আলফাজ যেখানে সালাউদ্দিনের সমান

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:১৮ এএম

দেশের সর্বকালের সেরা স্ট্রাইকারের তালিকা করা হলে দুজনের নামই আসবে ওপরের সারিতে। দুজন খেলেছেন দুটি ভিন্ন সময়ে। নিজেদের সময়ের দুজনই ছিলেন সেরা। আবার বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার বেলায়ও গায়ে চাপিয়েছেন মর্যাদার ১০ নম্বর জার্সি। পায়ের জাদুতে দেশের ফুটবল রাঙানোর পরপরই তারা পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ফুটবল কোচিং। এই অঙ্গনেও হয়েছেন সেরা। বলছি, দেশের ফুটবলের দুই কিংবদন্তি কাজী সালাউদ্দিন ও আলফাজ আহমেদের কথা। সালাউদ্দিন কোচিং ছেড়ে গেল চার মেয়াদে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি। আর আলফাজ দিশাহীন মোহামেডানের কোচ হয়ে ফেরাচ্ছেন কক্ষপথে। দুজনের আরেকটা বড় মিল হলো দুজনই খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে পেয়েছেন দেশের ক্রীড়া সাংবাদিকদের ঐতিহ্যবাহী সংগঠন বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতির (বর্তমানে বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন সংক্ষেপে বিএসপিএ) স্বীকৃতি। যা আর কোনো ফুটবলারের ভাগ্যে জোটেনি।

সত্তর-আশির দশকের ফুটবলের পোস্টার বয় ছিলেন সালাউদ্দিন। কেবল স্টাইল নয়, গোল করার সহজাত ক্ষমতা ও সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে জুড়ি ছিল না তার। সেই সময়টায় ছিল ফুটবলের জোয়ার। দেশের ফুটবল ছিল ঘরোয়াকেন্দ্রিক। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের হয়ে মুক্তিযুদ্ধকালে ভারত সফরে আলো ছড়ানোর পর সত্তর-আশির দশকে ঘরোয়া ফুটবলকে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা এনে দিতে রেখেছেন অগ্রণী ভূমিকা। দেশের সর্বকালের সেরা ফুটবলার কে এই প্রশ্নে সালাউদ্দিনের নামটাই আসবে সবার আগে। যার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি তাকে ১৯৭৯ সালের বর্ষসেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি দেয়। ১৯৮৪ সালে বুট জোড়া তুলে রাখার পরপরই আবাহনীর কোচের দায়িত্ব নিয়েছিলেন সালাউদ্দিন। পরে জাতীয় দলকেও কোচিং করিয়েছেন। সাংবাদিকদের একই সংগঠন সালাউদ্দিনকে সেরা কোচের স্বীকৃতি দেয় ১৯৯২ সালে।

আলফাজের গল্পটাও অনেকটা সালাউদ্দিনের মতোই। তারকাখ্যাতির প্রশ্নে একেবারে কম যান না তিনিও। যদিও নব্বইয়ের দশকে সামগ্রিকভাবেই দেশের ফুটবলের জনপ্রিয়তায় শুরু হয়েছিল ভাটার টান। এর মধ্যেও নিখুঁত ফিনিশার ও ক্ষিপ্রগতির জন্য সুখ্যাতি কুড়িয়েছিলেন আলফাজ। সালাউদ্দিনের মতো দুই জনপ্রিয় দল আবাহনী ও মোহামেডানে খেলা আলফাজ দেশের প্রথম তারকা হিসেবে এশিয়ার মাস সেরা স্বীকৃতিও পান। জাতীয় দলের হয়ে ১০ গোল করা আলফাজ অবশ্য ক্লাব ক্যারিয়ারের বেশিটা সময়ই কাটিয়েছিলেন মোহামেডানের ডেরায়। পেশাদার-পূর্ব যুগে সাদা-কালোদের অনেক সাফল্যের নেপথ্য নায়ক হয়েছিলেন তিনি। যার পুরস্কার হিসেবে ১৯৯৯ সালের সেরা ফুটবলার হন ক্রীড়া লেখক সমিতির দৃষ্টিতে। ২০১৩ সালে দীর্ঘ ফুটবল ক্যারিয়ারের ইতি টানার পর থেকেই কোচিংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বড্ড সাদামাটা জীবনযাপনে অভ্যস্ত আলফাজ। তবে বড় কোনো দলে শুরুর দিকে কাজ করা হয়নি। সুযোগটা চলে আসে বছর তিনেক আগে।

২০২১-২২ মৌসুমে মোহামেডান খেলছিল ব্রিটিশ কোচ শন লিনের অধীনে। আলফাজ ছিলেন লিনের সহকারী। মৌসুমের শেষভাগে ব্যক্তিগত কাজে ক্লাব থেকে ছুটি নিয়ে চলে যান লিন। তখন অন্তর্বর্তীকালীন হেড কোচ হিসেবে মোহামেডানের ডাগআউটে অভিষেক ঘটে আলফাজের। তার অধীনে শেষ তিনটি লিগ ম্যাচেই জয় পায় মোহামেডান। সেই তিন ম্যাচের সাফল্যই তাকে দেখায় বড় দায়িত্বের স্বপ্ন। তবে সত্যিকারের কোচ হয়ে ওঠার অপেক্ষাটা একটু বেড়ে গিয়েছিল। লিন-পরবর্তী সময়ে মোহামেডান হেড কোচ হিসেবে বেছে নেয় আরেক সাবেক তারকা শফিকুর রহমান মানিককে। তবে তার অধীনে মোটেই ভালো করছিল না দলটি। তাই তাকে সরিয়ে ফের দায়িত্বে আনা হয় সহকারী আলফাজকে। আর এবার দায়িত্বে এসেই চমক দেখান। গত মৌসুমে ফেডারেশন কাপের ফাইনালে চিরশত্রু আবাহনীকে হারিয়ে ১৪ বছরের শিরোপার অপেক্ষার ইতি টানেন মোহামেডানের। শুধু তা-ই নয়, একটা মাঝারি সারির দলকে লড়াকু রূপে বদলে দিয়ে গত মৌসুমের লিগেও ভালো অবস্থানে শেষ করান। এসবের স্বীকৃতিস্বরূপ আলফাজকে বর্ষসেরা কোচ হিসেবে বেছে নেয় বিএসপিএ। যে স্বীকৃতি রবিবার জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তুলে দেওয়া হয় আলফাজের হাতে। এর সঙ্গে সঙ্গেই সালাউদ্দিনের সারিতে চলে আসেন আলফাজ।

পেশাদারি জমানায় ভীষণ ম্লান সাদা-কালোর মোহামেডান। একবারও তাদের ভাগ্যে জোটেনি প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা। প্রথম তিন আসরে কোনো মতে রানার্সআপ হতে পারলেও এরপর আর সেই অবস্থানেও শেষ করা হয়নি। তবে স্বপ্নবাজ আলফাজে এবার বড় স্বপ্নের দিকেই ধেয়ে চলেছে মোহামেডান। আক্রমণভাগের ত্রাস আলফাজ কোচ হিসেবেও ভীষণ আক্রমণাত্মক। আর সাদাসিধে জীবনযাপনের কারণেই খেলোয়াড়দের সঙ্গে তার সম্পর্কটা নিবিড়। তাই কাকে কী করে উজ্জীবিত করতে হয়, কার ভেতরে কতটা সামর্থ্য আছে, সেটা কী করে বের করে আনতে হয়, তার সবকিছুই নখদর্পণে আলফাজের। তাই তো চলতি মৌসুমে মোহামেডান প্রথম খেলেছে স্বাধীনতা কাপের ফাইনালে। চলতি লিগের শিরোপা রেসে শীর্ষে থাকা বসুন্ধরা কিংসের পিছু পিছু ছুটছে কেবল মোহামেডান। আবার ফেডারেশন কাপেরও সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে ফেলেছে ইতিমধ্যে।

নিজেকে কখনোই জাদুকর ভাবেন না; বরং পরিশ্রমকে পুঁজি করে আক্রমণাত্মক ফুটবলেই খুঁজে পেতে চান সাফল্য। সে পথে হেঁটে কোচিং গুরু লিনকে তো আলফাজ ছাড়িয়ে গেছেনই, কে জানে, একদিন কোচ হিসেবে হয়তো সালাউদ্দিনের সাফল্যকেও ছাপিয়ে যাবেন। সময়টা যে এখনো ফুরিয়ে যায়নি। বয়স তো মাত্রই ৫০।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত