ঝরে যাচ্ছে আম লিচুর গুটি

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:০৪ এএম

তীব্র তাপপ্রবাহে ঝরে যাচ্ছে আম ও লিচুর গুটি। আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জে উৎপাদনগত দিক থেকে ‘অফ ইয়ার হিসেবে’ একে তো মুকুল এসেছিল কম। তার ওপর গুটি ঝরে পড়তে থাকায় আমের ভালো ফলন নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন আমচাষিরা।

একইভাবে ‘মধু’র জেলা হিসেবে পরিচিত দিনাজপুরে মুকুল থেকে গুটি আসার সময় অব্যাহত অনাবৃষ্টি আর তাপপ্রবাহের কারণে পুড়ে যাচ্ছে লিচুর মুকুল। সেই সঙ্গে গুটি ঝরে যাচ্ছে বলে দুশ্চিন্তায় লিচুচাষিরা।

আমের উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা : প্রচন্ড গরমের কারণে আমের স্বাভাবিক গঠন বা বৃদ্ধি প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। কৃষিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর প্রভাব পড়বে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে। আম বাঁচাতে তাদের পরামর্শ নিয়মিত গাছে গাছে সেচ ও প্রয়োজনীয় পানি স্প্রে করার।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে বহু বছর আগে থেকে ভালো ফলন হলে পরের বছর কম ফলন হয়। যেটিকে স্থানীয় লোকজন ‘অফ ইয়ার’ এবং ‘অন ইয়ার’ বলে থাকে। সে হিসেবে চলতি মৌসুম ‘অফ ইয়ার’।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত বছর মৌসুমের শুরুতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫ উপজেলার আমগাছে শতভাগ মুকুল এসেছিল। সেখানে এ বছর মুকুল আসে ৭০ থেকে ৭৫ ভাগ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার আমচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তীব্র খরার কারণে আমের কিছু গুটি ঝরে পড়েছে। তবে, ঝরে পড়ার হার এখনো ব্যাপকভাবে দেখা দেয়নি। খরা আর তাপপ্রবাহ আরও দীর্ঘ হলে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বেন তারা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুনজের আলম মানিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবার আমাদের অঞ্চলে আমের উৎপাদনগত দিক থেকে অফ ইয়ার। এটা প্রকৃতিগতভাবে হয়ে আসছে। এটাকে আমাদের মেনে নিতে হবে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে আম ঝরে পড়ার যে বিষয়টি এখনো তীব্র হয়নি। তবে তাপপ্রবাহ দীর্ঘ হলে চাষিদের স্বপ্ন আরও মলিন হয়ে যাবে। এখন প্রকৃতির দিকেই আমরা তাকিয়ে আছি।’

তিনি বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে দুই ধরনের আমের বাগান রয়েছে। একটি পুরনো জাতের, অন্যটি নাবি জাতের। নাবি জাতের বাগানগুলোর সিংহভাগই বরেন্দ্র অঞ্চলে। এখন সেখানে সেচ দিয়ে ধান বাঁচাবেন, নাকি আম বাঁচাবেন। আর আমের গাছে সেচের যে খরচ সেটাও অনেক।

আম নিয়ে কাজ করা চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোখলেসুর রহমান চাষিদের আশাহত না হয়ে পরিচর্যা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, এবার বড় গাছগুলোতে আম কিছুটা কম এসেছিল। ছোট গাছগুলোতে আম বেশি এসেছিল। তারপরও জেলা জুড়ে যথেষ্ট পরিমাণ আম ছিল। এখন আমের সাইজ, মার্বেল সাইজ অতিক্রম করছে। এমন সময়ে এক সপ্তাহ ধরে তাপমাত্রা অত্যন্ত বেড়ে যাওয়ার কারণে আমের গুটি ঝরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং ঝরে যাচ্ছে।’ এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বাগানে সেচ দিতে হবে। ১০ দিন অন্তর অন্তর সেচ চালিয়ে যেতে হবে যত দিন বৃষ্টি না হচ্ছে।

দিনাজপুরে লিচু নিয়ে দুশ্চিন্তা : দিনাজপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের লিচুগাছগুলোতে এবার ব্যাপক মুকুল হয়েছে। আর এসব মুকুল থেকে চৈত্র মাসের শেষ দিক থেকেই আসতে শুরু করে গুটি। কিন্তু গুটি হওয়ার এ সময় অব্যাহত তাপপ্রবাহ আর অনাবৃষ্টির কারণে পুড়ে যাচ্ছে গাছের মুকুল, ঝরে পড়ছে নতুন গুটি।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করে গাছের লিচু রক্ষায় বাগানে সেচ ও গাছের বিভিন্ন পরিচর্যা করছেন তারা। বিরল উপজেলার মাধববাটী, সদর উপজেলার মাসিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, লিচু বাগানে শ্যালো মেশিন দিয়ে সেচ দিচ্ছেন লিচুচাষিরা। কেউ কেউ লিচু রক্ষার জন্য গাছে কীটনাশক প্রয়োগ করছেন।

সদর উপজেলার মাসিমপুর গ্রামের লিচুচাষি আজিজ হোসেন জানান, তার বাগানে ছোট-বড় মিলিয়ে শতাধিক লিচুর গাছ রয়েছে। প্রথম অবস্থায় প্রায় প্রতিটি গাছেই ব্যাপক মুকুল আসায় এবার লিচু নিয়ে বেশ লাভের স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। কিন্তু গুটি আসার মোক্ষম সময়ে তীব্র রোদ আর গরমের কারণে পুড়ে গেছে গাছের অনেক মুকুল এবং এখন ঝরে পড়ছে লিচুর গুটি।

দিনাজপুরে লিচুর গ্রাম হিসেবে পরিচিত বিরল উপজেলার মাধববাটী। এই গ্রামের লিচুচাষি খায়রুল ইসলাম বলেন, প্রতিকূল এই আবহাওয়ার কারণে এবার লিচুর ব্যাপক ক্ষতি হবে। লিচু রক্ষায় কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিচ্ছেন বলেও জানালেন তিনি।

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নুরুজ্জামান বলেন, ‘জেলায় বর্তমানে সাড়ে ৫ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে লিচুর গাছ রয়েছে। লিচুগাছে এবার প্রচুর মুকুল আসার পরও বৈরী আবহাওয়ার কারণে কিছু মুকুল ঝরে যাচ্ছে। তারপরও এখন দানাপর্যায়ে চলে এসেছে। সে ক্ষেত্রে আমরা চাষিপর্যায়ে বলছি যদি সঠিকভাবে সেচ দেয়, সঠিকভাবে ওষুধ প্রয়োগ করে তাহলে এই লিচুকে আমরা হারভেস্ট পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারব এবং আমরা পর্যাপ্ত ফলন পাব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত