‘খালিস্তানপন্থা’ নিয়ে ভারতের অস্বস্তি যেন কাটছেই না। এবার ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যানালাইসিস উইং (র) এবং দেশটিতে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সরকারের জন্য চূড়ান্ত অস্বস্তির এক খবর প্রকাশ করেছে মার্কিন গণমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট। গত বছর কানাডায় এক শিখ ধর্মগুরুর মৃত্যুতে ভারতের গোয়েন্দাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে আসার পর থেকেই ক্রমাগত বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। ওয়াশিংটন পোস্টের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ‘খালিস্তানপন্থি’ শিখ ধর্মাবলম্বী নেতা গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টা করে ‘র’।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনটি এমন সময় সামনে এলো, যখন ভারতে ১৮তম লোকসভা নির্বাচনের দামামা চলছে। ইতিমধ্যে দুই দফার ভোটপর্ব শেষ হয়েছে। এ অবস্থায় খালিস্তান রাষ্ট্রের ডাক দেওয়া ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ নেতৃত্বকে হত্যার অভিযোগ স্বভাবতই বিজেপির জন্য ভাবমূর্তির সংকট তৈরি করবে।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যার অনুমোদন দেন ‘র’-এর সাবেক প্রধান সামন্ত গোয়েল। আর এই হত্যা মিশনের দায়িত্বভার পড়েছিল বিক্রম যাদব নামের এক ব্যক্তির ওপর যিনি সংস্থাটির একজন কর্তাব্যক্তি। পান্নুনকে হত্যার জন্য বিক্রম ভাড়াটে খুনি দল ঠিক করেন। আর এ জন্য পান্নুনের গতিবিধির ওপর নজরদারি চলত। আর পান্নুনকে হত্যার জন্য যে ছক আঁকা হয়েছিল, তার বিষয়ে পুরোটাই অবগত ছিলেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল।
হত্যার মিশনের আদ্যোপান্ত সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়, বিক্রম যাদব নামের ওই কর্মকর্তা নিখিল গুপ্তা নামের এক মাদক কারবারিকে জোগাড় করেন। এই দুজনের গভীর সম্পর্ক ছিল আগে থেকেই। হত্যা মিশন বাস্তবায়নে কানাডায় নিহত খালিস্তানি নেতা হরদীপ সিং নিজ্জরের মৃতদেহের ছবিও নিখিলকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে পান্নুন হত্যার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর বিক্রমকে ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়। ভারতের আধা সামরিক বাহিনীতে আগে যেভাবে কর্মরত ছিলেন বিক্রম, ঠিক সেভাবেই তাকে কাজে যোগ দিতে বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে পান্নুনকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় বিক্রমের নাম ‘সিসি ওয়ান’।
মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে পান্নুনকে একজন ‘মোদিবিরোধী’ নেতা হিসেবে তুলে ধরা হয়। গণমাধ্যমটি দাবি করেছে, তারা এই অনুসন্ধানী বিবরণ তৈরি করেছে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাটির সাবেক ও বর্তমান কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনার পর। এ বিষয়ে অজিত দোভাল বা সামন্ত গোয়েলের মন্তব্য জানতে পারেনি ওয়াশিংটন পোস্ট।
পান্নুনকে হত্যাচেষ্টার কথা প্রথম যুক্তরাষ্ট্রই বলেছিল। কানাডায় নিহত খালিস্তানি নেতা নিজ্জরের হত্যায় ভারতের জড়িত থাকার বিষয়টিও তখন কিছুটা গুরুত্ব পায়। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো নিজেই ভারতের বিরুদ্ধে সেই অভিযোগ তুলেছিলেন। এ নিয়ে ভারতের সঙ্গে কানাডার কূটনৈতিক টানাপড়েন তৈরি হয়। এবার ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন যেন গোটা বিষয়টিতে ভারতের গোয়েন্দাদের জড়িত থাকার দাবিকে ঘিরে আরও শক্ত সন্দেহ তৈরি করল।
ভারত সরকারের মোস্ট ওয়ান্টেডের তালিকায় থাকা খালিস্তানি জঙ্গি হরদীপ সিং নিজ্জরকে কানাডায়ই গুলি করে হত্যা করা হয়। পাঞ্জাব, হরিয়ানাসহ বিস্তীর্ণ জায়গা নিয়ে খালিস্তান রাষ্ট্রের ডাক দেওয়া স্বাধীনতাপন্থি সংগঠন ‘খালিস্তান টাইগার ফোর্স (কেটিএফ)’-এর কানাডাপ্রধান ছিলেন নিজ্জর। ২০২২ সালে পাঞ্জাবের জলন্ধরে একজন হিন্দু পুরোহিতকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে নিজ্জরের মাথার দাম ১০ লাখ টাকা ধার্য করা হয়েছিল। পরে তিনি নিহতই হলেন।
পান্নুন হত্যাচেষ্টা নিয়ে গত সোমবার হোয়াইট হাউজের প্রেস সচিব কারিন জাঁ পিয়েরে বলেছেন, ‘তদন্ত চলছে। বিচার বিভাগ ফৌজদারি তদন্ত চালাচ্ছে। এই বিষয়ে বিচার বিভাগকেই জিজ্ঞাসা করতে হবে। এটা খুবই গুরুতর একটা বিষয়। আমরাও এটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছি। ভারতও জানিয়েছে, তারা গুরুত্বের সঙ্গে ঘটনাটির তদন্ত করছে।’
গত মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল ওয়াশিংটন পোস্টের ওই প্রতিবেদন ‘অবাঞ্ছিত ও অপ্রমাণিত’ বলে দাবি করেছেন। এ নিয়ে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যে বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল, তা তদন্ত করতে ভারত উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করেছে। সংগঠিত অপরাধী চক্র, সন্ত্রাসবাদ ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে সেই কমিটি তদন্তের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের কাল্পনিক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য কোনো কিছুর জন্যই ইতিবাচক নয়।’
