বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) অধীন পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বাতিল এবং অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ না করার নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। সেই সঙ্গে আজ শুক্রবার ছুটির দিনে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় আরইবির প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় দেশের বিভিন্ন এলাকার ৮০টি সমিতি থেকে দুজন করে প্রতিনিধি অংশ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সংস্থাটি।
গতকাল বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে অফিস সময়ের পর এ সংক্রান্ত পৃথক দুটি অফিস আদেশ জারি করা হয়। বিকেল ৪টায় ওই অফিস আদেশ জারি করে কর্মকর্তাদের পরদিন সকাল ১০টায় মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি ছাড়াই সবার ছুটি বাতিল করায় অবাক হয়েছেন সমিতির একাধিক কর্মকর্তা। তাদের প্রশ্ন, পল্লীবিদ্যুৎ সমিতিতে কি জরুরি অবস্থা জারি করা হলো!
এমন এক পরিস্থিতিতে অফিস আদেশ দুটি জারি করা হলো যখন আরইবি এবং পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির মধ্যে থাকা বৈষম্যগুলো দূর করাসহ অভিন্ন চাকরিবিধি বাস্তবায়নের দাবিতে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মবিরতি পালন করছেন। ইতিমধ্যে আন্দোলনের যুক্ত একাধিক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত, তাৎক্ষণিক বদলিসহ নানা ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং নানারকম হুমকি-ধমকি দিচ্ছে আরইবি এমন অভিযোগ উঠেছে।
আরইবির দুটি অফিস আদেশে সই করেছেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক মো. আসাফউদ্দৌলা। বিষয়টি জানতে গতকাল তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও সাড়া মেলেনি। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান অজয় কুমার চক্রবর্তীকে কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন ধরেননি।
জানতে চাইলে আরইবির সদস্য (প্রশাসন) মো. হাসান মারুফ সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো জরুরি অবস্থা চলছে না। বিদ্যুৎ একটি অত্যাবশ্যকীয় সেবা। প্রধানমন্ত্রী যেহেতু গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে নির্দেশ দিয়েছেন, সেজন্যই ছুটি বাতিল করা হয়েছে।’
অনেকে বলছেন, পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চলমান আন্দোলন দমানোর জন্যই এ ধরনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আন্দোলনের সঙ্গে এ নির্দেশের কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ আপিল বিভাগ যেকোনো ট্রেড ইউনিয়নসংক্রান্ত মামলা খারিজ করে দিয়েছে। পল্লীবিদ্যুতে কোনো ট্রেড ইউনিয়ন করা যাবে না।’
অবশ্য আন্দোলনকারীরা কোনো নির্দিষ্ট ব্যানারে আন্দোলন করছেন না। তাদের দাবির মধ্যে ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকারের কথাও বলা নেই। মূলত নিজেদের ন্যায্য সুবিধা নিশ্চিত করার কথা বলছেন তারা। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে আরইবির এক কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সবাইকে তৎপর হতে বলা হয়েছে। তবে অভ্যন্তরীণ কিছু ঝামেলার কারণেও এমন আদেশ দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির ব্যবস্থাপনা ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নের ক্ষেত্রে যৌক্তিক প্রস্তাব থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দাখিল করার কথাও বলা হয়েছে এতে।
যদিও পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, অতীতে সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে ছুটি বাতিলের কোনো ঘটনা ঘটেনি। সাধারণত প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা বিশেষ পরিস্থিতিতে এ ধরনের নির্দেশনা জারি করা হয়। তাছাড়া ছুটি বাতিলের ওই আদেশে গ্রীষ্ম বা সেচ মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা উল্লেখ নেই।
আরইবির আদেশে বলা হয়, উন্নত ও আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে সরকারের অভূতপূর্ব উন্নয়ন কর্মকান্ড বাধাবিঘœহীনভাবে চলমান রাখা এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সমিতির সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করার পাশাপাশি কর্মস্থল ত্যাগের অনুমতি প্রদান বন্ধ থাকবে। তবে যৌক্তিক কারণ থাকলে তা বিবেচনা করা যাবে।
গ্রাহক সেবা ও বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা সার্বক্ষণিক সচল রাখতে সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব কেউ পালন না করলে প্রয়োজনে তার চুক্তি বাতিল বা চাকরিচ্যুত করার কথা বলা হয় এতে।
যেকোনো ধরনের কর্মবিরতি, উসকানিমূলক কাজ ও বক্তব্যসহ অন্যান্য বেআইনি কর্মকান্ড প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সমিতির প্রধানদের। প্রয়োজনে বিভাগীয় এবং ফৌজদারি মামলা করারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ওই অফিস আদেশে।
এদিকে মতবিনিয়ম সভাসংক্রান্ত দ্বিতীয় আদেশে কী কারণে এ সভা ডাকা হচ্ছে তার কোনো উল্লেখ করা হয়নি। তাছাড়া এত স্বল্প সময়ের নোটিসে নিকট অতীতে এ ধরনের কোনো সভার আয়োজন করা হয়নি বলেও জানিয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা। বিদ্যুৎসেবা নিশ্চিত করতে সবার ছুটি বাতিলের পরপরই কেন ১৬০ জন কর্মকর্তাকে ঢাকায় মতবিনিময় সভায় যোগ দিতে বলা হলো, তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।
এজেন্ডা ছাড়াই হঠাৎ ডাকা সভায় অংশ নিতে বেশ কিছু শর্ত দিয়ে আরইবির চেয়ারম্যানকে গতকাল রাতে লিখিতভাবে জানিয়েছেন আন্দোলনকারী কর্মকর্তারা।
শর্তের মধ্যে রয়েছে মতবিনিময় সভা কী সংক্রান্ত সে বিষয়ে পরিষ্কার করা, দাবিদাওয়া-সংবলিত স্মারকলিপি প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানোর দায়ে যাদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে তা প্রত্যাহার, প্রতিটি সমিতি থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে কমপক্ষে ১০ জন করে প্রতিনিধিকে সভায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া এবং ওই সভায় শুধু আরইবির চেয়ারম্যান এবং সরকার বা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি থাকবেন।
