চুরি ২৯৫ ভরি-উদ্ধার ৮৬ ভরি, বাকি স্বর্ণ গেল কই- প্রশ্ন বাদীর

আপডেট : ০৮ মে ২০২৪, ০৬:০৯ পিএম

চট্টগ্রাম নগরে গত ১৮ মাসের ব্যবধানে পৃথক তিনটি থানা এলাকার বাসা ও দোকান থেকে ২৯৫ ভরি স্বর্ণালংকার চুরি করে দুর্বৃত্তরা। পাঁচলাইশ, চকবাজার ও হালিশহর থানা এলাকায় এসব ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে পাঁচলাইশ ও চকবাজার থানাধীন পৃথক দুটি বাসা থেকে চুরি হওয়া ২২৩ ভরি স্বর্ণের মধ্যে ৮৬ ভরি স্বর্ণালংকার উদ্ধারের পাশাপাশি ঘটনায় জড়িত মূলহোতাদের গ্রেপ্তার করেছে মহানগর ডিবি ও সদরঘাট থানা পুলিশ।

অপরদিকে ১৮ মাস আগে হালিশহর থানা এলাকার একটি দোকানে সংঘটিত স্বর্ণালংকার চুরির ঘটনার রহস্যভেদ করতে পারেনি পুলিশ। অবশেষে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে গত বছরের ১ জুলাই থেকে ওই মামলা তদন্ত করছে সিআইডি, চট্টগ্রাম মেট্রো শাখা। সংশ্লিষ্ট মামলার বাদীর প্রশ্ন, চুরির মূলহোতারা গ্রেপ্তার হয়েছে। তারা আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছে। এর আগে তাদের হেফাজত থেকে ৮৬ ভরি স্বর্ণও উদ্ধার করা হয়েছে। তাহলে চুরির অবশিষ্ট স্বর্ণালংকার গেল কোথায়?

এ বিষয়ে মামলার তদন্ত ও তদারককারী একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য, বাদীরা মামলার  এজাহারে চুরি যাওয়া স্বর্ণের পরিমাণ বাড়িয়ে লিখেছেন। যা চুরি হয়েছে তা উদ্ধার হয়েছে। ধৃত আসামিরাও পুলিশ ও আদালতকে তাই বলেছে। জানা গেছে, গত ১০ ফেব্রুয়ারি সদরঘাট থানা পুলিশ ৫২ ভরি, এর আগে ৩ জানুয়ারি মহানগর ডিবি পুলিশ ৩৪ ভরি স্বর্ণালংকার উদ্ধার করে। ২০২২ সালের ১৪ আগস্ট থেকে গত ২ ফেব্রুয়ারি মধ্যে চুরির এসব ঘটনা ঘটে।

জানা গেছে, ২০২৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর সকালে পাঁচলাইশ থানাধীন ‘ফিনলে স্কয়ার’ ভবন থেকে ১০০ ভরি, চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি চকবাজার থানার আমিরবাগ আবাসিকের এসআর হাউজ নামে একটি বাড়ি থেকে ১২৩ ভরি, এর আগে ২০২২ সালের ১৪ আগস্ট হালিশহর থানাধীন নয়াবাজার সুলতান চৌধুরী মার্কেট থেকে ৭২ ভরি স্বর্ণালংকার চুরি হয়। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় চুরির মামলাও দায়ের করেন ভুক্তভেগীরা।

তিন থানা এলাকায় চুরি হওয়া অবশিষ্ট স্বর্ণ উদ্ধারের সবশেষ পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আবদুল মান্নান বুধবার সকালে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বর্ণ চুরির বড় ঘটনাগুলোয় জড়িতদের প্রায় সব অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই চক্রকে পুরোপুরি শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ সব ধরনের কৌশল প্রয়োগ করেছে। মূলহোতারা গ্রেপ্তার হওয়ায় আগের তুলনায় নগরে স্বর্ণালংকার চুরির ঘটনা কমেছে।

স্বর্ণ চুরির মামলার তদন্ত ও তদারক সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের দেওয়া ভাষ্যকে নাকচ করে দিয়ে পাঁচলাইশ থানাধীন ফিনলে স্কয়ারের বাসা থেকে ১০০ ভরি স্বর্ণ চুরির মামলার বাদী সায়লা ইয়াছমিন খুকি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডিবি পুলিশ কর্তৃক উদ্ধার করা ৩৪ ভরি স্বর্ণ আদালতের আদেশে ফেরতও পেয়েছি। বিয়ের সময় এবং পরে আমার জন্য স্বামী অনেক স্বর্ণালংকার কিনেছেন। ১৮/২০ বছরের সংসার জীবন অতিবাহিত হচ্ছে। ক্রয় করা সব স্বর্ণের তথ্য প্রমাণ বাসায় থাকবে এমন দাবি অযৌক্তিক। অবশিষ্ট ৭৬ ভরি স্বর্ণালংকার উদ্ধারের বিষয়ে ডিবির তদন্তকারী কর্মকর্তা বলছেন- চেষ্টা করছি। মামলার এজাহারে চুরি যাওয়া স্বর্ণের পরিমাণ অতিরঞ্জিত হয়েছে বলে পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি সঠিক নয়। তবু আদালতে ৬৫ ভরি স্বর্ণের কাগজপত্র জমা দিয়েছি।’

মামলার এজাহারে চোরাই স্বর্ণের পরিমাণ বাড়িয়ে লেখা হয়েছে- পুলিশ কর্মকর্তাদের এমন দাবি পুরোপুরি না মানলেও আংশিক মানেন চকবাজার আমীরবাগ আবাসিকের বাড়ি থেকে ১২৩ স্বর্ণালংকার চুরির মামলার বাদী ব্যবসায়ী সরোয়ার আলম খান। তিনি বলেন, ‘চুরির পরিমাণ সামান্য এদিক-সেদিক হতে পারে। কিন্তু বড় ব্যবধান নয়। আমার বাসা থেকে যারা স্বর্ণ চুরি করেছে। তাদের গ্রেপ্তারের পর সদরঘাট থানায় পুলিশের উপস্থিতিতে কথা বলেছি। তারা বলেছে- যা চুরি করেছি তার সবই পুলিশকে দিয়েছি। স্বর্ণ উদ্ধার হয়েছে ৫২ ভরি। তাহলে অবশিষ্ট স্বর্ণ গেল কোথায়? এ ছাড়া চুরি হওয়া নগদ চার লাখ টাকারও কোনো হদিস দিতে পারেনি পুলিশ।’

সরোয়ার আলম খানের অভিযোগ, চুরি করার পর একটি চেইন ও একটি আংটি নিয়ে মেহেদী (মূলহোতা) কর্ণফুলী থানা এলাকায় তার সৎ মায়ের কাছে চলে যায়। এর আগে বারিক বিল্ডিং এলাকার একটি স্থানে চুরির সব স্বর্ণ মাটি চাপা দিয়ে রেখে যান মেহেদী। চকবাজার থানা পুলিশ কর্ণফুলী থানা এলাকায় মেহেদীর সৎ মায়ের বাড়িতেও যায়। কিন্তু তার (মেহেদী) সৎ মাকে আইনের আওতায় আনেনি পুলিশ। এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলে চকবাজার থানার ওসি ওয়ালী উদ্দিন আকবর আমাকে বলেন- গ্রাউন্ড নেই।’

সদরঘাট থানা পুলিশ কর্তৃক উদ্ধার করা ৫২ ভরি স্বর্ণ বাদীকে ফেরত দিতে গত সোমবার চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন বলেও জানান সরোয়ার আলম খান।

২০২২ সালের ১৪ আগস্ট রাতে নগরের হালিশহর থানাধীন নয়াবাজার এলাকার একটি মার্কেটের ‘বৈশাখী সাজ জুয়েলার্স’ থেকে ৭২ ভরি স্বর্ণালংকার চুরির মামলার ডকেট পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে গত বছরের ১ জুলাই সিআইডি, চট্টগ্রাম মেট্রো ও জেলা শাখার বিশেষ পুলিশ সুপারের কাছে হস্তান্তর করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হালিশহর থানার উপপরিদর্শক মোজাহেদুল হাসান। বুধবার বিকেলে তিনি (মোজাহেদুল হাসান) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার আগে এই মামলা থানার আরেকজন অফিসার তদন্ত করেছেন। আমার জানামতে চুরি যাওয়া স্বর্ণ উদ্ধার হয়নি। এ ঘটনায় কেউ গ্রেপ্তারও হয়নি।

গত বছরের জুলাই থেকে স্বর্ণ চুরির এই মামলা (বৈশাখী সাজ জুয়েলার্স) তদন্ত করছে চট্টগ্রাম মেট্রো শাখার সিআইডি। অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সংস্থাটির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. শাহনেওয়াজ খালেদ বুধবার বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনার প্রায় এক বছর পরে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পাই আমরা। মামলার রহস্য উদঘাটন এবং জড়িতদের সনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে।’

পাঁচলাইশের ‘ফিনলে স্কয়ার’ ভবনে এক প্রবাসীর বাসা থেকে চুরি করা ১০০ ভরি স্বর্ণ চুরির ঘটনায় গত ২ জানুয়ারি মূলহোতা গৃহপরিচারিকা রাশেদাসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে মহানগর ডিবি (দক্ষিণ) পুলিশ। তাদের হেফাজত থেকে চুরির ৩৪ ভরি স্বর্ণালংকারও উদ্ধার করা হয়। পরে ডিবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির উপকমিশনার সাদিরা খাতুন জানিয়েছিলেন, চুরি যাওয়া বাকি ৭৬ ভরি স্বর্ণালংকার শিগগির উদ্ধার করা হবে।

ফিনলে স্কয়ারে স্বর্ণালংকার চুরির বড় ঘটনা সংঘটিত হওয়ার ৩৭ দিনের মাথায় গত ২ ফেব্রুয়ারি চকবাজার থানার আমিরবাগ আবাসিকের সরোয়ার আলম খান নামে এক ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে ১২৩ ভরি স্বর্ণ চুরি করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনার ৮দিন পর নগরের বারিকবিল্ডিং এলাকা থেকে মাদক মামলায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে সদরঘাট থানা পুলিশ। গ্রেপ্তার আরিফ হোসেন মেহেদী আদালতে জবানবন্দিতে জানায়, তার কাছে আমিরবাগ থেকে চুরি করা ‘কিছু’ স্বর্ণ লুকায়িত আছে। পরে তাকে নিয়ে বারিকবিল্ডিং এলাকায় অভিযান চালিয়ে মাটির নিচে পুঁতে রাখা ৫২ ভরি স্বর্ণালংকার উদ্ধার করে পুলিশ।

এরপর চকবাজার থানা পুলিশের আবেদনের প্রেক্ষিতে আমিরবাগ আবাসিকের বাড়ি থেকে স্বর্ণ চুরির মামলায় মেহেদীকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন আদালত। ওই মামলায় তাকে রিমান্ডে নেওয়ার পর এস আর হাউস থেকে তিনি ও তার সহযোগীরা স্বর্ণ চুরির দায় স্বীকার করে ফের আদালতে জবানবন্দি দেন। এতে চুরির ঘটনায় আর কারা জড়িত ছিল তাদের বিষয়ে তথ্য দেন মেহেদী।

মামলার এজাহারে বাদীর অভিযোগ ১২৩ ভরি স্বর্ণ চুরির। সদরঘাট থানা পুলিশ উদ্ধার করেছে ৫২ ভরি। বাকি ৭১ ভরি স্বর্ণালংকার উদ্ধারে কি পদক্ষেপ নিয়েছেন জানতে চাইলে চকবাজার থানার ওসি ওয়ালী উদ্দিন আকবর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাদী ১২৩ ভরি স্বর্ণ চুরির কথা এজাহারে উল্লেখ করলে তো পুলিশের কিছু করার নেই। গ্রেপ্তার মেহেদী জানিয়েছে- তার হেফাজতে চুরির ৫২ ভরি স্বর্ণালংকারই ছিল।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত