ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট উদ্ভাবন করল বিআরআইসিএম

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২৪, ০২:৩৪ এএম

বাংলাদেশে এই প্রথমবারের মতো সরকারি পর্যায়ে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট আবিষ্কার করেছে বাংলাদেশ রেফারেন্স ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল মেজারমেন্টস (বিআরআইসিএম)। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এই সংস্থার উদ্ভাবিত কিট ইতিমধ্যেই উৎপাদনের জন্য অনুমোদন দিয়েছে সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। এখন যেকোনো সময় চাহিদা অনুপাতে এই কিট তৈরি করে সরবরাহ করতে পারবে বিআরআইসিএম কর্র্তৃপক্ষ।

বিআরআইসিএমের বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই কিট দিয়ে মানুষ ঘরে বসেই ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে পারবে। ফলাফল পেতে সময় লাগবে বড়জোর ১০-১৫ মিনিট। দাম পড়বে বিদেশ থেকে আমদানি করা কিটের চেয়ে অনেক কম, ১০০-১২০ টাকার মধ্যে। এখন ডেঙ্গু পরীক্ষায় প্রতিটি কিটের দাম পড়ে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা।

এ ব্যাপারে এই কিট আবিষ্কার দলের একজন সদস্য বিআরআইসিএমের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান রাজু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর অনুমোদন দিয়েছে। সরকারি বা বেসরকারিভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান বা কেউ চাইলে আমরা উৎপাদন করে সরবরাহ করতে পারব। আমাদের উৎপাদন ব্যবস্থাও তৈরি আছে।’

গত জানুয়ারিতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে এই কিটের বাণিজ্যিক উৎপাদনের অনুমোদন দেয়। এর আগে বিআরআইসিএমের মহাপরিচালক ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মালা খানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানের একদল বিজ্ঞানী কিটের প্রটোকল তৈরি করে ২০২২ সালের মার্চে বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলে (বিএমআরসি) জমা দিই। পরে সরকারের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারে ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের আগস্ট মধ্যে কিটটির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হয়।

এ ব্যাপারে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাহবুব হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সবকিছু যাচাই-বাছাই শেষে ডেঙ্গু কিটের জন্য বিআরআইসিএমকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই বছরের ১৫ জানুয়ারি থেকে প্রতিষ্ঠানটি এই কিট উৎপাদন করার অনুমোদন পেয়েছে।

কীভাবে কাজ করবে এই কিট : এই কিট দিয়ে ডেঙ্গু পরীক্ষার পদ্ধতির ব্যাপারে বিআরআইসিএমের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান রাজু বলেন, যে কেউ তার আঙুলের ডগা থেকে দু-তিন ফোঁটা রক্ত নিয়েই এই টেস্ট করতে পারবে। এখন পরীক্ষার জন্য সাধারণত মানুষের রক্ত নিতে গেলে সবাইকে হাসপাতালে যেতে হয়। কারণ সবাই রক্ত নিতে পারে না। আমরা এই কিটে এমন একটি প্রযুক্তি যুক্ত করেছি, যে কেউ ঘরে বসেই রক্ত নিয়ে পরীক্ষা করতে পারবে তার ডেঙ্গু হয়েছে কি না। একটা ম্যানুয়াল বা নির্দেশনা দেওয়া আছে যে কয় ফোঁটা রক্ত নিতে হবে ও আরেক ধরনের তরল সল্যুশন আছে সেটা দিতে হবে। যদি পজিটিভ হয় তাহলে দাগ দেখা যাবে না। আর যদি নেগেটিভ হয়, তাহলে দাগ দেখা যাবে। অনেকটা প্রেগনেন্সি পরীক্ষার কিটের মতো। ডেঙ্গু পজিটিভ হলে দুটো দাগ আসবে। আর নেগেটিভ হলে একটা দাগ আসবে।

ফল ১০-১৫ মিনিটের মধ্যেই : বিআরআইসিএমের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা জানান, একজন মানুষ বাসায় বসে, কিংবা হাসপাতালে, যে যেভাবে চান এই কিটের মাধ্যমে ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে পারবেন। ১০-১৫ মিনিটের মধ্যেই ফলাফল জানা যাবে। ওই সø্যাইডের মধ্যেই ফলাফল আসবে।

এই কিটের সংবেদনশীলতার ব্যাপারে বিআরআইসিএমের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান রাজু বলেন, ‘আমরা ট্রায়াল করেছি। আমাদের টেকনিক্যাল যত কাজ সব করেছি। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ট্রায়ালের ফলাফল দেখেই অনুমোদন দিয়েছে। তা না হলে তো আমরা উৎপাদনের অনুমোদন পেতাম না। এই কিটের স্পেসিফিসিটি শতভাগ ও সেনসিসিটিভিটি (কোনো রোগনির্ণায়ক পরীক্ষা বা বাছাই পরীক্ষার সংবেদনশীলতা) ৯৯ শতাংশ। গড়ে শতভাগ সফল বলা চলে।

দাম পড়বে ১০০-১২০ টাকা : বিআরআইসিএমের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা জানান, প্রতিষ্ঠান ডেঙ্গু পরীক্ষার অন্যান্য কিটের বাজারমূল্য যাচাই করেছে। চীন, ভারত, কোরিয়া, আমেরিকার যে কিট, সেগুলো ১৫০-২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। বিআরআইসিএমের কিটের দাম পড়বে ১০০-১২০ টাকা। এ ধরনের মেডিকেল ডিভাইস বাংলাদেশে খুব কমসংখ্যক তৈরি হয়। এ ধরনের ডিভাইস ৯৮ শতাংশই বিদেশ থেকে আসে। আমদানিনির্ভর।

এই কিটের সফলতার প্রসঙ্গে বিআরআইসিএমের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান রাজু বলেন, ‘এর আগে আমরা ভিটিএম বা ভাইরাল ট্রান্সপোর্ট মিডিয়া বা কভিডের স্যাম্পল সংগ্রহ করার কিট তৈরি করি এবং বাংলাদেশে ২৫ লাখের বেশি কিট সরকারকে দিয়েছি। এটা বাইরে থেকে ৪৩০টি পিস আনত। সেটা আমরা তৈরি করে নামমাত্র মূল্য ১০০ টাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করি। ওই সময় আমরা দেখি বাংলাদেশে এ ধরনের সুযোগ সরকারি পর্যায়ে নেই। যখন এসব পণ্যের সংকট পড়ে, তখন সরকার বিপাকে পড়ে কোথা থেকে আনবে। স্বাস্থ্য খাতে সরকারকে অনেক ভর্তুকি দিতে হয়। যারা সাধারণ মানুষ তারা সরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। তাদের পক্ষে বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে এত টাকা ব্যয় করে পরীক্ষা করা সম্ভব না। তখন আমাদের ম্যাডাম চিন্তা করল মেডিকেল ডিভাইস নিয়ে গবেষণার করার। তখন আমরা চিন্তা করলাম ডেঙ্গু বাংলাদেশে বারবার আসে। এটার খুবই চাহিদা। এটার গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন থাকে। সেজন্য এটা নিয়ে গবেষণা করে সরকারি পর্যায়ে আমরাই প্রথম ডেঙ্গু কিট উৎপাদন করলাম।’

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে দৈনিক ৫০ লাখের বেশি কিট তৈরি করার সক্ষমতা আছে। মাসে ৫-৬ লাখ কিটের চাহিদা থাকলে, সেটা আমরাই পূরণ করতে পারব। এটা তৈরি করতে যে ধরনের ল্যাবরেটরি দরকার, ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট, সেটাও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদিত। সরকারি-বেসরকারি যারাই চাইবে আমরা উৎপাদন করে দেব। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন।’

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এই কিট উৎপাদনে অটোমেটিক সিস্টেম ডেভেলপ করা হয়েছে। কোনো ধরনের মানবদেহের স্পর্শ ছাড়াই তৈরি হবে। রোবোটিক একটি মেশিন আছে। সেটা দিয়ে তৈরি করতে পারব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত