মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

এসএসসির ফল বিশ্লেষণ

'গণিত-ইংরেজি-বিজ্ঞানে মানসম্মত শিক্ষক পেলে ফলাফল ভালো করা যেত'

আপডেট : ১৩ মে ২০২৪, ১১:৪১ এএম

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এবার গড় পাসের হার বাড়লেও কমেছে মোট জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা। ৯টি সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডে গড়ে পাসের হার ৮৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। গত বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে গড় পাসের হার ছিল ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশ। সেই হিসেবে এবার পাসের হার ২ দশমিক ৬০ শতাংশ বেড়েছে।

প্রকাশিত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পাসের হার কম হওয়ার ক্ষেত্রে গণিত ও ইংরেজি বিষয় বেশি প্রভাব রেখেছে। বিষয়ভিত্তিক সামগ্রিক ফলাফলে তারই প্রমাণ মেলে।

গতকাল রবিবার গণভবনে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট ও সমমান পরীক্ষা-২০২৪ এর ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতার বিকাশে বিশেষ করে মুখস্থ বিদ্যায় নির্ভরতা কমাতে পাঠ্যক্রম এবং শিক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

এ বছর ১১টি বোর্ডে জিপিএ ৫ অর্জন করেছে ১ লাখ ৮২ হাজার ১৫২ জন শিক্ষার্থী। গত বছর জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫৭৮। সেই হিসাবে এবার জিপিএ ৫ কম পেয়েছে ১ হাজার ৪২৬ জন।

ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাংলায় পাসের হার ৯৮ দশমিক ১৫ শতাংশ, ইংরেজি ৯৫ দশমিক ২৩ শতাংশ, গণিত ৯১ দশমিক ১৯ শতাংশ, পদার্থ ৯৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ, রসায়ন ৯৮ দশমিক ১০ শতাংশ এবং আইসিটি ৯৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ। যেসব শিক্ষাবোর্ডে গণিত ও ইংরেজিতে বিষয়ভিত্তিক পাসের হার ভালো, সেসব বোর্ডের সার্বিক পাসের হারও ভালো। আর যেগুলো পিছিয়ে সেগুলোতে পাসের হার কম। সবচেয়ে ভালো করেছে যশোর বোর্ড। এরপর আছে রাজশাহী ও বরিশাল। এই তিন বিভাগের মধ্যে যশোরে গণিতে পাসের হার ৯৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ, রাজশাহীতে ৯৩ দশমিক ৭৪ ও বরিশালে ৯২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। আর নিচের দিকে থাকা কুমিল্লা বোর্ডে ৮৭ দশমিক ৯৬, মাদ্রাসা বোর্ডে ৮৭ দশমিক ৩৬ ও ঢাকা বোর্ডে ৮৭ দশমিক ৭২ শতাংশ। আর ইংরেজিতে গণিতের তুলনায় ফলাফল ভালো হলেও প্রায় একই চিত্র লক্ষ করা গেছে। এছাড়া সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছে মানবিক বিভাগ থেকে। মানবিকের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি ও গণিতে কিছুটা দুর্বল থাকার প্রভাব ফলাফলে পড়ে।

ফল প্রকাশের পর দেখা গেছে, পাসের হার ও জিপিএ ফাইভে ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে মেয়েরা। শুধুমাত্র চলতি বছর নয়, গত চার বছরের পরিসংখ্যানও বলছে মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে এক্ষেত্রে। ২০২৪ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ছেলেদের পাসের হার ৮১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। অন্যদিকে মেয়েদের পাসের হার ৮৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এ বছর সব শিক্ষা বোর্ডে মোট ছাত্রের চেয়ে ৫৯ হাজার ৪৭ জন বেশি ছাত্রী পাস করেছে। জিপিএ ৫-এর সংখ্যায়ও মেয়েরাই এগিয়ে রয়েছে। এবার ছাত্রদের চেয়ে ১৫ হাজার ৪২৩ বেশি ছাত্রী জিপিএ ৫ পেয়েছে।

এসএসসিতে তিনটি শাখার মধ্যে এ বছর বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন পাসের হার মানবিক বিভাগে। বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৯৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ, মানবিকে পাসের হার ৭৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ আর ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে পাসের হার ৮৩ দশমিক ২৯ শতাংশ। পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে যশোর বোর্ড। এ বোর্ডে পাসের হার ৯২ দশমিক ৩২ শতাংশ। আর সর্বনিম্ন পাসের হার সিলেট বোর্ডে, ৭৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এছাড়া ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৮৩ দশমিক ৯২ শতাংশ, বরিশালে ৮৯ দশমিক ১৩ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৮২ দশমিক ৮০ শতাংশ, কুমিল্লায় ৭৯ দশমিক ২৩ শতাংশ, দিনাজপুরে ৭৮ দশমিক ৪০ শতাংশ, রাজশাহীতে ৮৯ দশমিক ২৬ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৮৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ। আর মাদ্রাসা বোর্ডে পাসের হার ৭৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং কারিগরিতে পাসের হার ৮১ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

সারা দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হারের বিষয়ে সিলেট বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক অরুণ চন্দ্র পাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘পাসের হার কমার কয়েকটি কারণ আছে। তবে এর মধ্যে মানসম্মত শিক্ষকের অভাব আমার কাছে উল্লেখযোগ্য মনে হচ্ছে। বিশেষ করে গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে আরও মানসম্মত শিক্ষক পেলে ফলাফল আরও ভালো করা যেত।’

সবচেয়ে ভালো ফলাফল করা যশোর বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বিশ্বাস শাহিন আহম্মেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘যশোর শিক্ষা বোর্ডের প্রশ্নব্যাংক থেকে মানসম্মত প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক পরীক্ষা দেয়। এ কারণে বোর্ডের চূড়ান্ত পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের মুখোমুখি হওয়া তাদের জন্য সহজ হয়েছে।’ তিনি বলেন, শ্রেণিকক্ষে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের উপস্থিতি বেশি। পড়াশোনায় তারা মনোযোগীও তুলনামূলক বেশি। তা ছাড়া মেয়েদের এগিয়ে দিতে অভিভাবকরাও এখন বেশি সচেতন।

এ বছর একাধারে শতভাগ পাস ও শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দুই হাজার ৯৬৮টি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৩৫৯টি। বছরের ব্যবধানে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৬০৯টি। অন্যদিকে চলতি বছর একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫১টি। গত বছর সে সংখ্যা ছিল ৪৮টি। বছরের ব্যবধানে শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৩টি। শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিক্ষার্থীরা। বিকল্প পদ্ধতিতে কীভাবে এ সমস্যার সমাধান করা যায়, তা বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, যেসব স্কুলে শূন্য পাস সেখানে শিক্ষার্থী হয়তো একজন, দুজন বা দশজনের কম। এসব প্রতিষ্ঠান যদি এমপিও নেয় তবে তাদের পাশের স্কুলের সঙ্গে একীভূত করা যায় কি না সেটা ভাবা হচ্ছে।

কাঙ্ক্ষিত ফল না এলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন বা খাতা চ্যালেঞ্জ করতে পারবে। এ কার্যক্রম শুরু হবে আজ সোমবার থেকে, চলবে ১৯ মে পর্যন্ত।

আন্তঃশিক্ষাবোর্ডের সমন্বয়ক ও ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার সরকার বলেন, ফলাফলে কেউ সংক্ষুব্ধ বা অসন্তুষ্ট হলে সে চাইলে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করতে পারবে। অনলাইনের মাধ্যমে ঘরে বসেই সে এ আবেদন করতে পারবে। পরে বোর্ড তার খাতা যাচাই-বাছাই করে দেখে আবেদন নিষ্পত্তি করবে। শুধুমাত্র টেলিটক প্রি-পেইড মোবাইল ফোন থেকে পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করা যাবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত