 ক্যাসিনোর অশনিসংকেত

চাই ডিজিটাল ব্যবস্থায় কড়া নজরদারি  

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৫ এএম

দেশে যেকোনো ধরনের জুয়াখেলা আইনে নিষিদ্ধ। এই নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের জন্য জুয়া প্রতিরোধ আইন (২০২৬) কার্যকর করা হয়েছে গত জুলাই থেকে। আইনটির প্রয়োগ শুরু হলে জুয়া ও ক্যাসিনোর বিস্তার কমার যে আশা, তা এখনো ফলেনি। দেশ রূপান্তরে শুক্রবার প্রকাশিত ‘ক্যাসিনোর অশনিসংকেত’ শীর্ষক প্রতিবেদন আনুযায়ী, বিভিন্ন স্থানে ক্লাব, ফ্ল্যাট-বাসা ও ভার্চুয়াল জগতে অবৈধ ক্যাসিনো ও জুয়ার বিস্তার ঘটেছে। ইনডোর জুয়ায় কিছুটা রাখঢাকের চর্চা থাকলেও অনলাইন জুয়ায় কোনো লুকোছাপা নেই। সামাজিক মাধ্যমে বিজ্ঞাপন হয়। টাকার লোভে যুক্ত হন অনেকে। বেকারত্বের পাশাপাশি সামাজিক পরিসরে বিনোদনের সুযোগ কম থাকা, স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সহজে পাওয়া, সচেতনার মারাত্মক ঘাটতিসহ বিভিন্ন কারণে তরুণরাসহ নানা বয়সের মানুষ জুয়ায় আসক্ত হচ্ছেন। কিছু লোক জুয়াকে বিনোদনের অংশ মনে করলেও তরুণ-তরুণীদের অনেকে, বিশেষ করে অনলাইনে জুয়ার অ্যাপে যুক্ত হওয়াকে দেখে ‘ঘরে বসে’, ‘পুঁজি ছাড়াই’, ‘লাখ টাকা’ আয়ের সুযোগ হিসেবে।

আশঙ্কার বিষয় হলো, শুরুতে অল্প টাকা লগ্নিতে লাভের আশায় নামলেও প্রায় সবার অর্থ হারানোর প্রবণতাই বেশি। অনলাইন কিংবা বাস্তবের জুয়ায় সমাজে অনেকেই নিঃস্ব হয়েছেন। 

ব্যক্তির লোকসানের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের বড় ক্ষতির দিক হলো জুয়ার পৃষ্ঠপোষক, আয়োজক ও সহযোগীরা দেশ থেকে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা পাচার করেন। স্থানীয় এজেন্ট ও মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিসের দ্বারা সংগৃহীত টাকা সুপার এজেন্টদের এমএফএস অ্যাকাউন্ট হয়ে ডিজিটাল হুন্ডি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত বিদেশে জুয়ার মূল চক্র ও ক্যাসিনো মালিকদের ওয়ালেটে চলে যায়; যা ট্র্যাক করা অত্যন্ত কঠিন।      

আমাদের আশঙ্কা বাস্তবের জুয়া হোক কিংবা অনলাইন ক্যাসিনোর ফাঁদ, এ থেকে মানুষকে মুক্ত করতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হওয়ার ঝুঁকি আছে।

আশঙ্কার আরেকটি দিক হলো মাঝেমধ্যে রাজনৈতিক বিবেচনায় ক্ষতিকর সাইট, পেজ ও অ্যাকাউন্ট এবং অ্যাডাল্ট সাইট বন্ধের তৎপরতা দেখা গেলেও অনলাইন জুয়ার সাইট বন্ধের উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায় না।    

জুয়া প্রতিরোধ আইনে (২০২৬) স্থানীয় জুয়ার পাশাপাশি অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস  বেটিংসহ বিভিন্ন ধরনের বেটিং, ম্যাচ ফিক্সিং, স্পট ফিক্সিং, এগুলোর আয়োজন, ব্যবস্থাপনা ও প্রচারণার মতো ডিজিটাল অপরাধে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকা এবং আর্থিক লেনদেন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য এবং আপস অযোগ্য এসব অপরাধে জড়িত থাকলে ২ বছর থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড, ২ লাখ টাকা থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং সম্পদ-সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার বিধান রয়েছে। এই আইনের আওতায় কিছু মামলা হচ্ছে; প্রচলিত বিচারিক প্রক্রিয়ায় মামলাগুলো হয়তো এগোবে।

অনলাইন জুয়ায় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহার এবং ডিজিটাল ব্যবস্থায় টাকা লেনদেনের সুযোগ। তাই মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে স্বনামে ও বেনামে টাকা ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে কড়া নজরদারি, জুয়ায় ব্যবহৃত সাইট, অ্যাপ, ডোমেইন, ভিপিএন ও ডিজিটাল ওয়ালেট তাৎক্ষণিকভাবে অকার্যকর করা প্রয়োজন।

দেশের সামাজিক বাস্তবতায় ক্যাসিনো ও অনলাইনের জুয়ায় জড়িত অনেকেই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় থাকতে নিরাপদ বোধ করেন। তাদের চিহ্নিত করে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া বন্ধ করতে হবে।

ক্যাসিনো ও অনলাইন জুয়ায় আসক্ত মানুষগুলোর বড় অংশ উৎপাদনক্ষম যুবশক্তির অংশ। তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাও গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে, জুয়ায় আসক্তি দূর করতে পরিবার, বন্ধু, আত্মীয়-স্বজনেরও দায়িত্ব নেওয়া প্রয়োজন। সন্তান অনলাইনে কী করে এবং তার আর্থিক লেনদেনের ওপর নজর রাখা জরুরি। কেউ আসক্ত হয়ে গেলে তার পুনর্বাসনের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া দরকার। সামাজিক সংগঠনগুলো এবং প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জুয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক সচেতনতা তৈরির জন্য সারা বছর বিভিন্ন কার্যক্রম নেওয়া প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, আমরা মনে করি, দেশে ক্যাসিনো ও অনলাইন জুয়া বন্ধ করতে হলে কঠোর আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগসহ উন্নত প্রযুক্তিগত নজরদারি, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আর্থিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণ, পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতার একটি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত