লঘু অপরাধের অভিযোগে কোনো অপরাধীকে কারাগারে না পাঠিয়ে সংশোধনের সুযোগ প্রদান করার প্রক্রিয়াকে প্রবেশন বলা হয়। এতে প্রথম ও লঘু অপরাধে দণ্ডিত শিশু-কিশোর বা অন্য কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে কারাগারে না পাঠিয়ে আদালতের নির্দেশে শর্ত সাপেক্ষে প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে নিজ বাসায় বা পরিবারের সঙ্গে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়। প্রবেশন একটি সামাজিক সংশোধনী কার্যক্রম। কেউ যাতে পুনরায় অপরাধে না জড়ান এবং একজন আইনমান্যকারী নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠেন, প্রবেশনের মাধ্যমে সেই চেষ্টাই করা হয়।
প্রবেশন অব অফেন্ডার্স অর্ডিন্যান্স, ১৯৬০
দ্য প্রবেশন অব অফেন্ডার্স অর্ডিন্যান্স, ১৯৬০ (সংশোধিত ১৯৬৪)-এর আওতায় ক্ষমতাপ্রাপ্ত আদালত প্রথম ও লঘু অপরাধে জড়িত শিশু-কিশোর বা প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে শর্ত সাপেক্ষে প্রবেশন মঞ্জুর করতে পারে। তবে শিশু-কিশোরদের জন্য এই আইনি সুবিধা অগ্রাধিকার পায়। শিশু আইন ২০১৩-এর আওতায়ও শিশু-কিশোরেরা শিশু আদালতের মাধ্যমে প্রবেশন ব্যবস্থার সুযোগ পায়।
উপরোক্ত ২টি আইনের আওতায় বিজ্ঞ বিচারকদের সহায়তা করার জন্য, আদালতের শর্তাবলী যথাযথভাবে প্রতিপালিত হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য এবং তত্ত্বাবধান ও সংশোধনী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সমাজসেবা অধিদফতরের প্রবেশন অফিসারদেরকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
প্রবেশন সুবিধা কারা পান
প্রবেশন আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী, পুরুষ আসামিরা মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় কিছু অপরাধসহ কয়েকটি নির্দিষ্ট কয়েকটি ধারায় অপরাধের দণ্ড ব্যতীত যেকোনো দণ্ডের ক্ষেত্রে প্রবেশন পেতে পারেন। আর নারী আসামিরা মৃত্যুদণ্ড বাদে যেকোনো দণ্ডের ক্ষেত্রে প্রবেশন পেতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে অপরাধের প্রকৃতি, অপরাধীর চরিত্র এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনা করেন আদালত। এতে যদি আদালত এই অভিমত পোষণ করেন যে, উক্ত অপরাধী তাৎক্ষনিক শাস্তির পরিবর্তে প্রবেশন আদেশ প্রদান করা যায় তবে তাকে অন্যূন এক বছর ও অনধিক তিন বছরের জন্য একজন প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে রাখার আদেশ দিতে পারেন।
কীভাবে প্রবেশনের সুযোগ পাওয়া যায়
প্রবেশন মঞ্জুর করা আদালতের একটি স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা। বিচারকার্যের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর কোনো ব্যক্তি যখন আইনের দৃষ্টিতে দোষী সাব্যস্ত হন কিংবা ব্যক্তি যদি দোষ স্বীকার করেন, তখন আদালত প্রবেশনের সুযোগ দিতে পারেন। আইনের অধীন প্রবেশন আদেশের শর্তাবলি পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে দণ্ডিত ব্যক্তি সংশোধন ও পুনর্বাসনের দ্বারা উপকৃত হতে পারে, এমনটা প্রতীয়মান হলে আদালত প্রবেশনের আদেশ দিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে অপরাধীর চরিত্র, প্রাক-বংশপরিচয়, পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা তদন্ত করে প্রবেশন কর্মকর্তাকে আদালতের কাছে একটি প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়। তদন্ত করে প্রবেশন কর্মকর্তা যদি বুঝতে পারেন, অপরাধীর প্রবেশনের বা সমাজভিত্তিক সংশোধনের সুযোগ রয়েছে, তাহলে তিনি প্রবেশনের সুপারিশ করেন। অন্যথায় অপরাধীকে শাস্তি পেতে হয়। আদালত মামলার কাগজপত্র ও সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করে নিজ উদ্যোগেও প্রবেশন মঞ্জুর করতে পারেন।
আইনে প্রবেশনে থাকাকালে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সদাচরণকে। তবে আইনে সদাচরণের নির্দিষ্ট কোনো কিছু উল্লেখ না থাকলেও আদালত ব্যক্তিকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানা, বই পড়া, বাবা-মায়ের সেবাযত্ন, হাসপাতালে রোগীর যত্ন, গাছের চারা রোপণ, ধর্মীয় উপাসনা, ফুলের বাগান পরিচর্যা, স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের মতো শর্ত ও নির্দেশনা দেন। প্রবেশনপ্রাপ্ত ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট এলাকার সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন কর্মকর্তার নজরদারি ও তদারকিতে থাকেন। কর্মকর্তারা ব্যক্তির গতিবিধি, আচরণ ও আদালতের শর্ত পালন নিয়ে আদালতে প্রতিবেদন দেন।