহাতও তৈরি করে দেয়। এখন পর্যন্ত, হিজবুল্লাহর বেশ কয়েকজন সিনিয়র কমান্ডারকে হত্যা করা সত্ত্বেও, গ্রুপটি তার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা থেকে বিরত রয়েছে।

কিন্তু যখন ইরান দেখেছে যে, দামেস্কে ইরানের দূতাবাস কমপ্লেক্সে ইসরায়েল হামলা করেছে এবং কূটনৈতিক মিশনে এটি নজিরবিহীন সামরিক হামলা ছিল বলে ব্যাপকভাবে প্রচার পেয়েছে, একই সঙ্গে ইরানের একজন জেনারেলকে হত্যা করা হয়েছে, তখন তেহরান ইসরায়েলের ওপর সরাসরি আক্রমণের বাজি ধরেছে। নিঃসন্দেহে ইরানের আক্রমণটি ১৯৯১ সালের পর থেকে ইসরায়েলের ওপর কোনো ভিন্ন রাষ্ট্রের প্রথম আক্রমণ ছিল। তবে ইরান সতর্ক ছিল এ ব্যাপারে যে, তাদের আক্রমণ হবে সীমিত। আক্রমণের বেশিরভাগ প্রজেক্টাইলই ছিল ড্রোন, যা ইরান থেকে ছোড়ার পর কয়েক ঘণ্টা আকাশে উড়ে এবং সবগুলোকেই গুলি করা হয়। ইরানের কর্মকর্তারাও বারবার স্পষ্ট করেছেন যে, আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোকে আক্রমণের ৭২ ঘণ্টা আগে সতর্ক করা হয়েছিল। বস্তুত, কোনো রাষ্ট্রের কোনো গুরুতর বস্তুগত ক্ষতি করার পরিকল্পনা কিংবা পদক্ষেপ ইরান গ্রহণ করেনি।

যুদ্ধের ঝুঁকি

এরপর কী হবে? ইসরায়েল কিছু ক্ষমতা ব্যবহার করে সামরিকভাবে জবাব দেবে এর একটি উচ্চ সম্ভাবনা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে নিরাপত্তার বাজপাখি ও ইরানকে তার জায়গায় রাখার ক্ষেত্রে একমাত্র যোগ্য নেতা হিসাবে ঘোষণাকারী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের সরাসরি আক্রমণের কোনো সামরিক প্রতিক্রিয়াই দেখাবে না, এর সম্ভাবনা কম।

ইসরায়েল, বিশেষ করে নেতানিয়াহুর মতো ডানপন্থিরা, এ উপলব্ধিতে নিজেদের গর্বিত মনে করে যে, ইসরায়েলই মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান সামরিক শক্তি। এবং সেই ভাবমূর্তি বজায় রাখার জন্য প্রতিরোধ অত্যাবশ্যক। বিশেষ করে ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার ক্ষয়ক্ষতির পর। এখন পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য মিত্ররা গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে দৃঢ় অবস্থানে থাকলেও তারা নেতানিয়াহুকে ইরানের আক্রমণের প্রতি সামরিক সাড়া না দেওয়ার জন্য এবং এমন একটি যুদ্ধ শুরু করার ঝুঁকি না নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছে। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে ওয়াশিংটন অংশগ্রহণ করতে বাধ্য হবে।

নেতানিয়াহুকে বারবার ‘বিজয় অর্জন করুন’ বলা মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সুরে পরিবর্তন এসেছে ইরান ইস্যুতে। তিনি নির্বাচনের বছরে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি ক্ষতিকর যুদ্ধ এড়াতে আগ্রহী উঠেছেন। কারণ গাজায় ৩৪,০০০ ফিলিস্তিনিকে হত্যাকারী ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়ার ফলে তার জনপ্রিয়তা ইতিমধ্যেই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাইডেন প্রশাসন সম্ভবত জানে যে, ইসরায়েল আক্রমণ করবে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র সচিব ডেভিড ক্যামেরন ইতিমধ্যে অনেক কিছু স্বীকার করেছেন তবে তারা নেতানিয়াহুকে তার প্রতিশোধ সীমিত রাখার জন্য চাপ দেবে। এবং তারপর তারা ইরানের প্রতি অঙ্গুলিনির্দেশ করে বলবে যে, ইরানও যেন সামরিক প্রতিক্রিয়া না জানায় এবং ইসরায়েল-ইরান যেন তাদের প্রক্সি যুদ্ধে ফিরে যায়। শুনে মনে হচ্ছে ইসরায়েলি সরকারের কিছু মেসিয়ানিক ব্যক্তি ছাড়া সবাই একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়াতে চায়, যে যুদ্ধ জড়িত সব দেশ ও বিস্তৃত অঞ্চলের জন্য ধ্বংসাত্মক হবে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, প্রতিটি পক্ষের নিজস্ব লক্ষ্য ও আকাক্সিক্ষত ফলাফল নেই। এসব লক্ষ্য ও ফলাফলের সব কটিই সম্ভাব্য দ্বন্দ্বের দিকে নিয়ে যেতে পারে। যদিও সবাইকে দৃশ্যত দ্বন্দ্ব এড়াতে আগ্রহী মনে হয়।

ভুল হিসাবনিকাশের সম্ভাবনা

এমনকি প্রতিটি পক্ষও যদি একটি পূর্ণাঙ্গ সংঘাত এড়াতে চায়, তবুও হিসাবনিকাশের ভুলে নানা কিছু ঘটতে পারে। সর্বোত্তম পরিকল্পনাগুলো প্রায়ই বিভ্রান্ত হতে পারে। এটি আমাদের জন্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা-স্মৃতির দিকে ইঙ্গিত করার মতো একটি নির্দেশনাও হতে পারে। সারাজেভোতে যেভাবে একটি হত্যাকাণ্ড পরবর্তী ঘটনাগুলোর একটি ধারাবাহিক শৃঙ্খল তৈরি করেছিল। যা অক্ষ ও মিত্রশক্তির দেশগুলোকে যুদ্ধে টেনে এনেছিল। সে বিশ্বযুদ্ধ সুবিবেচনাকে পরাজিত করে লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করতে বাধ্য করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ইতিহাসের এমন কোনো শিক্ষা হওয়া উচিত নয়, যা ভুলে যাওয়া যায়। কিন্তু যুদ্ধ অনিবার্য নয়, এবং দেশগুলো চাইলে যুদ্ধের প্রান্তসীমা থেকে ফিরে আসতে পারে। ১৯৬২ সালের কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকট এ ক্ষেত্রে একটি জরুরি উদাহরণ হতে পারে। উক্ত সংকটে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্নায়ুযুদ্ধ ছাড়িয়ে বিপর্যয়কারী পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছিল। শেষ পর্যন্ত তারা একটি সমাধানে পৌঁছেছিল, যা বিশ্বকে মারাত্মক বিপদ এড়াতে সাহায্য করেছে। আজকেও সেটা হতে পারে। কিন্তু বর্তমান সংকট এড়াতে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে কোনো সমাধান হতে পারে না। কেন না, এ অঞ্চলটি আজ যে কারণে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে, আমাদের তার মূলে যেতে হবে : আর তা হলো গাজায় ইসরায়েলের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ। যতদিন সংঘাত চলবে এবং যতদিন ইসরায়েল বেসামরিক হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাবে, ততদিন এমন সম্ভাব্য উত্তেজনা বিদ্যমান থাকবে, যা পুরো অঞ্চলকে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে টেনে নিয়ে আসতে পারে। যতদিন এটি অমীমাংসিত থাকবে এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের অবৈধ দখল অব্যাহত থাকবে ততক্ষণ, ততদিনই এই অঞ্চলের যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। সর্বশেষ স্ফুলিঙ্গের জন্য অপেক্ষা করা হবে।

লেখক : আলজাজিরা ডিজিটালের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক সম্পাদক।

আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর : মোহাম্মাদ ফজলে রাব্বি

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত