মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বুয়েটের অচলাবস্থা কাটবে কবে?

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:৩২ পিএম

ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের প্রবেশের প্রতিবাদ ও ছাত্ররাজনীতি প্রতিরোধের দাবিতে গত ২৮ মার্চ থেকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) একাডেমিক কার্যক্রম নিয়ে চলছে অচলাবস্থা। আন্দোলনের অংশ হিসেবে সকল ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি অব্যাহত রাখেন শিক্ষার্থীরা। ঈদুল ফিতর ও পয়লা বৈশাখের ছুটির আগে ও পরে পূর্বনির্ধারিত সকল টার্ম ফাইনাল পরীক্ষাই প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থী বর্জন করেন। যার প্রেক্ষিতে, বাধ্য হয়ে একাডেমিক কাউন্সিলের এক সভায় পূর্ব নির্ধারিত বাকি সকল টার্ম ফাইনাল পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সেই অচলাবস্থা এখনো কাটেনি। দীর্ঘ সময় পরীক্ষাসহ একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকলে সেশনজটের শঙ্কাও দেখা দিয়েছে।

এদিকে ছাত্ররাজনীতির বিরুদ্ধে অনড় অবস্থানে রয়েছেন শিক্ষার্থীরা। যদিও ছাত্র রাজনীতি চালু হবে কি, হবে না; বিষয়টি এখনও হাইকোর্টে বিচারাধীন। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের বর্জন করা টার্ম ফাইনাল পরীক্ষার নতুন তারিখ নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাচ ও বিভাগের শ্রেণি-প্রতিনিধিদের সঙ্গে এ বিষয়ে কাল (মঙ্গলবার) সভা ডেকেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ড. সত্য প্রসাদ মজুমদার। এর আগে গত শনিবার পরীক্ষাগুলোর তারিখ পুনর্নির্ধারণ করে পুনরায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বুয়েটের একাডেমিক কাউন্সিল।

বুয়েটের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একাডেমিক কাউন্সিলের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পরীক্ষার বিষয়ে স্নাতক পর্যায়ের প্রতি ব্যাচের শ্রেণি-প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিজ নিজ বিভাগের বিভাগীয় প্রধানরা বিভাগের শিক্ষকদের নিয়ে আলোচনা করে পরীক্ষা শুরুর সম্ভাব্য তারিখ ঠিক করবেন এবং কর্তৃপক্ষকে জানাবেন। সব বিভাগের সব ব্যাচের পরীক্ষার পুনর্নির্ধারিত তারিখের প্রস্তাব পাওয়ার পর সব বিভাগীয় প্রধানসহ শ্রেণি-প্রতিনিধিদের সঙ্গে উপাচার্য, সহ-উপাচার্য, ডিন ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আলোচনা করে প্রস্তাব প্রণয়ন করবেন। সার্বিক পর্যালোচনা শেষে চূড়ান্ত প্রস্তাব একাডেমিক কাউন্সিলের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।

এদিকে স্নাতক পর্যায়ের জুলাই ২০২৩ টার্মের স্থগিতকৃত পরীক্ষাসমূহ এবং ৩০ মার্চ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত পরীক্ষাসমূহের তারিখ পুনরায় নির্ধারণের বিষয়ে সকল বিভাগের বিভাগীয় প্রধানসহ সকল শ্রেণি এক বিজ্ঞপ্তিতে হয়। এতে বলা হয়েছে, বিভাগসমূহ হতে প্রাপ্ত প্রস্তাবসমূহ আলোচনা করে চূড়ান্ত প্রস্তাব প্রণয়নের নিমিত্তে সকল বিভাগের বিভাগীয় প্রধানসহ সকল শ্রেণি প্রতিনিধিদের সঙ্গে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, ডিনবৃন্দ, ছাত্রকল্যাণ পরিচালক, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এবং রেজিস্ট্রার-এর এক সভা আগামী মঙ্গলবার সকাল ১১টায় উপাচার্যের সভাপতিত্বে কাউন্সিল ভবনের দ্বিতীয় তলায় অনুষ্ঠিত হবে।

পরীক্ষা কার্যক্রমে ফিরলেও মূল দাবি থেকে সরছেন না শিক্ষার্থীরা। যেকোনও ধরনের ছাত্ররাজনীতির বিরুদ্ধে তাদের অনড় অবস্থাম রয়েছে। তাদের দাবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৭ শতাংশ শিক্ষার্থী ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বলছেন, হাইকোর্টের রায়ের বিষয়টি আইনিভাবে মোকাবিলার জন্য আইনজীবী নিয়োগের বিষয়ে বুয়েট কর্তৃপক্ষ তাদের কাছে নাম চেয়েছেন। অনানুষ্ঠানিকভাবে অনেক দিন ধরে এটি নিয়ে আলোচনা চলছে। এ ছাড়া ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে বুয়েট কর্তৃপক্ষের জারি করা ‘জরুরি বিজ্ঞপ্তির’ কার্যক্রমে হাইকোর্ট যে স্থগিতাদেশ দিয়েছেন, তারা কপি পাওয়া সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বুয়েটের একাডেমিক কাউন্সিলে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বুয়েটের এক শিক্ষার্থী বলেন, ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির বিরুদ্ধে আমাদের যে দাবি ছিল আমরা সেটিতেই অনড় রয়েছি। আমরা এই ইস্যুতে প্রায় সকল শিক্ষার্থীই ঐক্যবদ্ধ। যত যাই হয়ে যাক না কেন, আমরা আমাদের এই প্রাণের ক্যাম্পাসকে আবার আবরার ফাহাদদের মৃত্যুপুরীতে পরিণত করতে দিতে পারি না।

আরেক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের দাবিগুলো আগামীকাল মিটিংয়ে শ্রেণি প্রতিনিধিরা উপস্থাপন করবেন এবং আলোচনা হবে। বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সবাই মিলে  নেগোসিয়েশন করা হবে। আমরা পরীক্ষায় বসব কিনা সেটা আলোচনার পর বোঝা যাবে।

এদিকে সামাজিক অবমাননা ও কালচারাল র‍্যাগিংয়ের প্রেক্ষিতে পাঠানো অভিযোগের তদন্ত, নিয়মতান্ত্রিক ছাত্ররাজনীতি চালু এবং ক্যাম্পাসে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে মানববন্ধন করেছে নিয়মতান্ত্রিক ছাত্ররাজনীতি প্রত্যাশী কয়েকজন শিক্ষার্থী। সোমবার বুয়েট শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে শিক্ষার্থীরা জানান, ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সময় একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দ্বারা আমরা প্রায়ই অনলাইন ও সরাসরিভাবে হেনস্তা ও অপমানের শিকার হচ্ছি। বুয়েট ক্যাম্পাসে হিজবুত তাহরিরের মতো মৌলবাদী সংগঠন যে সক্রিয় তার সত্যতা বুয়েটের সিসিটিভি ফুটেজ দেয়। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বিষয়টি তদন্ত করে পরিচয় বের করে ক্যাম্পাস থেকে বের করে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার অনুরোধ জানান তারা।

এ বিষয়ে বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিদপ্তরের (ডিএসডব্লিও) পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল আমিন সিদ্দিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবি দাওয়া এবং পরীক্ষায় ফেরাতে মঙ্গলবার উপাচার্য মহোদয় শ্রেণি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসবেন। মিটিংয়ের পর আমরা একটা সিদ্ধান্তে পোঁছাতে পারব। ছাত্ররাজনীতির পক্ষে এবং বিপক্ষে শিক্ষার্থীদের কথাও আমরা শুনব। লিখিত আদেশ পাওয়া সাপেক্ষে আইনি প্রক্রিয়ায় কিভাবে যাওয়া যায় সেটি নিয়েও আলোচনা হবে। আর শিক্ষার্থীদের সম্ভাব্য সেশনজট নিরসনেও বিভাগীয় প্রধানগণ কাজ করে যাচ্ছেন। আমরা আশা করছি খুব দ্রুত বুয়েটের অচলাবস্থা কেটে যাবে।

২০১৯ সালের অক্টোবরে বুয়েটের এক আবাসিক হলে শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে ছাত্রলীগের এক নেতার কক্ষে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সেই ঘটনায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে বুয়েটে নিষিদ্ধ হয় ছাত্র রাজনীতি। 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত