ঘর থেকে বের হলেই যেন মরুভূমির লু হাওয়া। প্রচণ্ড গরমের সঙ্গে আর্দ্রতা জ্বালা ধরাচ্ছে শরীরে। দরদর করে ঝরছে ঘাম। এই সময়ে মাঝেমধ্যে কালবৈশাখী ও বৃষ্টি কিছুটা স্বস্তি আনে; কিন্তু এবার তা-ও নেই। গত কয়েক বছর ধরেই এপ্রিল মাস ভয়ংকর হয়ে উঠছে। এপ্রিলের উষ্ণতা দ্রুত বেড়ে বিপজ্জনক পর্যায়ে চলে গেছে। এপ্রিল মাস জুড়েই দেশের অর্ধেকের বেশি এলাকায় তাপপ্রবাহ বইছে। অন্য বছরে এই সময়ে কয়েক দিন পরপর একাধিক কালবৈশাখী, ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি হয়। এতে তাপমাত্রা কিছুটা হলেও কমে। এবার বৃষ্টি ও বাতাস নেই বললেই চলে। সপ্তাহখানেক ধরে দেশের ৭০ শতাংশ এলাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছে। কোনো কোনো জেলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি ছিল । তীব্র গরমের সঙ্গে মানুষের শরীর খাপ খাওয়াতে পারছে না। বিভিন্ন রোগবালাই বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে। উচ্চ তাপমাত্রার কারণে শহরে পানি ও বিদ্যুতের সংকট তৈরি করছে। এ ছাড়া ফসলের উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া এবং খরা পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। মানুষের মেজাজ খিটখিটে হওয়া এবং সামাজিক অশান্তি তৈরির ক্ষেত্রেও ওই অতি উষ্ণতা ভূমিকা রাখছে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার বাতাসে পাঁচ ধরনের গ্যাসের স্তর তৈরি হয়েছে। ময়লার ভাগাড়, ইটভাটা, যানবাহন ও শিল্পকারখানার ধোঁয়া থেকে এসব গ্যাস তৈরি হচ্ছে, যা বাতাস ও মাটিকে আরও উষ্ণ করে তুলছে। তাপপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত হওয়া এসব ক্ষতিকর গ্যাসের কারণে রাজধানীর আবহাওয়া অসহনীয় হয়ে উঠেছে। গবেষকদের মতে, গ্রীষ্মকালে ঢাকায় ‘তাপীয় দ্বীপ’ বা ‘হিট আইল্যান্ড’ তৈরি হয়। মূলত গাছপালা ও জলাভূমি কমে যাওয়া এবং বায়ুপ্রবাহের জায়গা না রেখে ভবন নির্মাণের কারণে শহরে দিনের তাপ জমা হয়। এই পরিস্থিতিকে ‘তাপীয় দ্বীপ’ বলা হয়। এর সঙ্গে যুক্ত দিনের তাপপ্রবাহ, যা ঢাকার বাতাসকে আশপাশের জেলার চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের চেয়ে বেশি উত্তপ্ত রাখছে। প্রশ্ন হলো, আবহাওয়া দিনকে দিন কেন এমন বিরূপ হয়ে উঠছে? এটা কি কেবল বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণেই হচ্ছে? এ ব্যাপারে কি সরকারের কোনো দায় নেই?
দেশের এই বিরূপ আবহাওয়ার প্রথম ও প্রধান দায় অবশ্যই সরকারের। সরকারের কোনো কাজে কোনো ধরনের সুচিন্তিত পরিকল্পনা নেই। অবকাঠামো নির্মাণসহ নানাবিধ উন্নয়নের নামে এখানে নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলা হয়। অথচ রাজধানী শহরসহ সারা দেশে যে তীব্র থেকে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। ছায়া দেওয়ার মাধ্যমে তা থেকে সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এই গাছ। গাছের পাশাপাশি জলাধারও গরমের কষ্ট লাঘবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু ঢাকা শহরে প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত গাছ ও জলাশয় না থাকায় মানুষের কষ্ট এখন চরমে। জলাশয় ও গাছরক্ষায় সরকারের কোনো কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগ চোখে পড়ে না। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে প্রতিদিন ধ্বংস হচ্ছে গাছপালা-সবুজ আচ্ছাদন, ভরাট হচ্ছে জলাশয় এবং নষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। নগরে বসবাসকারীরা নানামুখী ঝুঁকিসহ মারাত্মক বায়ু ও পানিদূষণের ফলে বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বিশৃঙ্খল নগর উন্নয়ন, বেকারত্ব, পরিবেশের অবনতি, মৌলিক সেবাপ্রাপ্তির অভাব, কিশোর গ্যাং-ছিনতাই-রাহাজানি-হত্যা-আত্মহত্যাসহ ভয়ংকর অপরাধ এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধিসহ নানাবিধ সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশ উন্নয়নের পথে অগ্রসর হচ্ছে। কিন্তু উন্নয়নের ধারাটি কতটা পরিকল্পিত, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে। নদীনালা খালবিল ভরাট করে সেখানে ভবন তোলা হচ্ছে, ফসলি জমির মধ্য দিয়ে রাস্তাঘাট বানানো হচ্ছে। প্রাকৃতিক জলাধার নষ্ট হচ্ছে। বিভিন্ন শিল্প-বর্জ্য ও ময়লা আবর্জনা নদীতে ফেলা হচ্ছে। এর ভয়াল প্রতিক্রিয়া মাঝে মাঝে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জেলা, উপজেলা পর্যায়েও পুকুর বা জলাধার ভরাট করে পরিকল্পনাহীন ভবন উঠছে। অথচ কোথাও সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। শহরের সুবিধাগুলোকে শহরের বাইরে ছড়িয়ে দিয়ে, কর্মসংস্থানের সুযোগ গ্রাম পর্যায়ে বৃদ্ধি করে এবং গ্রামীণ অবকাঠামোসহ বসবাসের ক্ষেত্রে সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে অনেকেই শহরমুখী হতো না। ব্যথা নিরাময়ের জন্য রোগ সম্পর্কে গভীর অনুসন্ধান করে তার চিকিৎসা প্রয়োজন। ব্যাধি জটিল হলে তার চিকিৎসা পদ্ধতিও সুদূরপ্রসারী এবং সুচিন্তিত হওয়া প্রয়োজন। সরকার যে পথে পরিবেশগত বিপদ ঠেকাতে হাঁটছে, তা অনেকটা ‘পেইনকিলার’-এর মতো। সাময়িক উপশম হয়তো হবে, কিন্তু দুর্যোগ বারবার হবেই। সেই দুর্যোগে ব্যথা যাতে কম হয় তার দিশা কোথায়?
সরকারের চোখের সামনে দিনের পর দিন পরিবেশ ধ্বংসের সব আয়োজন অবাধে চলছে। প্লাস্টিকের যথেচ্ছ ব্যবহার, কীটনাশক ও কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য নদী-খাল-সমুদ্রের জলে মিশে যাওয়া, উপকারী ব্যাক্টেরিয়া যা মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে মানুষ ও অন্যান্য জীবের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। বেড়ে যাচ্ছে নানা মারণ রোগের প্রকোপ। আর বায়ুদূষণ অত্যন্ত ভয়াবহ আকার নিতে চলেছে। সারা বছরই ছোট-বড় অজস্র ভবন নির্মাণ এবং রাস্তা মেরামতের কাজ চলছে। এর পাশাপাশি গত কয়েক বছরে যোগ হয়েছে মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ বিভিন্ন বড় প্রকল্প। যেকোনো ধরনের নির্মাণকাজ করার সময় বায়ুদূষণ রোধে পরিবেশ অধিদপ্তরের সুনির্দিষ্ট কিছু নির্দেশনা থাকলেও, সেসব নিয়ম পালন করতে দেখা যায় না। নিয়ম মানানোর জন্যও কেউ এগিয়ে আসে না। দেশের বেশিরভাগ ইটভাটা সনাতন পদ্ধতিতে চলছে। এইসব ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে কয়লা, কাঠ ব্যবহার করা হয়। ফলে এ থেকে প্রচুর ছাই তৈরি হয় এবং কার্বন মনোঅক্সাইড, সালফার অক্সাইড ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো দূষিত কণা বাতাসের সঙ্গে মেশে। বায়ুদূষণ হ্রাস করার লক্ষ্যে ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ (সংশোধিত ২০১৯)’ শীর্ষক আইনও গৃহীত হয়। কিন্তু সেই আইনেরও তেমন প্রয়োগ নেই।
দেশের আনাচে-কানাচে তো বটেই খোদ রাজধানীতে এখনো অবলীলায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি ঘুরে বেড়াতে পারছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ এবং ট্রাফিক পুলিশদের দায়িত্ব অবহেলার কারণে। পরিবেশকে বিষাক্ত করে লক্কড়-ঝক্কড় বাসগুলো চলছে, এ বিষয়ে কর্র্তৃপক্ষ নির্বিকার। অবহেলা সব খানেই আছে। গত ৫৩ বছরে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত হচ্ছে ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট খাত। সেখানে মিথেন গ্যাস উৎপন্ন হয়। অনেক সময় এই মিথেন গ্যাসের দুর্গন্ধ থেকে বাঁচার জন্য পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা আগুন জ্বালায়। এ কারণে বায়ুদূষণ হয়। অথচ এ বিষয়েও সরকারি কোনো দপ্তরকে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে দেখা যায় না। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সবুজ নিশ্চিহ্নকরণ, পরিবেশ ধ্বংসকারী লোভী ব্যক্তিদের আইন মানাতে বাধ্য করতে না পারা এবং প্রশাসনসহ পরিবেশ-বিষয়ক দপ্তরগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করতে না পারার কারণে আমাদের পরিবেশ ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। সরকারের নীরবতার কারণেই তা হচ্ছে। এর পরিণতি আরও ভয়াবহ হবে, যদি সরকার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ না নেয়। জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই, এই কাজ অনতিবিলম্বেই শুরু করতে হবে।
বিরূপ পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কুপ্রভাব থেকে রক্ষার চাবি নাগরিকদের হাতে নেই। নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করতে পরিকল্পিত উদ্যোগের পাশাপাশি নতুন আইন দরকার। যেসব আইন আছে তার সুষ্ঠু প্রয়োগ জরুরি। জলবায়ু বিপর্যয় থেকে নাগরিককে বাঁচাতে আইন করতে হবে, যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে । যে সরকার তা করে না- সে অকর্মণ্য, ব্যর্থ!
লেখক: কলামিস্ট ও লেখক