বাংলাদেশে মৃত্যু নিবন্ধনের হার মাত্র ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি দুইটি মৃত্যুর একটি রাষ্ট্রের খাতায় ওঠে না। এই পরিসংখ্যান একটি ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকটের সূচক। রাষ্ট্র কার্যত অর্ধেক মৃত্যুর কারণ, স্থান ও প্রবণতা সম্পর্কে অবহিত নয়। অতি গুরুত্বপূর্ণ এসব তথ্য না জানা থাকলে রাষ্ট্রের পক্ষে মানুষের জীবন রক্ষায় কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা অসম্ভব।
কার্যকর জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা হতে হবে তথ্যনির্ভর। কোন এলাকায় মাতৃমৃত্যু বেশি, কোন রোগে মানুষ বেশি মারা যাচ্ছে, কোন হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যর্থ হচ্ছে, কিংবা কোন সংক্রামক রোগ নতুন করে ছড়িয়ে পড়ছে-এই প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর পাওয়া সম্ভব মৃত্যু নিবন্ধন থেকে। মৃত্যু নিবন্ধন তাই শুধু একটি কাগজের সনদ নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের একটি শক্তিশালী ও অপরিহার্য হাতিয়ার। এসব তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হয় হাসপাতালের সক্ষমতা, ওষুধের সরবরাহ, স্বাস্থ্য বাজেটের অগ্রাধিকার এবং জরুরি পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া।
কোভিড-১৯ মহামারি এই বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে। সংক্রমণের সংখ্যা নিয়ে আলোচনা হলেও, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে ছিল অনিশ্চয়তা ও বিতর্ক। অনেক মৃত্যু কখনো নিবন্ধিতই হয়নি, আবার অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ সঠিকভাবে নথিভুক্ত করা যায়নি। ফলে মহামারির প্রকৃত অভিঘাত বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের দেখিয়েছে শক্তিশালী মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থা ছাড়া মহামারি মোকাবিলা কার্যত অসম্ভব। এ সমস্যা শুধু সংক্রামক রোগে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসারসহ অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর হার বাড়ছে। কিন্তু মৃত্যুর কারণ সর্ম্পকে নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকলে, আমরা জানবো না ঠিক কোন রোগ কতটা প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, কোন বয়সে ঝুঁকি বেশি, কিংবা কোন অঞ্চলে স্বাস্থ্য হস্তক্ষেপ জরুরি।
এক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণ হবে অনুমান ও খণ্ডিত তথ্যের ওপর, বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ওপর নয়। যেমন, বর্তমানে দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ ঘটে বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে, যার ১৯ শতাংশই অকাল মৃত্যু। অথচ স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ৪.২ শতাংশ ব্যয় হয় অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। যথাযথ তথ্য-উপাত্ত ও আন্ত:মন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাবই এধরনের অপরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণের অন্যতম প্রধান কারণ।
বর্তমান জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইনে মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব মূলত পরিবার কেন্দ্রিক এবং অনেকাংশেই ঐচ্ছিক। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে মৃত্যু নিবন্ধন বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত নয়। ফলে হাসপাতালে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৃত্যু ঘটলে, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য অনেক সময় রাষ্ট্রের ডাটাবেজে পৌঁছায় না। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ভিন্ন পথ দেখায়।
এশিয়া–প্যাসিফিক অঞ্চলের অনেক দেশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রভিত্তিক বাধ্যতামূলক মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করে জনস্বাস্থ্য নজরদারি শক্তিশালী করেছে। এর মাধ্যমে তারা রোগের প্রবণতা দ্রুত শনাক্ত করতে পেরেছে, স্বাস্থ্য বাজেট যথাযথভাবে বণ্টন করেছে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ও লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে তথ্যভিত্তিক ও অধিক কার্যকর করতে হলে মৃত্যু নিবন্ধনকে আর অবহেলার তালিকায় রাখা যাবে না। মৃত্যু নিবন্ধনকে একটি জীবনরক্ষাকারী জনস্বাস্থ্য উপকরণ হিসেবে দেখতে হবে। আইনি সংস্কারের মাধ্যমে সকল হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে মৃত্যু নিবন্ধনের দায়িত্ব দিতে হবে এবং মৃত্যু নিবন্ধন তথ্য ব্যবহার করে নিয়মিত ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস তৈরির বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে হবে। পাশাপাশি জনসাধারণের মধ্যে মৃত্যু নিবন্ধন নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা, রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি সহজীকরণ, উন্নত প্রযুক্তিগত কাঠামো এবং মাঠপর্যায়ে দক্ষ কর্মী নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জীবন রক্ষা শুধু চিকিৎসা দিয়ে হয় না; সঠিক তথ্যও দরকার হয়। মৃত্যু নিবন্ধন তাই জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। প্রতিটি মৃত্যু যদি গণনায় আসে, ভবিষ্যতে অনেক মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।
