কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢাললেই শিরোপা জেতা যায় না

আপডেট : ০৯ মে ২০২৪, ১২:২১ এএম

২০১১ সালে কাতার স্পোর্টস ইনভেস্টমেন্ট পিএসজিকে (প্যারি সান জার্মাঁ) অধিগ্রহণ করে নেওয়ার পর ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নাসের আল খেলাইফি পাঁচ বছরে পরিকল্পনার ছক এঁকেছিলেন। যার লক্ষ্য ছিল চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা জেতার মাধ্যমে ইউরোপের সেরা ক্লাব হিসেবে মর্যাদা অর্জন করা।

যেন মনে হয়েছিল চ্যাম্পিয়নস লিগের মতো নকআউট টুর্নামেন্ট জেতা শুধু গাণিতিক সমীকরণ এবং সম্ভাবনার বিষয়। একের পর এক তারকা খেলোয়াড়দের পেছনে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ ঢালা আর পূর্ণ সদ্ব্যবহারের আগে তাদের ছেড়ে দেওয়া ছিল পিএসজির কাছে নিত্য ব্যাপার। দুই বিলিয়ন ইউরো এবং ১৩ বছর পর এসে এখনো তাদের শোকেস অপূর্ণ। জেতা হয়নি সেই কাক্সিক্ষত চ্যাম্পিয়নস লিগ ট্রফি। জøাতান ইব্রাহিমোভিচ থেকে শুরু করে, এডিনসন কাভানি, নেইমার, আনহেল ডি মারিয়া, লিওনেল মেসিদের দলে ভিড়িয়েও ছেড়ে দিয়েছে ক্লাবটি। অবশেষে কিলিয়ান এমবাপ্পের কাঁধে সওয়ার হয়ে এবার স্বপ্নপূরণের প্রায় কাছে পৌঁছেও অকালে ভেঙে গেছে তা। 

পিএসজির মাল্টি বিলিয়ন ইউরো এন্টারপ্রাইজের শিরোমণি কিলিয়ান এমবাপ্পেসহ ১০২ কোটি ইউরোর দলটি ঘরের মাঠ পার্ক দ্য প্রিন্সেসে হেরে গেছে জার্মান বুন্দেসলিগায় পঞ্চম অবস্থানে থাকা বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের কাছে। যে দলটিতে নেই আর্লিং হালান্ড বা জুড বেলিংহামের মতো কোনো তারকা। ফরাসি ক্লাবটির কাছে এমন ফলাফল রীতিমতো অপমানজনক। সেই সঙ্গে বাস্তবতার পরিচায়ক যে লক্ষ্যপূরণ থেকে তারা এখনো বেশ দূরে।

বুন্দেসলিগার পাঁচে থাকা দলটি যখন ওয়েম্বলিতে চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল খেলবে, তখন প্যারিসে বসে রাগে চুল ছেঁড়া ছাড়া আর কীই-বা করার আছে পারিসিয়ানদের। গত বছরগুলোতে পাগলের মতো পয়সা খরচ করে খেলোয়াড়দের স্কোয়াডে ভিড়িয়েছে পিএসজি। কিন্তু মাঠের কোথায় ব্যবহার করতে হবে তার উত্তর দিতে পারেনি। অন্য ক্লাব যেন সমৃদ্ধ না হয়, সেই পথও রুখেছে তারা। সাম্প্রতিক মৌসুমে পিএসজি কয়েক মিলিয়ন ইউরো খুইয়েছে। কোনোভাবে উয়েফার আর্থিক নজরদারির খড়গ থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রেখেছে। সেরা কোচকে বসিয়েছে ডাগআউটে। তরুণ প্রতিভাদের ধরে রাখতে ছেড়ে দিয়েছে নামি তারকাদের। এই প্রশংসনীয় অথচ ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগের পরও ইউরোপে তাদের ফলাফলে কোনো পরিবর্তন হয়নি।

পয়সার হিসাবে পিএসজি কখনোই সংকটে ছিল না। একটি ফ্যাশন ব্র্যান্ড হিসেবে পিএসজির থেকে বড় কেউ নেই। পৃথিবীর নামি তারকারা যারা অধিকাংশ সময় ভালো ফুটবল উপহার দেন, তারা থাকেন পণ্যের দূত হিসেবে। নিউইয়র্ক, টরন্টো, মায়ামি, টোকিওর মতো অন্যান্য পর্যটন গন্তব্যে রয়েছে তাদের শাখা। ধারাবাহিকভাবে ফরাসি লিগ আ জেতে পিএসজি। লিগে নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের পয়সার জোরে পর্যুদস্ত করার ক্ষমতাও আছে তাদের।  কাতারের তেল ব্যবসার কাঁচা টাকা রয়েছে ক্লাবের অর্থায়নের পেছনে। এমনকি প্রেসিডেন্ট খেলাইফির উয়েফা প্রেসিডেন্ট আলেকসান্ডার চেফেরিনের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও ইউরোপীয় ক্লাব পর্যায়ে প্রভাব ঈর্ষা করার মতো। পিএসজির সবকিছু আছে, কেবল নেই একটি জিনিস। যেটা তারা ১৩ বছর ধরে খুঁজে আসছে চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা।

ফুটবল কখনো কখনো একটি হাস্যকর খেলা। দুই লেগ মিলিয়ে পিএসজির নেওয়া ৪৪টি শটের ৩টিও যদি জালের দেখা পেত, তাহলে আজ এ আলোচনাই উঠত না। কিংবা ২০২০ মৌসুমের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালের ফল যদি তাদের পক্ষে থাকত, তাহলেও না। তবে এটাই মূল কথা। ফুটবলে এভাবে মোটাদাগে অর্জন দিয়ে সাফল্যের গাথা রচনা করা যায় না।

বর্তমান সময়ের সেরা কোচ পেপ গার্দিওলার চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে পৌঁছাতে ১০ বছর সময়ে লেগেছে, জিততে লেগেছে ১২ বছর। এই অপেক্ষা ইতিহাসে তাকে খারাপ কোচে পরিণত করেনি। পিএসজির একসময়ের সর্বোচ্চ গোলদাতা ইব্রাহিমোভিচ কিংবা ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিও কখনো চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতেননি। তারা ইতিহাসে কিংবদন্তি হিসেবেই সমাদৃত হন। তাদের অবমূল্যায়ন হয়নি কখনোই। চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতাটা কখনো কখনো ভালো খেলার সঙ্গে ভাগ্য ও উপযুক্ত সময়ের ওপরও নির্ভর করে। তবে পিএসজিকে সব সময়ই হতে হয়েছে অবমূল্যায়িত। এর পেছনে যে অর্থের প্রভাব রয়েছে তা বোঝেন সবাই।

২০১১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ১০টি লিগ আ শিরোপা জিতেছে পিএসজি। কাতারি মালিকরা কেবল ৯ অঙ্কের ফি দিয়ে বৈশ্বিক ট্রান্সফার রেকর্ড ভেঙে দেননি; তারা ২৭ জন খেলোয়াড়ের জন্য ৩০ মিলিয়ন ইউরো বা তারও বেশি অর্থ খরচ করেছেন। গত গ্রীষ্ম থেকে একডজন খেলোয়াড়ের পেছনে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ ট্রান্সফার ফি হিসাবে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছেন তারা।

বিশ্বকাপ জিতে ফেলা এমবাপ্পে পিএসজিকে কম দেননি। এবার হয়তো সেই গল্পে পাতার পরিবর্তন ঘটবে। পিএসজির এখন নিজেকে প্রশ্ন করার উপযুক্ত সময়। তারা সত্যিই কী অর্জন করতে চায়। আর সেখানে পৌঁছাতে কেমন প্রয়াস করতে হবে। লজ্জা, অপমান, বেদনার এই সংকটময় সময়ে পিএসজির জন্য সঠিক পরিকল্পনা করতে পারাটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আপাতত বলা যায়, ২০১২ সাল থেকে পিএসজি প্রজেক্টকে যেভাবে দেখে এসেছে বিশ্ব, তা শেষ হয়ে গেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত