সামাজিক মাধ্যম বর্তমানে এক উত্তপ্ত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বাংলাভাষীদের কাছে ফেসবুক মানেই হয়ে পড়েছে পরস্পরের মতামত চাপিয়ে দেয়ার রণাঙ্গন। আর এতে জ্বালানির যোগান দিচ্ছে সংবাদমাধ্যেম। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চলছে একের পর এক চাপানউতোর।
এর সর্বশেষ উদাহরণ, ঢাকার ঘরোয়া ক্রিকেট লীগে এক নারী আম্পায়ারের উপস্থিতি এবং এই সংক্রান্ত খবর। গত বৃহস্পতিবার প্রিমিয়ার ডিভিশন লীগের সুপারলীগের এক গুরুত্বপূর্ণ খেলায় মুখোমুখি হয় মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ও প্রাইম ব্যাংক ক্রিকেট ক্লাব। এতে অভিষেক হয় আম্পায়ার সাথিরা জাকির জেসির। বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে খেলা জেসি, আইসিসির ডেভেলপমেন্ট প্যানেলের আম্পায়ার। আজ, রবিবার তিনি বাংলাদেশ বনাম ভারতীয় নারী দলের টি-টুয়েন্টি খেলাতেও আম্পায়ারিং করছেন।
তবে, জেসির লীগে অভিষেকের দুইদিন পর শনিবার হুট করেই ফেসবুকে চাঞ্চল্য দেখা যায়। কিছু কিছু সংবাদমাধ্যম প্রকাশ করে যে, নারী আম্পায়ার থাকায় নাকি খেলোয়াড়রা খেলতে আপত্তি জানিয়েছিলেন। এমনকি কোন কোন সংবাদমাধ্যেম সেদিনের খেলায় থাকা বড় তারকা মুশফিকুর রহিম, মাহমুদুল্লাহদের দিকে ইঙ্গিত করে।
ফেসবুকের প্রেক্ষাপটে এই আলাপটা একেবারে গরম প্যাটিসের মতো। মুহূর্তেই রেগে কাই হয়ে গেলেন বহু মানুষ। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের অক্ষমতা, ধর্মান্ধতা তুলে ধরে রীতিমত নারীবিদ্বেষী বানিয়ে ধুয়ে দেয়া হলো। এমনকি কিছু বিশিষ্ট মানুষ শালীনতার সীমাও ছাড়িয়ে গেলেন।
সত্যিই কি খেলোয়াড়রা নারী আম্পায়ার বিরোধী ছিলেন? এইসব খেলোয়াড়রা তো আইসিসির কোড অফ কন্ডাক্ট জানেন, লিঙ্গ, জাতি, ধর্মের ভেদ যে স্পোর্টসে করা যায় না এই ব্যাপারে তাদের শিক্ষা আছে। তবে? এই ঘটনা তলিয়ে দেখলে পাওয়া যাবে সমাজে বিদ্যমান বহুবিধ সমস্যা।
কি হয়েছিলো সেদিন?
দুই দলের ম্যানেজারের আলাপে জানা যায়, উভয় দলের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তারাই জেসিকে আম্পায়ার হিসেবে দেখে বিস্মিত হন, এবং এই বিস্ময়ের কারণ এইরকম ম্যাচে একজন অনভিজ্ঞ আম্পায়ারকে দায়িত্ব দেয়ায়। এবং যেই বিষয়টা জরুরি তা হচ্ছে, নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলেও কেউ এ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করেননি।
খেলার সময় প্রাইমের মুশফিকুরের একটা আউট নিয়ে গণ্ডগোল হয়ে। সীমানা দড়িতে আবু হায়দার রনি ক্যাচ ধরলেও প্রাইম দাবী করে তিনি ক্যাচ ধরার সময় পা ছুয়েছিলেন। এর প্রেক্ষিতে তারা মোবাইলে করা ভিডিও দেখিয়ে আউট বাতিলের দাবী করতে থাকে।
কিন্তু, মাঠে ভিডিও আম্পায়ার না থাকায় মাঠের আম্পায়ারকে ফিল্ডারের মুখের কথার উপর বিশ্বাস করা ছাড়া উপায় থাকে না। এই নিয়ে বাকবিতণ্ডা চলে এবং খেলা কিছুক্ষণ বন্ধ থাকে।
কিভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এড়িয়ে অন্য ইস্যু তোলা হয় এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ এটি। দুনিয়ার অন্যতম ধনী বোর্ড হয়েও বিসিবি কেন লিষ্ট এ লেভেলের ম্যাচে ভিডিও আম্পায়ার রাখে না এই ব্যাপারটা আলোচনা হওয়া উচিত ছিল।
আমরা দেখেছি বছরের পর বছর ঢাকার মাঠে আম্পায়ারদের বাজে সিদ্ধান্ত। সম্প্রতি ফেসবুকসহ কিছু মাধ্যেমে এইরকম প্রচুর বাজে এবং রীতিমত তামাশার সিদ্ধান্ত ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ কেউ বলে থাকে, ঢাকার মাঠে বিশেষ কিছু দল সবসময় সুবিধা পায়। এর পিছনে আছে বিসিবির রাজনীতি। প্রিমিয়ার লীগের ফলাফলের উপর কোন ক্লাবের কতো সদস্য কাউন্সিলর হবে তা নির্ভর করে। দেশীয় আম্পায়ারিং যে রীতিমত চাপে থাকে তা বহুকাল ধরেই জানা বিষয়। সাকিব আল হাসানের আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে উইকেট লাথি মেরে ভেঙ্গে ফেলার দৃশ্য নিশ্চয়ই লোকে ভুলে যায়নি। ফলে গোটা ব্যাপারটা নারী আম্পায়ার ছাপিয়ে ঢাকা তথা দেশের ক্রিকেটের এক চলমান সমস্যার উদাহরণ। এই দায় অনেকটাই ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থা বিসিবির।
ফিরে আসা যাক জেসির ব্যাপারটায়। দিন দুয়েক পর কিছু মিডিয়া অর্ধসত্য নিয়ে হাজির হয়। আম্পায়ারের বিরুদ্ধে অনভিজ্ঞতা, বিসিবি এবং আম্পায়ার্স কমিটির বিরুদ্ধে চলমান অভিযোগের বদলে জেসির নারী পরিচয়কে বড় করে দেখানো হয়। সন্দেহ নাই, সেদিন জেসির বদলে কোনো পুরুষ আম্পায়ারের লীগে অভিষেক হলে একইরকম আলোচনা হতো। আর অভিযোগ করা কিংবা প্রতিবাদ করা আর নিজেদের মধ্যে আলোচনা করা তো সম্পূর্ণ ভিন্ন দুইটা ব্যাপার।
মিডিয়া কেবল যে ব্যাপারটাকে নারীবিদ্বেষে নিয়ে গেলো তাইনা, কেউ কেউ আবার তামিম, মুশফিক, মাহমুদুল্লাহকে হাইলাইট করলেন। যেহেতু এই নামগুলো বড়, এদের নাম শিরোনামে রাখলে সংবাদটা বেশি আকর্ষণীয় হবে।
পাঠককে খুব বেশী দোষ দেয়া যায় না। এতো তলিয়ে দেখার সময় পাঠকের নেই। আর বেশিরভাগ মানুষই নিজের মতামতের অনুমোদন চায়মাত্র। নিজে যেভাবে দেখে সেই তথ্য কোনমতে পেয়ে গেলে সেটাকেই সত্য ধরে অনুমোদনটা নিশ্চিত করে। এই ব্যাপারটাই কাজে লাগায় কিছু মিডিয়া।
অথচ, হওয়ার কথা ছিল উল্টোটা। জনতুষ্টির বদলে মিডিয়ার কাজ নির্মোহভাবে সত্য তুলে ধরা। কিন্তু জনতুষ্টির ফাঁদে পড়া মিডিয়ার অবস্থা হয়েছে রাখালের গল্পের মতো। সত্য বললে উল্টো লোকেভাবে ব্যাপারটা মিথ্যা। যে কোনো ব্যাপারেই যখন নিজের মতামতের সাথে মেলে না, লোকে ভাবে এই মিডিয়া সত্য আড়াল করছে বা মিথ্যা বলছে। মিডিয়ার এই ভাবমূর্তি এর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
সন্দেহ নাই বাংলাদেশের সমাজে নারীবিদ্বেষ আছে, কিন্তু এই নিয়ে উগ্র এবং ভুল সমালোচনা সমস্যাকে আরো গাঢ় করবে। বাংলাদেশের এক ক্রিকেটার নারীবিদ্বেষী মতামত দেয়ায় গত বছর ফেসবুকে বিপুল সমালোচিত হয়েছিলো। বিসিবির দায় ছিলো সেই তরুণসহ বাকি তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য এইসব বিষয়ে শিক্ষা প্রদান এবং দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। বিসিবি প্রকাশ্যে সেরকমটা করতে পারেনি বলেই প্রতীয়মান হয়।
অবশ্য, সেই আলোচিত তরুণই গতবছর নিউজিল্যান্ডে গিয়ে নারী আম্পায়ারের অধীনে খেলেছেন। খেলাধুলার এই এক দারুণ শক্তি। খেলার চেতনায় জাতি, বর্ণ, ধর্ম, লিঙ্গ বিদ্বেষ দূর করা সম্ভব। তবে, এই ব্যাপারটা হুট করে সম্ভব না। সময়ের সাথে সাথে এই শিক্ষাগুলো চলে আসে, অধিক জোরাজুরিতে হয় না।
জেসির মতো মেয়েরা আম্পায়ার হয়েছেন, সামনে বিশ্বকাপেও থাকবেন। বাংলাদেশের মেয়েরা ছেলেদের আগে এশিয়া কাপ জিতেছে, ফুটবলে আনছে গৌরব। খেলাধুলার জগতে নারীবিদ্বেষের ঝাঁজ দিনকে দিন কমছে।
কিন্ত, বৃহত্তর সমাজে? যারা ফেসবুকে নারী বিপ্লব করছেন তাদের কতোজনের সন্তানেরা, বোনেদের খেলতে পাঠানো হচ্ছে? যারা ধর্মের যুদ্ধ করছেন তারা ব্যাক্তিগত জীবনে কতোটা ধর্ম মানছেন? বাস্তবে এক ধরনের ব্যক্তিত্ব থাকলেও ফেসবুকে সকলে হাজির হচ্ছেন সাধু চেহারা নিয়ে জ্ঞানের ঝাপি আর পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের দোকান খুলে। এইসব লোক দেখানো যুদ্ধে জড়িয়ে আমরা হিতাহিত জ্ঞান হারাচ্ছি। মিডিয়া ও পাঠক উভয়ের জন্যই এর ফলাফল মারাত্মক।
