ঋণ আদান-প্রদানে ইসলামের বিধান

আপডেট : ১০ মে ২০২৪, ০৩:০০ এএম

ঋণ বা কর্জ একটি প্রয়োজনীয় লেনদেন। সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তি জীবনযাপনের ক্ষেত্রে কোনো না কোনো সময় ঋণ নেওয়ার কিংবা অন্যকে দেওয়ার সম্মুখীন হতে হয়। তবে এই মানবীয় সুন্দর নিয়ম এবং অপরকে সহযোগিতা করার এই ইসলামি প্রথাও অনেক সময় কুমতলবীর চক্রান্তে ও মায়াজালে ফেঁসে বিদ্বেষ, ঝগড়াঝাটি এমনকি বড় রকমের শত্রুতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেকে তো এই ঋণকেই পুঁজি জমা করার উপায় হিসেবে ব্যবহার করে পুঁজিপতি হয়েছে ও হচ্ছে। আর দরিদ্র সম্প্রদায় তাদের মুখাপেক্ষী হওয়ার কারণে ঋণের ফাঁদে আটকে আছে।

ইসলামে ঋণপ্রথা বৈধ, যা সুন্নত এবং ইজমা (ঐকমত্য) দ্বারা প্রমাণিত। বোখারি শরিফের হাদিসে বর্ণিত আছে, নবী করিম (সা.) একদা এক উষ্ট্রী ধার নেন এবং ফেরত দেওয়ার সময় সেই সমগুণের উষ্ট্রী না পাওয়ায় তার থেকে উত্তম গুণের পুরুষ উট ফেরত দেন এবং বলেন, তোমাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি সে, যে উত্তম ঋণ পরিশোধকারী। সহিহ বোখারি : ২৩৯০

ঋণ প্রদান নেকির কাজ, যার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে। এর মাধ্যমে লোকের সাহায্য করা হয়, দয়া করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের সমস্যা হ্রাস করা হয় কিংবা সমাধান করা হয়। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলিম ব্যক্তির দুনিয়াবি বিপদ দূর করবে, আল্লাহতায়ালা তার আখেরাতের বিপদ দূর করবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো অভাবীর কষ্ট সহজ করবে, আল্লাহ তার দুনিয়া ও আখেরাত সহজ করবেন। আল্লাহ বান্দার সাহায্য করেন যতক্ষণে বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্য করে।’ সহিহ মুসলিম

ঋণদাতা এবং ঋণগ্রহীতা লেনদেনের সময় একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারণ করতে পারে এবং প্রয়োজনে মেয়াদ বৃদ্ধিও করতে পারে। কারণ আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে বিশ্বাসীরা! যখন তোমরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ধারে কারবার করবে, তখন তা লিখে রাখবে।’ সুরা বাকারা : ২৮২।

অতঃপর মেয়াদ নির্ধারিত থাকলে ঋণদাতা নির্ধারিত সময়ের পূর্বে ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে ঋণ ফেরত নেওয়ার দাবি করতে পারে না। বরং সে নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বাধ্য। কারণ নবী করিম (সা.) বলেন, ‘মুসলিমরা শর্ত পূরণে বদ্ধপরিকর।’ জামে তিরমিজি

ইসলামে ঋণের উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষকে সাহায্য করা, তাদের প্রতি দয়া করা তথা তাদের জীবনযাপনে সহযোগিতা করা, সহযোগিতার আড়ালে সুবিধা অর্জন নয়। তাই বলা হয়েছে, ঋণের উদ্দেশ্য হবে আধ্যাত্মিক বৃদ্ধি, বাহ্যিক বৃদ্ধি নয়। আর তা হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। এ কারণে ঋণগ্রহীতা ঋণ ফেরত দেওয়ার সময় যা নিয়েছে তা কিংবা সেই অনুরূপ ফেরত দিতে আদিষ্ট, অতিরিক্ত নয়। ঋণদাতা এর অতিরিক্ত নিলে কিংবা ঋণ গ্রহীতা অতিরিক্ত ফেরত দিলে, তা সুদ হিসেবে গণ্য হবে। কারণ মূলনীতিতে বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক ঋণ, যার মাধ্যমে লাভ উপার্জিত হয়, তা সুদ।’

ঋণদাতা যখন মানুষের উপকারার্থে ঋণ প্রদান করে, তখন ঋণগ্রহীতার দ্বীনি ও নৈতিক দায়িত্ব হবে তা যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে দেওয়া। যদি এমন না করে টালবাহানা শুরু করে, মিথ্যা ওজর পেশ করতে থাকে, তাহলে মিল-মহব্বত ও ভ্রাতৃত্ব নষ্ট হয়, শত্রুতা বৃদ্ধি পায় এবং একে অপরের প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘ধনী ব্যক্তির টালবাহানা করা অত্যাচার।’ মুত্তাফাকুন আলাইহি

নবী করিম (সা.) আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করল এমতাবস্থায় যে, সে তিনটি স্বভাব থেকে মুক্ত ছিল, তাহলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে অহংকার, গনিমতের সম্পদ থেকে চুরি এবং ঋণ।’ ইবনে মাজাহ

ঋণ মানুষের হক, তা পূরণের আগে মৃত্যুবরণ করা মানে মানুষের হক নিজ স্কন্ধে থেকে যাওয়া, যা বড় অপরাধ। এ কারণে এমন ব্যক্তির জানাজার নামাজ নবী করিম (সা.) নিজে পড়েননি। হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.)-এর কাছে একদা এক ব্যক্তির জানাজা নিয়ে আসা হলে, তিনি বলেন, তোমরা তোমাদের সাথির জানাজা পড়ো, কারণ সে ঋণী।’

জামে তিরমিজি : ১০৬৯

ইসলামি স্কলারদের মতে, মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকার সম্পদ বণ্টনের পূর্বে কয়েকটি হক নির্ধারিত, তা পূরণের পরেই তার উত্তরাধিকার বণ্টিত হবে। তন্মধ্যে মৃতের ওপর অপরের হকসমূহ অন্যতম। সে হক আল্লাহর হোক, যেমন জাকাত; কিংবা মানুষের হক হোক, যেমন ঋণ।

সমাজে কিছু লোক পাওয়া যায়, যারা সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও ঋণ শোধ করতে ঢিলেমি করে, তেমন সত্যিকারে এমন লোকও রয়েছে, যারা নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে অক্ষম। এমন ব্যক্তিকে ইসলাম অতিরিক্ত সময় দিতে উদ্বুদ্ধ করে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যদি ঋণী দরিদ্র হয়, তবে সচ্ছল অবস্থা আসা পর্যন্ত অবকাশ দেবে আর মাফ করে দেওয়া তোমাদের পক্ষে অতি উত্তম, যদি তোমরা জানতে!’

সুরা বাকারা : ২৮০

নবী করিম (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে, আল্লাহ তাকে কেয়ামত দিবসের কষ্ট থেকে নিষ্কৃতি দেবে, সে যেন অভাবী ঋণীকে অবকাশ দেয় কিংবা তার ঋণের বোঝা লাঘব করে।’

সহিহ মুসলিম : ৪০০০

আজকাল সমাজে এক প্রকার লোক দেখা যায়, যারা ঋণ নেয় পরিশোধ না করার উদ্দেশ্যে। অর্থাৎ আসলে তার অন্তরে থাকে অন্যের অর্থ কৌশলে আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্য। আর ঋণ করাটা হচ্ছে তার একটি বাহানা মাত্র। এমন লোকেরা একসঙ্গে কয়েকটি হারাম কাজে লিপ্ত হয়। যেগুলো হলো বাতিল পদ্ধতিতে অন্যের মাল-সম্পদ ভক্ষণ, যা আল্লাহ নিষেধ করেছেন। ধোঁকা তথা প্রতারণা। জেনে-বুঝে সজ্ঞানে গোনাহ করা। মিথ্যা বলা। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি অন্যের মাল পরিশোধ করার উদ্দেশ্যে নেয়, আল্লাহ তার পক্ষ হতে পরিশোধ করে দেন। (পরিশোধ করতে সাহায্য করেন) আর যে ব্যক্তি তা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে নেয়, আল্লাহ তা নষ্ট করে দেন।’

সহিহ বোখারি : ২৩৮৭

লেখক : প্রিন্সিপাল পদুয়া কাসেমুল উলুম মাদ্রাসা, ফেনী

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত