হোল্ডিং ট্যাক্স নিয়ে হুলস্থূল

আপডেট : ০৭ মে ২০২৪, ১০:৩১ পিএম

সিলেট নগরীতে গৃহকর (হোল্ডিং ট্যাক্স) নিয়ে হুলস্থূল কাণ্ড চলছে। সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন পর পঞ্চবার্ষিক পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে নতুন গৃহকর নির্ধারণ করেছে। গত ৩০ এপ্রিল থেকে সিটি করপোরেশন নতুন নির্ধারিত গৃহকর পরিশোধের জন্য ভবনমালিকদের নোটিশ দেওয়া শুরু করে। পাশাপাশি কর আদায় এবং এ ব্যাপারে কারও কোনো আপত্তি থাকলে তা লিখিতভাবে জানানোর জন্য বিশেষ সেবা কার্যক্রম চালু করেছে। সিটি করপোরেশন প্রাঙ্গণে বুথ স্থাপন করে এই কার্যক্রম চলছে।

তবে ভবন মালিকেরা নতুন নির্ধারিত গৃহকরের নোটিশ পেয়েই ক্ষোভে ফুঁসছেন। তারা বলছেন, ‘সিটি করপোরেশন অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিক হারে কর বৃদ্ধি করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫০০ গুণ পর্যন্ত কর বাড়ানো হয়েছে। যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।’ এ অবস্থায় প্রতিদিনই শত শত লোক গৃহকরের ব্যাপারে তাদের লিখিত আপত্তি সিটি করপোরেশনে জমা দিচ্ছেন।

অস্বাভাবিক হারে কর বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন ইতিমধ্যে সোচ্চার হয়েছে। জেলা ও মহানগর বিএনপি পৃথক বিবৃতি দিয়ে গৃহকর বৃদ্ধিকে অস্বাভাবিক দাবি করে বলেছে, ‘দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে এমনিতেই মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। এ অবস্থায় অযৌক্তিকভাবে গৃহকর বাড়ানো ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ এর মতো। তাই অস্বাভাবিক হারে কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে।’

গৃহকর বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে সিলেট জেলা জাসদের সভাপতি লোকমান আহমদের আহ্বানে সোমবার রাতে নাগরিকসভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায়ও বক্তারা কর বৃদ্ধির হারকে অস্বাভাবিক দাবি করে তা যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন। বাসদের উদ্যোগেও ইতিমধ্যে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। দুর্নীতিমুক্তকরণ ফোরাম নামের একটি সামাজিক সংগঠনও গত সোমবার এ ব্যাপারে মেয়রের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে।

আজ মঙ্গলবার সিটি করপোরেশনের গৃহকর আদায় ও আপত্তি গ্রহণ বুথগুলো সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই সেখানে মানুষের দীর্ঘ সারি। প্রায় সবাই নতুন নির্ধারিত গৃহকরকে অস্বাভাবিক দাবি করে বলেন, ‘এই করের বোঝা আমাদের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। তাই গৃহকরকে সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে।’

নগরীর ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রুবেল মিয়া তার দুটি ঘরের জন্য নতুন নির্ধারিত গৃহকরের ব্যাপারে আপত্তি দাখিল করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার একটি একতলা আবাসিক ঘর ও একটি দোকানঘর রয়েছে। আগে আবাসিক ঘরের জন্য বছরে ৫০০ টাকা এবং দোকান ঘরের জন্য বছরে ৮০০ টাকা কর দিয়েছি। এখন আবাসিক ঘরের জন্য ৮ হাজার টাকা ও দোকান ঘরের জন্য ১৮ হাজার টাকা কর নির্ধারণ করা হয়েছে। যা আমার পক্ষে কোনোভাবেই দেওয়া সম্ভব নয়।’

খালেদ আহমদ নামের আরেকজন জানান, তিনি আগে ৯৪৪ টাকা ট্যাক্স দিতেন। এখন তার জন্য ১৬ হাজার টাকা ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয়েছে।

অবশ্য সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, কারো কাছে ট্যাক্স বেশি মনে হলে লিখিতভাবে আপত্তি জানানোর সুযোগ রয়েছে। সেটি যাচাই করে ট্যাক্স পুনর্নির্ধারণ করা হবে। এ ছাড়া বর্তমানে আরোপিত হোল্ডিং ট্যাক্সের অ্যাসেসমেন্ট (জরিপ) সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী দায়িত্বে থাকাকালে করা হয়েছে। বর্তমান মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী পূর্বের অ্যাসেসমেন্টের ভিত্তিতেই নতুন হারে গৃহকর আদায়ের উদ্যোগ নিয়েছেন।

সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মতিউর রহমান খান দেশ রূপান্তরকে জানান, হোল্ডিং ট্যাক্সের জন্য দুই ধরনের অ্যাসেসমেন্ট করা হয়। একটি জেনারেল অ্যাসেসমেন্ট, যা ৫ বছর পর পর করার কথা। আরেকটি প্রতিবছর করে থাকে সিটি করপোরেশনের রাজস্ব শাখা। তবে ২০০২ সালে সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘদিন জেনারেল অ্যাসেসমেন্ট হয়নি। সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ২০১৯-২০ অর্থবছরে হোল্ডিং ট্যাক্সের জেনারেল অ্যাসেসমেন্ট সম্পন্ন করেন। ওই অ্যাসেসমেন্টের মাধ্যমে নির্ধারিত গৃহকর বর্তমান পরিষদ কার্যকরের উদ্যোগ নিয়েছে। দীর্ঘদিন পর অ্যাসেসমেন্ট করে নতুন হারে গৃহকর নির্ধারণ করায় অনেকের কাছে তা বেশি মনে হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘ বিরতির কারণেই এটা হয়েছে। এতদিন যে হোল্ডিং ট্যাক্স নেওয়া হয়েছে তা ছিল অনেক ক্ষেত্রে অবাস্তব ও নামমাত্র।

সিটি করপোরেশনসূত্র জানায়, বর্তমানে নির্ধারিত হোল্ডিং ট্যাক্সের জন্য ফিল্ড সার্ভে হয় ২০১৯-২০ অর্থবছরে। ২০২১ সালের আগস্ট মাসে তৎকালীন সিসিক পরিষদের বিশেষ সভায় সেটি পাস হয়। নতুন হারে কর ধার্য্যরে অর্থবছর নির্ধারণ করা হয় ২০২১-২২ সাল। ওই অ্যাসেসমেন্টে মোট ৭৫ হাজার ৪৩০ টি হোল্ডিংয়ে ১১৩ কোটি ২৭ লাখ ৭ হাজার ৪৪৫ টাকা গৃহকর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সেটি অনুমোদনের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হলে ২০২১ সালের অক্টোবরে তা অনুমোদিত হয়। এখন সেই হারে গৃহকর আদায়ের উদ্যোগ নিয়েছে সিটি করপোরেশন।

এ ব্যাপারে সিটি মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নগরবাসী ভোট দিয়ে আমাকে তাদের সেবা করার দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি নগর উন্নয়ন ও নগরবাসীর সেবা করতে চাই। তবে উন্নয়নের জন্য নাগরিকদের দেওয়া ট্যাক্স একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উপযুক্ত ট্যাক্স প্রদান সকলের নৈতিক দায়িত্ব। তবে কারও ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ট্যাক্স আরোপিত হলে তা যাচাই করে অবশ্যই পুনর্নির্ধারণ করা হবে।’   

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত