গাধা নিয়ে চীন-আফ্রিকা টানাটানি

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ১২:১৭ এএম

নিরীহ প্রাণী গাধা এখন বিশ্ব বাণিজ্যের ‘হট আইটেম’। বিশেষ ওষুধ ইজিয়াও তৈরির জন্য চীনে এর চাহিদা অনেক।   সেই গাধা নিয়ে চলছে চীন-আফ্রিকা টানাপড়েন। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

গাধাকে গৃহপালিত প্রাণী হিসেবে প্রথম গ্রহণ করে আফ্রিকা। কমপক্ষে পাঁচ হাজার বছর ধরে ভারবাহী প্রাণী হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে গাধা। আফ্রিকায় অনেক গ্রামীণ পরিবারের অপরিহার্য সদস্য এ প্রাণী। বিশেষ করে এটি নারীদের ভারী শ্রম থেকে মুক্তি দিয়েছে। বিশ্বে আনুমানিক ৫০০ মিলিয়ন দরিদ্র মানুষের উপার্জনে ব্যবহৃত হচ্ছে গাধা। গাধার প্রধান গুণ ভার বহন। তারা দীর্ঘ দূরত্বে পণ্য এবং পারিবারিক প্রয়োজনীয় জিনিস বহন করে। জমি চাষেও সাহায্য করে থাকে। গাধার দুধের ব্যবহারও রয়েছে। তবে সম্প্রতি এ চতুষ্পদীর আরেক ধরনের ব্যবহার উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে। যার কারণে প্রচুর পরিমাণে জবাই করা হচ্ছে তাদের। অবৈধভাবে কেনাবেচা চলছে। এর কারণ তাদের চামড়া। চীনে গাধার চামড়া থেকে বিশেষ উপায়ে এক ধরনের নির্যাস বের করা হয়। যার বিপুল চাহিদা তৈরি হয়েছে। যে চাহিদা মেটাতে সুদূর আফ্রিকা থেকে খাবার, পানি বা বিশ্রাম ছাড়াই গাধা পাচারের নির্মম এক পদ্ধতি গড়ে উঠেছে।

‘ইজিয়াও’ নামে পরিচিত একটি ঐতিহ্যবাহী ওষুধের জন্য চীনে প্রতি বছর লাখ লাখ গাধা জবাই করা হচ্ছে। ইজিয়াও গাধার চামড়া থেকে নিষ্কাশিত এক ধরনের জেলি দিয়ে তৈরি উপাদান। যা খাবার এবং সৌন্দর্যবর্ধনের পণ্য হিসাবে চীনারা দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহার করে আসছে। তারা বিশ্বাস করে, ইজিয়াও রক্তকে সমৃদ্ধ করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং অনেক রোগের উপশম ঘটায়।

গত সপ্তাহে রয়টার্স এ বিষয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। চলতি সপ্তাহে দ্য আটলান্টিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, এই গাধা বাণিজ্য চীন-আফ্রিকা দ্বন্দ্বের একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে। আফ্রিকার ওপর ঋণসহ অন্যান্য নীতিগত বিষয়ে চীন যত চাপ দিচ্ছে, গাধা রপ্তানিতে আফ্রিকা তত কঠোর হচ্ছে। ইতিমধ্যে তারা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এখন চেষ্টা চালাচ্ছে পাচারসহ অবৈধভাবে চীনে গাধার চামড়া পাঠানোর রাস্তাগুলো বন্ধ করতে। বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, গাধা নিয়ে চীন-আফ্রিকার যে টানাপড়েন তা বিশ্বে রাজনীতিতে একটি নতুন প্রপঞ্চ হিসেবে হাজির হয়েছে। এটি কতদূর যায় তা দেখার বিষয়।

ইজিয়াও

রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে জানায়, ঐতিহ্যগতভাবে ইজিয়াও একটি বিলাসবহুল পণ্য ছিল। ১৬৪৪ থেকে ১৯১২ সাল পর্যন্ত চীনের শাসক কিং রাজবংশের সময় এটি অভিজাতদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পায়। যার ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক বছরে এর জনপ্রিয়তা বেড়েছে। তবে এর পেছনে কাজ করেছে ২০১১ সালে প্রচারিত একটি টেলিভিশন সিরিজ। যার নাম ‘এমপ্রেস ইন দ্য প্যালেস’। যেখানে এ ইজিয়াওর ব্যবহার দেখানো হয়। এরপর থেকে চীনে মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং উঠতি বয়সীদের মাঝে এর চাহিদা বৃদ্ধি পায়। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে এ ওষুধের দাম প্রতি ৫০০ গ্রাম ১০০  ইউয়ান থেকে বেড়ে ২৯৮৬ ইউয়ান হয়েছে। গাধা নিয়ে কাজ করে এমন ব্রিটিশ দাতব্য সংস্থা চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, ইজিয়াও শিল্পের জন্য বছরে আনুমানিক পাঁচ দশমিক নয়  মিলিয়ন গাধার চামড়ার প্রয়োজন হয়। চীনের গাধার সংখ্যা ১৯৯২ সালে ছিল ১১ মিলিয়ন, যা ৮০ শতাংশের বেশি কমে দুই মিলিয়নে নেমে এসেছে। এখন ইজিয়াও শিল্পের প্রয়োজন মেটাতে বিদেশ থেকে গাধার চামড়া সংগ্রহ করতে হচ্ছে। ১৯৯০ সালে দেশটিতে ইজিয়াও তৈরিতে বছরে প্রায় দুই লাখ গাধার চামড়ার প্রয়োজন ছিল। এখন তারা বছরে প্রায় চার থেকে ছয় মিলিয়ন চামড়া ব্যবহার করে। এটি বিশ্বের আনুমানিক ৫৩ মিলিয়ন গাধার ১০ শতাংশের মতো। ইজিয়াও তৈরির প্রক্রিয়ায় জেলটিন পেতে গাধার চামড়া প্রথমে সিদ্ধ করা হয়। তারপর ছাঁকা, কাটা, শুকানো এবং পরিষ্কার করাসহ অনেকগুলো ধাপ রয়েছে। চূড়ান্ত পণ্য থেকে ওষুধ, ফেস ক্রিম এবং লিকার থেকে কেক ও ক্যান্ডি পর্যন্ত তৈরি করা হচ্ছে। আধুনিক কারখানার পাশাপাশি চীনে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রচলিত প্রথায় ইজিয়াও তৈরি হয়। একসময় অত্যন্ত ধনী ব্যক্তিদের সুস্বাদু খাবার হিসেবে খ্যাত ছিল ইজিয়াও। সমসাময়িক চীনে একে সুপারফুড হিসেবে দেখা হয় এবং জিনসেং বা দামি চায়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়।

সংকটে আফ্রিকা

বিবিসি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, আফ্রিকার দেশ কেনিয়ায় পানি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহের জন্য স্টিভ তার গাধার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করতেন। কিন্তু গাধাগুলো চুরি হয়ে গেলে তিনি তার কাজ হারান। স্টিভ বলেন, সেই দিন সকালে তিনি নাইরোবির উপকণ্ঠে তার বাসা থেকে বের হন এবং তার পশু আনতে মাঠে যান। কিন্তু তিনি আর তাদের দেখতে পাননি। তিনি বলেন, আমি সারা দিন, সারা রাত এবং পরের দিন অনুসন্ধান করেছি। তিন দিন পর তার এক বন্ধুর কাছ থেকে ফোন আসে যে, সে প্রাণীর কঙ্কাল খুঁজে পেয়েছে। তাদের হত্যা করা হয়েছিল, জবাই করা হয়েছিল, তাদের চামড়া সেখানে ছিল না। বিবিসি জানায়, এভাবে গাধা চুরি আফ্রিকার অনেক অংশে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।

চীন-আফ্রিকা সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ লরেন জনস্টন রয়টার্সকে বলেন, ইজিয়াওর ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে গাধা আন্তর্জাতিক পণ্যে পরিণত হয়েছে। আফ্রিকায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গাধা থাকার কারণে, তারা এর চামড়ার মূল উৎস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তিনি বলেন, গাধা আফ্রিকা মহাদেশজুড়ে পণ্যবাহী হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। দারিদ্র্য দূরীকরণেও এর ভূমিকা আছে। গাধার কারণে আফ্রিকান অনেক নারী কঠিন শারীরিক শ্রম থেকে রেহাই পেয়েছে। অনেক আফ্রিকান গ্রামে এ প্রাণী অপরিহার্য। কিন্তু চীনে চাহিদা আকাশছোঁয়া হওয়ায় আফ্রিকা থেকে বিপুল সংখ্যায় রপ্তানি হচ্ছে। যার ফলাফল ভোগ করতে হতে পারে আফ্রিকান নারী ও দরিদ্রদের। এ সংকট মাথায় রেখে নাইজেরিয়া সরকার ২০১৯ সালে গাধা রপ্তানি নিষিদ্ধ করে। তবে জবাইয়ে অনুমতি ছিল। আর এর সুযোগ নেয় রপ্তানিকারকরা। প্রতিবেশী নাইজার থেকে গাধা আনা হয় নাইজেরিয়ার উত্তরে। সেখানকার বাজারে সেগুলো বিক্রি হয়। এরপর ট্রাকে করে দক্ষিণ নাইজেরিয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে তাদের জবাইয়ের পর চামড়া চীনে রপ্তানি করা হয়। তবে আফ্রিকান ইউনিয়ন পরে গাধা রপ্তানি নিষিদ্ধ করে।

রয়টার্স জানায়, গাধা রক্ষায় আফ্রিকার এ পদক্ষেপকে মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করে প্রাণী রক্ষায় যুক্ত সংগঠন এবং পরিবেশবাদীরা। তবে তারা এও বলেন, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জিং হবে এবং অবৈধ ব্যবসা করার ঝুঁকি রয়েছে। আফ্রিকান ইউনিয়ন নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগেও বতসোয়ানা, বুরকিনা ফাসো এবং উগান্ডা গাধার চামড়া রপ্তানি নিষিদ্ধ করে। তবে এসব নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও গাধা পাচার এবং বেআইনি জবাই রয়ে গেছে।

দ্বন্দ্ব

আফ্রিকার এ নিষেধাজ্ঞাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছেন মাইকেল স্যুমান। দ্য আটলান্টিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিনি বলতে চেয়েছেন, চীন দক্ষিণ আফ্রিকার দেশগুলোকে এমনিতে ঋণের জালে জড়িয়ে ফেলেছে। তাদের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধে আফ্রিকার অনেক দরিদ্র দেশ হিমশিম খাচ্ছে। তবে চীন কোনো বাড়তি সুবিধা দিতে রাজি হচ্ছে না। আফ্রিকায় পশ্চিমাদের সরিয়ে চীনের নেতা হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এ ধরনের আচরণ বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। এ বিষয়ে নাইরোবি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অস্কার মেওয়া ওটেলে দ্য আটলান্টিককে বলেন, আফ্রিকান দেশগুলো চায় চীন আরও অর্থবহ এবং গ্রহণযোগ্য ভূমিকা পালন করুক। কিন্তু গাধা ইস্যুটি একটি বড় সমস্যা যে, এটি গ্লোবাল সাউথের নেতা হওয়া নিয়ে চীনের যে উচ্চাকাক্সক্ষা তাকে দুর্বল করতে পারে।

স্যুমান জানাচ্ছেন, বেইজিং থেকে নতুন ঋণ দেওয়া গত পাঁচ বছরে কমে এসেছে। এক সময় চীন থেকে দক্ষিণে যে অর্থপ্রবাহ গিয়েছিল তা পাল্টে গেছে। চীনের ঋণদান কর্মসূচি নিয়ে আমেরিকান ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশন ২০২৩ সালের এক সমীক্ষায় জানিয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলো এখন নতুন করে ঋণ নেওয়ার চেয়ে আগের ঋণ পরিশোধের জন্য চীনা ব্যাংকগুলোকে বেশি অর্থ দিচ্ছে। চীন এখনো বিশ্বাস করে যে, তারা পশ্চিমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বৈশ্বিক দক্ষিণের নেতা হয়ে উঠতে পারবে। কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতি চীনের প্রকৃত নীতিগুলো সেই পুরনো ঔপনিবেশিকতার প্রতিধ্বনি করছে।

দক্ষিণ আফ্রিকাভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক, ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল ডায়ালগের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো সানুশা নাইডু বলেন, আফ্রিকান সরকারগুলোকে আরও বেশি সক্রিয় হতে হবে। আপনি চীনকে আপনার ওপর হুকুম চালিয়ে যেতে দিতে পারেন না। স্যুমার মনে করছেন, আফ্রিকান ইউনিয়ন যে গাধা রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে, সেটি ওই মহাদেশের নেতাদের চীনের প্রতি একটি বার্তা। এ নিষেধাজ্ঞার অন্তর্নিহিত বার্তা হলো যে, তারা চীনের ইচ্ছামতো সবকিছু ছেড়ে দিতে চায় না। যদি আফ্রিকান ইউনিয়ন চীনের কাছে গাধার চামড়ার বাণিজ্য বন্ধ করতে সফল হয়, বেইজিংয়ের প্রভাব ক্ষুন্ন হবে। ইজিয়াও শিল্প ইতিমধ্যেই চীন-আফ্রিকা সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

তবে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের এসব উদ্বেগ চীনের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির ফালফাল কি না, তা এখনই বুঝে ওঠা সম্ভব নয়। কারণ বিশ্বে গরুসহ অন্যান্য প্রাণীর মাংস খাওয়ায় এগিয়ে রয়েছে পশ্চিমারা। যে কারণে পরিবেেেশর অনেক ক্ষতি হয়। জলবায়ু বিপর্যয়ের পেছনেও রয়েছে এই ভোগবাদ। গরু পালনের জন্য মাইলের পর মাইল বন উজাড় হয় বলে উদ্বেগ জানিয়ে আসছেন পরিবেশবাদীরা। সে প্রেক্ষাপট বিবেচনায়, গাধা জবাইয়ের এ চৈনিক প্রবণতায় ক্ষতি কম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত