মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ভাইভার আগেই মিষ্টিমুখ

লিখিত পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন পান চাকরি প্রার্থীরা

আপডেট : ১৩ মে ২০২৪, ১১:০৬ এএম

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) যেন অনিয়ম-দুর্নীতির আখড়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে ৬৮ মেডিকেল অফিসার নিয়োগ দিতে গত ২০ অক্টোবর লিখিত পরীক্ষা হয়। এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য আবেদন থেকে শুরু করে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মডারেশন সবকিছুতেই ঘটেছে অনিয়ম।

নিয়মে যেকোনো পরীক্ষা নেওয়ার ক্ষেত্রে পরীক্ষা কমিটি গঠন করার কথা থাকলেও তা না করে সবকিছুর নিয়ন্ত্রণে ছিল নিয়োগ কমিটি। এই কমিটির সদস্যরা পেনড্রাইভের মাধ্যমে প্রশ্ন চুরি করে তা আবেদনকারীদের সরবরাহ করে হাতিয়ে নিয়েছেন মোটা টাকা।

লিখিত পরীক্ষায় কাদের উত্তীর্ণ করা হবে তা আগেই চূড়ান্ত করে রাখা হয়েছিল এবং সেই তালিকা অনুযায়ী মনোনীত প্রার্থীদের লিখিত পরীক্ষার পর মৌখিক পরীক্ষার আগেই নিজ কক্ষে ডেকে মিষ্টিমুখ করান সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের অতিরিক্ত পরিচালক ডা. রসুল আমিন। নিয়োগ পরীক্ষার নানা অনিয়মের ভিডিও ও স্থিরচিত্র এসেছে দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদকের হাতে।

বিএসএমএমইউর সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদের মেয়াদে বিভিন্ন নিয়োগ কেলেঙ্কারি ও অনিয়মে তৎকালীন উপাচার্যের একান্ত সচিব ছিলেন ডা. মোহাম্মদ রাসেল ও সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের অতিরিক্ত পরিচালক ছিলেন ডা. রসুল আমিন। তারা ৬৮ মেডিকেল অফিসার নিয়োগের প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের মূল হোতা ছিলেন। তারা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ইফতেখার আলমকে ম্যানেজ করে প্রাথমিক মডারেশনে তাদের পছন্দের শিক্ষকদের রেখেছিলেন।

দেশ রূপান্তরের হাতে আসা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গত ১৫ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জাহিদুল ইসলাম ও কার্ডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফয়সাল ইবনে কবির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন মডারেশন কক্ষে অবস্থান করছেন। বেলা ২টা ১৩ মিনিটে ডা. জাহিদুল ইসলাম তার পকেট থেকে পেনড্রাইভ বের করে কম্পিউটারে ঢুকিয়ে লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন কপি করেন। তখন কক্ষে তারা দুজন ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। ২টা ১৮ মিনিটে কম্পিউটার থেকে পেনড্রাইভ বের করে শার্টের পকেটে ঢুকিয়ে নেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষার মডারেশনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা মডারেশন কক্ষে মোবাইল ফোন, ক্যামেরা প্রভৃতি ডিভাইস নিয়ে ঢুকতে পারেন না। কক্ষে প্রবেশের আগে তাদের দেহ তল্লাশি করার কথা। ওই কর্মকর্তারা মনে করেন, প্রশ্নফাঁস ও নিয়োগ জালিয়াতির মতো অসৎ উদ্দেশ্য নিয়েই ডা. জাহিদুল ইসলাম ও ডা. ফয়সাল পেনড্রাইভ নিয়ে ঢুকেছিলেন এবং বেরিয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে ফার্মাকোলজির সহযোগী অধ্যাপক ডা. জাহিদুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

অভিযুক্ত কার্ডিওলজির সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফয়সাল ইবনে কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি কোনো অনিয়মে জড়িত নই; আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে।’

৬৮ মেডিকেল অফিসার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তুলে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের একটা অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে ২৯ অক্টোবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মনিরুজ্জামান খানকে আহ্বায়ক ও ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. একেএম সালেককে সদস্য সচিব করে তদন্ত কমিটি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

অধ্যাপক ডা. মনিরুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ঘটনা তদন্তে সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছি। বিবদমান পক্ষগুলো একে অন্যের ওপর দোষ চাপানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। তদন্ত শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে।’ 

মেডিকেল অফিসার নিয়োগ কমিটির প্রধান ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. ছয়েফ উদ্দিন আহমদ। প্রশ্নপত্র ফাঁস নিশ্চিত করতে পরীক্ষা কমিটি গঠন না করে নিয়োগ কমিটি দিয়েই যাবতীয় কাজ পরিচালনা করতে তাকে নানা মহল থেকে চাপ দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত অধ্যাপক ডা. ছয়েফ উদ্দিন পরীক্ষা কমিটি গঠন না করেই পরীক্ষা নেন। নিয়োগ কমিটিতে অধ্যাপক ও ডিনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদের একান্ত সচিব (পিএস)-২ দেবাশীষ বৈরাগী সার্বিক পরীক্ষা তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালন করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ১০টি করে প্রশ্ন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের অফিসে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও নিয়ম লঙ্ঘন করে সেই প্রশ্ন রাখা হয় নিয়োগ কমিটির সভাপতি ডা. ছয়েফ উদ্দিনের কাছে। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকদের দেওয়া প্রশ্ন থেকে দেবাশীষ বৈরাগী ও তার সহযোগীরা ৩০০ প্রশ্ন প্রাথমিকভাবে মনোনীত করেন এবং তা চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছে ৩০-৪০ লাখ টাকায় বিতরণ করেন। মডারেশন বোর্ডের সদস্যরা ৩০০ প্রশ্ন থেকে ১০০ প্রশ্ন বাছাই করেন এবং ওই প্রশ্নেই পরীক্ষা নেওয়া হয়। ফলে আগে যারা প্রশ্ন পেয়েছেন, তাদের উত্তীর্ণ হওয়া নিশ্চিত ছিল।

পরীক্ষা কমিটি গঠন না করা ও ডিন কিংবা সিনিয়র অধ্যাপকদের বাদ দিয়ে দেবাশীষ বৈরাগীকে পরীক্ষা তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. ছয়েফ উদ্দিন বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তাধীন বিষয়ে আমার কথা বলা ঠিক নয়।’ 

অভিযোগ রয়েছে, পেনড্রাইভে করে ৩০০ প্রশ্ন চুরি করে তা ফাঁসচক্রের সদস্যদের কাছে সরবরাহ করেন ডা. জাহিদুল ও ডা. ফয়সাল। এ কাজে তাদের সহযোগিতা করেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এবং পরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান। তারাই চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছে তা বিক্রি করেন। এই চক্রের অন্য সদস্যরা হলেন সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের অতিরিক্ত পরিচালক ডা. রসুল আমিন, একই হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. জাহিদ হাসান পলাশ, বিএসএমএমইউর নিউরো সার্জারি বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. আবেদ আব্বাস, কনজারভেটিভ ডেন্টিস্ট বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. মোমিনুর রহমান ও ভাসকুলার সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মাঈনুল মাহমুদ সানী।

জানা গেছে, ২০ অক্টোবরের লিখিত পরীক্ষায় ৩৫০ চিকিৎসককে উত্তীর্ণ করা হয়। তাদের মধ্য থেকে যারা নিয়োগের জন্য আর্থিক লেনদেন করেছিলেন, তাদের ২৬ অক্টোবর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের অতিরিক্ত পরিচালক ডা. রসুল আমিন মিষ্টিমুখ করান। মিষ্টি খাওয়াতে আরও উপস্থিত ছিলেন পেনড্রাইভে প্রশ্নচোর ডা. ফয়সাল ইবনে কবির, বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মাসুম আলম এবং প্রশ্ন বিক্রি চক্রের সদস্য ডা. আবেদ আব্বাস, ডা. মোমিনুর রহমান,  ডা. মাঈনুল মাহমুদ সানী, ডা. জাহিদ হাসান পলাশ। তাদের সঙ্গে মিষ্টি খান চাকরিপ্রত্যাশী ডা. অনুপম সাহা, ডা. রাব্বী হাসান, ডা. সানাহউল্লাহ মোল্লা স্বপন, ডা. জুনায়েদ আহমেদ, ডা. সর্বজিত রায়, ডা. তনুময় দত্ত রায়, ডা. আরিফুর রহমান শাওয়ান, ডা. আদনান ইবরাহিম, ডা. দাউদ চৌধুরী পলাশ, ডা. জাকিউল ইসলাম ফুয়াদ, ডা. মাইদুল ইসলাম, ডা. আবু বকর সিদ্দিক লিমন, ডা. নাফিস রায়হান, ডা. আতিকুর রহমান মিজু প্রমুখ। স্থিরচিত্রে থাকা ৩ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এ ছাড়া লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন প্রশ্নফাঁসে জড়িত ২ মেডিকেল অফিসার ডা. আবেদ আব্বাসের স্ত্রী ডা. উম্মে হাবিবা শান্তা, মেডিকেল অফিসার ডা. মোমিনুর রহমানের স্ত্রী ডা. মাহিরুন নাহার অরিন।

দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা আধুনিকীকরণ, শিক্ষা ও গবেষণার মান বাড়ানোর লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়টি (বিএসএমএমইউ) প্রতিষ্ঠা করা হয়। নিয়োগ ও পদোন্নতিতে দুর্নীতি, কেনাকাটায় অনিয়মের কারণে দিনে দিনে এর মান তলানিতে নামছে। চিকিৎসাসেবার মানও নিম্নগামী।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত