ইমরানুর রহমান দৌড়ান। নাজমুল হোসেন শান্তও দৌড়ান, তবে সেটা রান করতে বা রান বাঁচাতে। রাকিব হোসেনও দৌড়ান, গোল করতে। বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতির ২০২৩ সালের বর্ষসেরা ক্রীড়াবিদের পুরস্কার, কুল-বিএসপিএ স্পোর্টসম্যান অব দ্য ইয়ারের পুরস্কারের দৌড়ে ছিলেন তিনজনই। তবে সেরা হওয়ার দৌড়ে বাকি দুজনকে পেছনে ফেলে পুরস্কার জিতে নিয়েছেন ইমরানই, দৌড়ে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের যা সাফল্য সে সব এসেছে তার পায়ে ভর করেই।
রবিবারের দুপুর, তাপদাহ উপেক্ষা করে ক্রীড়াঙ্গনের চেনামুখদের অনেকেই উপস্থিত হয়েছিলেন প্যান-প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের বলরুমে। কুল-বিএসপিএ স্পোর্টস অ্যাওয়ার্ডের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকায় সাবেক ফুটবলার কায়সার হামিদ, ছাইদ হাসান কানন, রুম্মান বিন ওয়ালি সাব্বির থেকে শুরু করে হালের রুমন সানা, দিয়া সিদ্দিকীরা এসেছিলেন আনন্দযজ্ঞের অংশ হতে। ক্রীড়াঙ্গনের এই মিলনমেলার অন্যতম আকর্ষণ ক্রীড়াবিদদের ভিন্নধর্মী পরিবেশনা। এই অনুষ্ঠানেই জানতে পারা যায়, কেউ ক্রিকেট খেলার পাশাপাশি গাইতে পারেন চমৎকার। বাংলা বলে চমকে দেন ভিনদেশি কোচরাও। এবারেও সে রকম চমকের কমতি ছিল না। উপমহাদেশের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার, দাবাড়ু নিয়াজ মোরশেদ শুনিয়েছেন গান। নাচের তালে হৃদয়ে ঝড় তুলেছেন ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে পদকজয়ী শুটার তাসমায়াতি এমা। সাবেক ক্রিকেটার ইশতিয়াক আহমেদ শুনিয়েছেন গান। কসরত দেখিয়েছে উশু দল। এমন অনেক মনোজ্ঞ আয়োজনের ফাঁকে ফাঁকে পুরস্কার বিজয়ীদের হাতে ক্রেস্ট, সনদ ও চেক তুলে দিয়েছেন আমন্ত্রিত অতিথিরা।
মোট ১৬টি ক্যাটাগরিতে ১৮ ব্যক্তি/সংস্থাকে দেওয়া হয়েছে কুল-বিএসপিএ বর্ষসেরার পুরস্কার। বর্ষসেরা পুরুষ ক্রিকেটার (নাজমুল হোসেন শান্ত), বর্ষসেরা নারী ক্রিকেটার (ফারজানা হক পিংকি), বর্ষসেরা ফুটবলার (রাকিব হোসেন), বর্ষসেরা অ্যাথলেট (ইমরানুর রহমান), সেরা বক্সার (সেলিম হোসেন), সেরা শুটার (কামরুন নাহার কলি), সেরা টেবিল টেনিস খেলোয়াড় (রামহিম লিয়ন বম), উদীয়মান ক্রীড়াবিদ (ফুটবলার শেখ মোরসালিন), বর্ষসেরা দল (অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দল), সক্রিয় সংস্থা (প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর), বর্ষসেরা কোচ (আলফাজ আহমেদ), বিশেষ সম্মাননা (মনজুর হোসেন মালু), তৃণমূল সংগঠক (মোয়াজ্জেম হোসেন, ভারোত্তোলন) ও সেরা সংগঠক (হাবিবুর রহমান, কাবাডি)। ভোটের মাধ্যমে পপুলার চয়েজ অ্যাওয়ার্ডে জয়ী হয়েছে ফুটবলার মোরসালিন। বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন ‘গেস্ট অব অনার’ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সাবেক যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্কয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু।
রাসেল তার বক্তব্যে জানান, বিএসপিএ’র প্রতি তার ভালোবাসার কথা, ‘দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে বিএসপিএ এই আয়োজন করে যাচ্ছে। এজন্য আমার পক্ষ থেকে বিএসপিএকে আন্তরিক অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের খেলোয়াড়, সংগঠকরা তাদের পরিশ্রম দিয়ে আজ যে পর্যায়ে এসেছি, তারা ক্রীড়াঙ্গনকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবেন’। বিএসপিএ’র পুরস্কারের সঙ্গে এক দশকের পথচলার অভিজ্ঞতা জানিয়ে অঞ্জন চৌধুরী বলেছেন, ‘এই অনুষ্ঠানে এলে অনেকের সঙ্গে দেখা হয়। এটা ভালো লাগার বিষয়। আমরা ১০ বছর ধরে বিএসপিএ’র সঙ্গে আছি। যতদিন তারা আমাদের সঙ্গে রাখবে, ততদিন আমরা থাকব। এই পুরস্কার আমার মনে হয় ক্রীড়াবিদদের অনুপ্রাণিত করে। যারা পুরস্কার পেয়েছেন, ধন্যবাদ। যারা পাননি, মন খারাপের কিছু নেই। তারা যেন এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেন, যাতে ভবিষ্যতে ভালো করতে পারেন’। কুল-বিএসপিএ স্পোর্টসপারসন অব দ্য ইয়ার-এর পুরস্কার পেয়েছেন স্প্রিন্টার ইমরানুর রহমান। ক্রেস্ট এবং সনদের পাশাপাশি ইমরানুর পেয়েছেন ১ লাখ টাকা। রানার আপ হয়েছেন ক্রিকেটার নাজমুল হোসেন শান্ত ও ফুটবলার রাকিব হোসেন, তারা প্রত্যেকে পেয়েছেন ৫০ হাজার টাকা করে। পপুলার চয়েজ অ্যাওয়ার্ডের পুরস্কার ১ লাখ টাকা। এছাড়া প্রতিটি ক্যাটাগরির বিজয়ীরা প্রত্যেকে পেয়েছেন ২৫ হাজার টাকা।
বছর সেরার পুরস্কার জিততে না পারলেও নিজ নিজ খেলায় বছরের সেরা ঠিকই হয়েছেন শান্ত এবং রাকিব। ২০২৩ সালে ৫টি সেঞ্চুরি করা শান্ত পেয়েছেন বর্ষসেরা ক্রিকেটারের পুরস্কার। সস্ত্রীক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান উপভোগ করা শান্ত শুনিয়েছেন তার সাফল্যের পেছনে শত সমালোচনাতেও অবিচল থাকার গল্প। রাকিব আশা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের ফুটবলের নতুন জাগরণের। আর বছরের সেরা ইমরানুর শুনিয়েছেন এই বছর আরও ভালো করার আশাবাদ, ‘সবাইকে ধন্যবাদ। সামনে প্যারিস অলিম্পিকস ও দক্ষিণ এশিয়ান গেমস আছে, সেখানে ভালো কিছু করতে চাই।’
বিএসপিএ সভাপতি রেজওয়ান উজ জামান রাজিবের বিদায়ী বক্তব্যে ভাঙে ক্রীড়াঙ্গনের এই বার্ষিক মিলনমেলা। গ্রীষ্মের ঘনিয়ে আসা সন্ধ্যায় চা চক্রের আমন্ত্রণের মাধ্যমে শেষ হয় কুল-বিএসপিএ স্পোর্টস অ্যাওয়ার্ডের অনুষ্ঠান, সেই সঙ্গে প্রতিশ্রুতি পরের বছর আরও চমক আর আরও আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের।
