কৃষকের মাথায় বজ্রপাত কেন

আপডেট : ১০ মে ২০২৪, ০৩:০০ এএম

বাংলা ভাষায় আকস্মিক কোনো দুর্ঘটনা বোঝাতে বলা হয় বিনা মেঘে বজ্রপাত। তবে বাস্তবে বজ্রপাত বিনা মেঘেও হয় না, আকস্মিকও হয় না। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে বজ্রপাতের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব। তথাপি, প্রতি বছর বাংলাদেশে গড়ে ৩০০ জন মানুষ মারা যাচ্ছেন, যা বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ। আর দেশে বজ্রপাতে নিহতের ৭২ শতাংশই কৃষক। বজ্রঝড় বা বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের শুরুটা হয় বাতাসের আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে। মেঘের মধ্যে বিভব পার্থক্য তৈরি হওয়ায় ঘটে তড়িত প্রবাহ। যেসব মেঘে এই প্রবাহ তৈরি হয় তাদের বলা হয় বজ্রমেঘ। যে মেঘে বজ্রমেঘ রয়েছে সেসব মেঘ কোনো এলাকার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় বজ্রপাত ঘটায়। সাধারণ বজ্রমেঘের যে সেলটি (একটি খ-) রয়েছে সেই সেলটি একটি এলাকা অতিক্রম করতে ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট সময় নিয়ে থাকে। তাই কোনো এলাকায় বজ্রপাত শুরু হওয়ার পর ধরেই নিতে হবে তা ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট অব্যাহত থাকবে।

আন্তর্জাতিকভাবে বজ্রপাত নিয়ে গবেষণা করা অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আশরাফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের দেশে সাধারণত বিকেল থেকে রাত এবং ভোররাত থেকে ভোর, এই সময়ে বজ্রপাত হয়ে থাকে। মূলত সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত হলো বজ্রপাতের আদর্শ সময়। আবহাওয়াবিদ এবং বজ্রপাত গবেষক আবুল কালাম মল্লিক বলেন, দেশে মূলত বর্ষার আগ মুহূর্তে বেশি বজ্রপাত হলেও মে মাসে সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে। এ মাসে গড়ে ১৩টি বজ্রমেঘ সৃষ্টি হওয়ার কথা। দেশে সাধারণত মার্চ থেকে মে মাসে প্রায় ৫৯ শতাংশ, আর মৌসুমি বায়ু আসার সময়, অর্থাৎ জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৬ শতাংশ বজ্রপাত হয়।

আর এইসব বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুঝুঁকিতে থাকে সমুদ্র উপকূলীয় এলাকা, বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ, নদীর চর এলাকা, নদীর আইল বা সাগরের পাড় এলাকায় যেখানে উঁচু কোনো স্থাপনা বা বৃক্ষ নেই সেসব এলাকার মানুষ। এমনকি গাছতলায় থাকলেও বজ্রপাতের ঝুঁকি এড়ানো কঠিন। এই কারণে বিশেষজ্ঞরা বলেন, বজ্রপাতের পূর্বাভাস জেনে ৪৫ মিনিটের মতো ঘরে থাকাই বজ্রপাত এড়ানোর সবচেয়ে ভালো উপায়। রাডার সিস্টেমের মাধ্যমে সহজেই বজ্রমেঘের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব। এইসব পূর্বাভাস প্রচারের জন্য রেডিও, টেলিভিশনের মতো প্রচলিত সংবাদমাধ্যম ছাড়াও সামাজিক মাধ্যমগুলোকেও ব্যবহার করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে নিরাপদ রাখা যায়।

শহর এলাকায় ফাঁকা স্থানের অভাবের কারণে বজ্রের ঝুঁকি কম হলেও ভবনগুলোতে বজ্রনিরোধক দ- ব্যবহার করে বজ্রের ক্ষতি থেকে মানুষ ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসকে রক্ষা করা যায়। এ ছাড়া খোলা স্থানের বৈদ্যুতিক খুঁটি কিংবা টাওয়ারে লাইটনিং অ্যারেস্টার (যাকে লাইটনিং আইসোলেটরও বলা হয়) বসানো যেতে পারে। লাইটনিং অ্যারেস্টার হলো একটি যন্ত্র, মূলত একটি বৈদ্যুতিক তার এবং স্থলের মধ্যে একটি ব্যবধান, যা বৈদ্যুতিক পাওয়ার ট্রান্সমিশন এবং টেলিকমিউনিকেশন সিস্টেমের আস্তরণ এবং কন্ডাক্টরকে রক্ষা করতে ব্যবহৃত হয়। ‘একেকটি লাইটনিং অ্যারেস্টার ১০০ বর্গমিটার এলাকা কভার করে। অর্থাৎ এ এলাকার মধ্যে কোনো বজ্রপাত হলে তা অ্যারেস্টারে আটকা পড়বে।’

বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘোষণার পর ২০১৭ সালে সরকার বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে দেশব্যাপী ১০ লাখ তালগাছ লাগানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কিন্তু পরের বছর ২০১৮ সালের শুরুতেই ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সচিব জানিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তালগাছ নয়, সারা দেশে ৩১ লাখ তালের আঁটি রোপণ করা হয়েছে। অবশ্য, সেই আঁটি থেকে চারা হলো কি না, তার আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। তবে তালগাছের বর্ধন শ্লথগতির, ফলে তালের আঁটি রোপণ করে বজ্রপাতের ঝুঁকি কমতে বহু বছর লাগবে। তালগাছের পাশাপাশি অন্যান্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা বজ্রপাতের এই ভরা মৌসুমে অত্যাবশ্যক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত