পানির অপর নাম জীবন। একজন মানুষের শরীরের এক-তৃতীয়াংশই পানি। দৈনিক একজন সুস্থ মানুষের দুই লিটারের বেশি পানি পান করার প্রয়োজন হয়। শরীরে পানির পরিমাণ কমে গেলে শরীরের সতেজতা ঠিক থাকে না। দিন দিন শরীর শুকিয়ে যায়। পবিত্র কোরআনের অনেক স্থানে পানির আলোচনা এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে আকাশ থেকে বর্ষিত পানি। জমিন থেকে উদগত পানি ও জমিনে রক্ষিত পানি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি দেখো না যে, আল্লাহ আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন। অতঃপর তা ভূমিতে ঝরনারূপে প্রবাহিত করেন এবং এর দ্বারা বিবিধ বর্ণের ফসল উৎপন্ন করেন।’ (সুরা জুমার ২১)
পানি ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারবে না। পশু-পাখি ও জীবজন্তু জীবন ধারণ করতে পারবে না। ফল-ফসল উদগত হবে না। পানির প্রয়োজনের কথা বলে শেষ করা যাবে না। পানি মানুষ পান করে। পানির দ্বারা চারণভূমি সতেজতা লাভ করে এবং সবুজ-শ্যামল হয়। এর দ্বারা জমিন অপরূপ সুন্দর রূপ ধারণ করে। দর্শকের জন্য সেই দৃশ্য কতই না সুন্দর মনোরম! মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন। এই পানি থেকে তোমরা পান করো এবং এ থেকেই উদ্ভিদ উৎপন্ন হয়, যাতে তোমরা পশু চারণ করো। এ পানি দ্বারা তোমাদের জন্য উৎপাদন করেন ফসল, জয়তুন, খেজুর, আঙুর ও সর্বপ্রকার ফল। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। (সুরা নাহল ১০-১১)
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, একদা হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করলেন, ‘তিনটি নিয়ামত এমন রয়েছে, যা সর্বসাধারণের জন্য ব্যাপক করে দেওয়া হয়েছে। তা হলো পানি, ঘাস ও বাতাস।’ (আবু দাউদ)
পানি পান করানোর অনেক ফজিলত রয়েছে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে মুসলমান কোনো বস্ত্রহীনকে বস্ত্র পরিধান করাবে, আল্লাহতায়ালা তাকে জান্নাতের সবুজ কাপড় পরিধান করাবেন। যে ব্যক্তি কোনো ক্ষুধার্ত মুসলমানকে খাবার দেবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতের ফল খাওয়াবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো পিপাসার্ত মুসলমানকে পানি পান করাবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতের উৎকৃষ্ট শরাব পান করাবেন, যার ওপর সিল লাগানো থাকবে।’
(আবু দাউদ)
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কাউকে দান করার উত্তমপন্থা হলো তাকে পানি দান করা।’ অন্য হাদিসে এসেছে, ‘তোমার বন্ধুকে হাসিমুখে বরণ করা সদকা, কাউকে তার প্রাণীর ওপর মালামাল তুলে দেওয়া সদকা এবং প্রতিবেশীর পাত্রে পানি তুলে দেওয়াও সদকা।’ (তিরমিজি)
সহিহ বোখারিতে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘এক ব্যক্তি রাস্তায় চলার পথে অত্যন্ত তৃষ্ণার্ত হলো। তারপর একটি কূপ দেখতে পেয়ে তাতে সে নেমে পড়ল এবং পানি পান করল। ওপরে উঠে এসে সে দেখতে পেল, একটা কুকুর হাঁপাচ্ছে আর পিপাসার দরুন ভিজা মাটি চেটে খাচ্ছে। লোকটি (মনে মনে) বলল, এ কুকুরটির তেমন পিপাসা পেয়েছে, যেমন আমার পিপাসা পেয়েছিল। তারপর সে কূপের মধ্যে নামল এবং নিজের মোজা পানি দ্বারা ভরে এনে কুকুরটিকে পান করাল। আল্লাহ তার এ কাজ কবুল করেন এবং তাকে ক্ষমা করে দেন। সাহাবিরা বলল, হে আল্লাহর রাসুল! পশুদের ব্যাপারেও কি আমাদের জন্য সওয়াব রয়েছে? তিনি বললেন, প্রাণীর সেবার মধ্যেও সওয়াব রয়েছে।’ আল্লাহতায়ালা মানুষের জন্য পানি সহজলভ্য করে দিয়েছেন। কারণ পানি মানুষের বেশি প্রয়োজন হয়। এজন্য পানি নিয়ামতটি অতি সহজে মিলে। সৃষ্টিজীব যদি আল্লাহতায়ালার অবাধ্যতা করে, তখন তাদের পানি থেকে বঞ্চিত করেন তিনি। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আপনি বলুন, তোমরা ভেবে দেখেছো কি, যদি পানি ভূগর্ভে তোমাদের নাগালের বাইরে চলে যায়, তখন কে তোমাদের এনে দেবে প্রবহমান পানি?’ (সুরা মুলক ৩০)
বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাওয়ার একটি বড় কারণ হলো সঠিকভাবে ধন-সম্পদের জাকাত না দেওয়া। হজরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘একবার হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের কাছে এলেন। অতঃপর বললেন, যারা নিজের ধন-সম্পদের জাকাত বন্ধ করে দেবে, তাদের জন্য আসমান থেকে বৃষ্টি বন্ধ রাখা হবে। এমনকি চতুষ্পদ জন্তু না থাকলে আদৌ বৃষ্টি হবে না।’
(ইবনে মাজাহ)
পানি এমন জিনিস যা থেকে মানুষকে নিষেধ করা খুবই অমানবিক। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, সাহাবায়ে কেরাম হজরত রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এমন কোনো বস্তু রয়েছে কি, যা থেকে মানুষকে নিষেধ করা যায় না? হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, পানি।’ (সহিহ বোখারি)
পানি অতি মূল্যবান জিনিস। এজন্য এটাকে নষ্ট করা গুনাহের কাজ। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা স্থির পানিতে পেশাব করো না, নাপাকি ফেলো না। কেননা তা তোমরা ব্যবহার করবে।’ (আবু দাউদ)
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মানুষের কষ্ট হয়, এমন তিনটি কাজ পরিহার করো। পানির উৎস, চলাচলের রাস্তা ও গাছের ছায়ায় মলত্যাগ করো না।’ (ইবনে মাজাহ)
অপচয় করা শয়তানের কাজ। এজন্য অজু-গোসলেও পানি যত কম ব্যবহার করা যায় ততই ভালো। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) একসময় হজরত সাদ (রা.)-এর কাছ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। হজরত সাদ (রা.) তখন অজু করছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘পানি অপচয় করছো কেন? সাদ (রা.) উত্তর দিলেন, অজুতেও পানি অপচয় হয়? হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, প্রবহমান নদীতেও যদি তুমি অজু করো তবুও অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করা যাবে না।’ (মুসনাদে আহমদ)
