নাইজেরিয়ায় সাইবার আইনে ঝুঁকিতেই সাংবাদিকরা

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:০০ এএম

নাইজেরিয়ায় সম্প্রতি সাইবার অপরাধ আইনের সংশোধন ও সংস্কার একটি উন্নতি বটে, কিন্তু এর ধারাসমূহ এমন রাখা হয়েছে, যা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ব্যবহার করা যাবে। পরিস্থিতি বুঝতে সাংবাদিক সেন্ট মিয়েনপামো অনিটসার সঙ্গে আচরণের কথাই স্মরণ করা যাক। সাংবাদিক সেন্ট মিয়েনপামো অনিটসার প্রতি দেশটির কর্মকর্তাদের আচরণে মনে হতে পারে যে, এই সাংবাদিক একজন ভয়ংকর অপরাধী ও সহিংস ব্যক্তি। সশস্ত্র অবস্থায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তাকে গ্রেপ্তার করে। তিনি তখন তার এক বন্ধুর বাসায় অবস্থান করছিলেন। গ্রেপ্তার করে তাকে প্রথমে নাইজেরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য বায়েলসার একটি থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরবর্তী সময় নাইজেরিয়ার রাজধানী আবুজায় তাকে উড়িয়ে আনা হয়। 

এক সপ্তাহ পর অনিটসার বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের সাইবার অপরাধ আইনে অভিযোগ গঠন করা হয় এবং কারাগারে অন্তরীণ রাখা হয়। আর এ সবকিছুরই সূত্রপাত নাইজেরিয়ার তেলসমৃদ্ধ নাইজার ডেল্টা অঞ্চলের একটি ঘটনার ওপর তার প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে। ঘটনাটা ছিল ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসের। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুর দিকে তিনি জামিনে মুক্ত হন এবং জুন মাসের ৪ তারিখে কোর্টে হাজিরার তারিখ নির্ধারিত আছে। সাইবার অপরাধ আইন নাইজেরিয়ায় সাংবাদিকদের কাছে পরিচিত তবে তা দুঃখজনকভাবে। এই আইনটি প্রণয়নের পর থেকেই এ নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়। আইন প্রণয়নের পর থেকে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ২৫ জন সাংবাদিককে এই আইনের মোকাবিলা করতে হয়েছ। এর মধ্যে চারজন ছিলেন যাদের এ বছরের শুরুতে গ্রেপ্তার করা হয়। অনিটসার একজন আইনজীবী আনন্দে তেরুনগওয়া এই আইনকে ‘সাংবাদিকদের খুঁজতে’ অপব্যবহার করা একটি আইনি টুল হিসেবে বর্ণনা করছিলেন। 

বেশ কয়েক বছর ধরেই মিডিয়া, বিভিন্ন মানবাধিকার গ্রুপগুলো বিধিনিষেধ আরোপ, ভয় দেখানো ও অপব্যবহার বন্ধে এই আইনের সংশোধনের দাবি করে আসছিলেন। অবশেষে গত বছরের নভেম্বরে নাইজেরিয়ার সিনেট আইনের সংশোধন প্রস্তাব করে এবং গণশুনানির আয়োজন করে। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে), অন্যান্য সুশীল সমাজ ও সাংবাদিক সমিতিগুলো আইনের সংস্কার সুপারিশমালা আকারে জমা দেয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নাইজেরিয়ান প্রেসিডেন্ট বোলা টিনুবু সংশোধিত আইনে স্বাক্ষর করেন। নাইজেরিয়ার প্রতিনিধি পরিষদের একজন সহকারী সংশোধিত আইনের একটি কপি আমাকে সরবরাহ করেছেন। এই আইনে অনলাইনে মতপ্রকাশের মতো বিষয়কে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা ধারাগুলো রেখে দেওয়া হয়েছে।

তবে সংশোধনীগুলো এখনো গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন এই আইনের মাধ্যমে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রশ্নে কিছুটা উন্নতি হবে, কিন্তু এরপরও এর বিভিন্ন ধারাসমূহ সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার ও নজরদারির ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। ‘এই আইন আগেরটার থেকে ভালো, কিন্তু এটা কোনোভাবেই প্রত্যাশামাফিক হয়নি,’ আমার সঙ্গে টেলিফোন সাক্ষাৎকারে এমনটাই বলেছেন নাইজেরিয়ার ডিজিটাল অধিকারবিষয়ক সংগঠন প্যারাডাইম ইনিশিয়েটিভের ঊর্ধ্বতন কর্মসূচি কর্মকর্তা খাদিজা ইল-ইউসমান। সংশোধিত আইনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এরপরও এমন বিধান থাকবে বিশেষ করে ক্ষমতাসীনরা যার সুযোগ নিতে পারে।’

ধারা ২৪ এই আইনের প্রাথমিক একটি উৎকণ্ঠার বিষয় ছিল, যেখানে ‘সাইবার অনাচার’ সম্পর্কিত অপরাধ বর্ণনা করা হয়েছে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনে এই ধারাটি বারবার ব্যবহার করা হয়েছে। এটি ছিল অনেকগুলো ধারার মধ্যে একটি, যা সংশোধন করা হয়েছে। আগের আইন অনুযায়ী, ধারা ২৪ অনুযায়ী কম্পিউটার ব্যবহার করে বার্তা আদান-প্রদানকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, ‘যা সম্পূর্ণভাবে আক্রমণাত্মক, পর্নোগ্রাফিক বা অমার্জিত, অশ্লীল, হুমকি সম্পর্কিত।’  এই অপরাধগুলোর জন্য তিন বছর পর্যন্ত জেল ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছিল। একই ধরনের শাস্তির বিধান ছিল ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্যের জন্য, ‘যা উদ্দেশ্যমূলকভাবে কারও বিরক্তির উদ্রেক করে’, অথবা ‘অপ্রয়োজনীয় দুশ্চিন্তা’ সৃষ্টি করে। বাস্তবে দেখা যায় অনলাইন মাধ্যমে প্রকাশিত কোনো একটি সংবাদের সুবিধাজনক ব্যাখ্যা প্রদানের মাধ্যমে সাংবাদিকদের জেলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। সংশোধিত আইনেও একই ধরনের জেল-জরিমানার কথা বলা হয়েছে। সংশোধিত আইনে কম্পিউটারের মাধ্যমে তথ্য প্রদান যা পর্নোগ্রাফিক বা মিথ্যা তথ্য, ‘উদ্দেশ্যমূলকভাবে আইন ও শৃঙ্খলার অবনতি, জীবনের প্রতি হুমকি, বা একই ধরনের বার্তা পাঠানো’ এই বিষয়গুলোকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভাষার ক্ষেত্রে কিছুটা সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে, যা সাধুবাদযোগ্য, তবে এখনো অপব্যবহার করার সুযোগ আছে।

সংশোধিত অংশ পর্যালোচনার পর লাগোসের একজন ডিজিটাল অধিকারবিষয়ক আইনজীবী সলোমন ওকোিরা বলেছেন, ‘শব্দ বিন্যাসের ক্ষেত্রে এটি আরও সুনির্দিষ্ট হতে পারত।’ তিনি বলেন, এটাও একটা উন্নতি। কারণ অভিযোগ গঠনে প্রমাণ সংগ্রহ করা এখন কিছুটা কষ্টকর। তারপর এখনো কোনো একটা প্রতিবেদন ‘আইন ও শৃঙ্খলার অবনতি’ করেছে এই মর্মে অভিযোগ উত্থাপন করে গ্রেপ্তার করার সুযোগ কর্র্তৃপক্ষের জন্য রাখা আছে। এখন দেখার বিষয়, সংশোধনীগুলো কীভাবে সাংবাদিক ও অন্যদের বিরুদ্ধে আগে দায়ের করা অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্টভাবে কতটুকু কার্যকর হয়। ডানজারিয়া ব্যাখ্যা করেন, ‘সংশোধিত আইন এখন আইনজীবীদের ব্যবহার করার জন্য।’ তিনি বলেন, ‘আপনি একজনের বিচার প্রক্রিয়ার জন্য একটি পুরনো আইন ব্যবহার করতে পারেন না..., যদি (মামলাটি) চলমান থাকে, নতুন আইন আগেরটার জায়গা নিয়ে নেয়।’ অনিটসার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি উল্লেখ করে তেরুনগোয়া বলেন, তিনি কোর্টে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আইনের সংশোধনীগুলো অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করবেন। সিপিজে তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ বাতিলে কর্র্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে।  

সাম্প্রতিক সংশোধনীর পর আইনে আরেকটা আশঙ্কার বিষয় তৈরি হয়েছে। সেটি হচ্ছে এর মাধ্যমে নজরদারির ও হয়রানি স্বীকৃতি পেতে পারে। নাইজেরিয়ার সাইবার অপরাধ আইনের ৩৮ ধারায় ‘প্রবহমান তথ্য’ এবং ‘গ্রাহকদের তথ্য’ নজরদারির পূর্বশর্ত হিসেবে আদালতের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুমতি গ্রহণের বিষয়গুলো নিশ্চিতকরণে ব্যর্থ হয়েছে। এ ধরনের দেখভালের দুর্বলতা বিশেষ আশঙ্কার বিষয় যেখানে নাইজেরিয়ার পুলিশ সাংবাদিকদের কল অনুসরণ এবং তা ব্যবহার করে গ্রেপ্তার করছে। ‘আমি ভবিষ্যতে এমনি একটি সাইবার অপরাধ আইন চাই, যা মানবাধিকারকে সম্মান করে’ উল্লেখ করে ইল-ইউসমান বলেন, হয়রানির বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয় এমন আইনের প্রয়োজন, শুধু নাইজেরিয়ায় নয়, এই অঞ্চল জুড়ে। মালি থেকে বেনিন ও জিম্বাবুয়েতে যেখানে কর্র্তৃপক্ষ সাইবার অপরাধ আইনগুলো সাংবাদিকদের তাদের কাজের জন্য গ্রেপ্তার করতে ব্যবহার করেছে। এ ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের গোপনীয়তাও ব্যাপকভাবে হুমকির সম্মুখীন। নাইজেরিয়ার আইন প্রণেতারা প্রমাণ করেছেন যে, তারা সংবাদপত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উন্নতিকল্পে ভূমিকা রাখতে পারেন, তারপরও সাংবাদিকরা ঝুঁকির মুখে আছেন। এই আইন প্রণেতাদের আরও সংস্কারের সুযোগ আছে, যা স্থানীয় পর্যায়ে সাংবাদিকতাকে সুরক্ষা দেবে এবং নিজেদের সীমানার বাইরে অধিকারকে সম্মান দেখানোর বার্তা পৌঁছে দেবে। তারা সেই সুযোগ নেবে কি?

আল-জাজিরায় প্রকাশিত নিবন্ধ অনুবাদ করেছেন উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট নাজমুল আহসান।

লেখক: কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট আফ্রিকা কর্মসূচির ঊর্ধ্বতন গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত