শুক্রবার, ৩১ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বয়কট কি কাজ করে?

আপডেট : ১৫ মে ২০২৪, ০৬:০৫ পিএম

২০০৩ সালে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাকের বিরুদ্ধে একতরফা বিতর্কিত এক যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর তাদের প্রায় দুই’শ বছরের পরীক্ষিত মিত্র ফ্রান্স, সে যুদ্ধে যোগ দিতে অস্বীকার করে। ফ্রান্সের এই ঘোষণা আমেরিকার কাছে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত হয়ে এল। স্বাভাবিকভাবেই ফ্রান্সের এই সিদ্ধান্তে আমেরিকার রাজনীতিবিদেরা খুশি হন নি।  ফ্রান্স সরকারের ওপর কিভাবে প্রতিশোধ নেওয়া যায় সেই উপায় খুঁজছিলেন তারা। যেহেতু ফ্রান্সের উৎপাদিত মদ ও বোতলজাত পানি আমেরিকানদের বিশেষ প্রিয়; ফলে রাজনীতিবিদেরা এই সুযোগ লুফে নিলেন। রাজধানী ওয়াশিংটন এবং সারা দেশের মানুষকে ফ্রান্সের তৈরি মদ ও বোতলজাত পানি বর্জনের ডাক দিলেন। 

ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান নেতা ব্রুস চান্ডলেরের সেই ডাক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল সারা দেশে। আমেরিকার বাজারে ফ্রান্সের তৈরি পণ্য দুটির চাহিদা রাতারাতি ২৬ ভাগ কমে গেল। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে ফ্রান্সের উৎপাদিত পণ্য কিংবা দুই দেশের রাজনৈতিক বন্ধুত্ব- উভয় ক্ষেত্রে সেই বয়কটের প্রভাব ছিল সামান্য।। নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ট্রাপ্রেনরশিপ বিভাগের অধ্যাপক ল্যারি শেভিজ তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, মাত্র ছয় মাসের মাথায় আমেরিকার বাজারে দুটি পণ্যেরই বিক্রির পরিমাণ আগের জায়গায় ফিরে গেছে। সে সময় ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা বিল গ্র্যান্ট মোক্ষম এক কথা বলেছিলেন, যেটি বয়কটের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার সূত্রপাত করে। তিনি বলেছিলেন, ‘ফ্রান্সের উৎপাদিত মদ বয়কটের ডাক মূলত: বাজারে ওয়াশিংটনের নিজেদের উৎপাদিত মদ বেচার পাঁয়তারা ছাড়া আর কিছুই নয়।’ 

এবার আরেকটি ভিন্ন ধরনের বয়কটের দিকে নজর ফেরানো যাক।

গত বছরের অক্টোবরের ৭ তারিখে হামাসের হামলার জবাবে ইসরায়েল যখন গাজায় আক্রমণ শুরু করে, তখন ২০০৫ সালে সূত্রপাত হওয়া একটা পুরোনো আন্দোলন নতুন করে সামনে আসে। সেটি হল ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা, ন্যায্যতা এবং সমতা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষের লোকজন ইসরায়েলের সঙ্গে সংযোগ আছে, এমন সব পণ্য বর্জনের ডাক দেয়। হামাস কর্তৃক ইসরাইলে হামলার ছয় মাস পরে দেখা যাচ্ছে, সেই ডাক বেশ ভালোই কাজ করেছে! বিশ্বখ্যাত কফিশপ ‘স্টারবাকস’ তার বড় উদাহরণ। ডিসেম্বরের ৮ তারিখে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন বলছে, বয়কট ডাকের দুই মাসের মাথায় স্টারবাকসের বাজার মূল্য টানা ১২ দিন ধরে অন্তত ১১ বিলিয়ন ডলার কমেছে; যেটি কোম্পানিটির মোট বাজার মূল্যের ১০ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিষয়ক অধ্যাপক কিথ হিলটন মনে করছেন, ‘নানা কারণেই কোনো বিশেষ পণ্যের বাজার মূল্য কমতে পারে; তবে বয়কটও যে সেসব কারণের একটি হতে পারে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।’

ওপরের দুটি ঘটনা থেকে আমরা কি বুঝতে পারছি? বয়কট কি কাজ করে? আবার এই প্রশ্নও করা যেতে পারে যে, বয়কট কি শুধুই অর্থনৈতিক? নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য? এই লেখায় সেসব প্রশ্নের উত্তর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা যেতে পারে। 

বয়কট নতুন কোনো ধারণা নয়

ইংরেজি শব্দ বয়কটের আভিধানিক অর্থ বর্জন করা; একঘরে করা; কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দেশের সঙ্গে সকল সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা। তবে ইংরেজি বয়কট শব্দটা শুনলে যতটা কঠোর শোনায়, সে তুলনায় বাংলা শব্দগুলো বেশ রাশভারী। এই শব্দটি অভিধানে আসার পেছনে রয়েছে এক ইংরেজ ভদ্রলোক ও তার সম্পর্কিত মজার এক ইতিহাস। ভদ্রলোকের নাম নাম চার্লস কানিংহাম বয়কট (১৮৩২-১৮৯৭)। তাঁর কীর্তিকলাপের জন্য আয়ারল্যান্ডের মায়ো কাউন্টির বর্গাচাষিসহ স্থানীয় লোকজন তাকে একঘরে করছিলেন। 

১৮৮০ সালের ঘটনা। চার্লস কানিংহাম বয়কট ছিলেন এক ইংরেজ ভূমি মালিকের প্রতিনিধি। মায়ো কাউন্টির খাজনা আদায়ের দায়িত্ব ছিল তাঁর। সে বছর ফসলের ফলন কম হওয়ায় চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছিলেন। সে আশঙ্কা আমলে নিয়ে জন ক্রিকটন ১০ শতাংশ খাজনা মওকুফের ঘোষণা দিলেন। কিন্তু চাষিরা দাবি তোলেন ২৫ শতাংশ মওকুফের। ভূমি মালিক চাষিদের দাবি অগ্রাহ্য করেন। বয়কট আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে এক কাণ্ড ঘটান। তিনি ১১ জন বর্গাচাষিকে উচ্ছেদের চেষ্টা করেন। সরব হয়ে ওঠে স্থানীয় লোকজন। দিনমজুরেরা কাজ বর্জন করেন। ব্যবসায়ীরা সম্পর্ক ছিন্ন করতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে সর্বস্তরের মানুষ তাতে যুক্ত হতে থাকে। এক সময় দেখা যায়, স্থানীয় ডাকঘরের পিয়নও চিঠি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। বয়কট চেষ্টা করেন অন্য এলাকা থেকে লোক এনে চাষবাসের কাজ করানোর। সে উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকেন বয়কট। এই ঘটনা তখন ব্যাপকভাবে জানাজানি হয়, ফলাও করে প্রচার করা হয় গণমাধ্যমে। বর্জন ও একঘরের সমার্থক হয়ে ওঠেন ‘বয়কট’, যা কালক্রমে যুক্ত হয় অভিধানেও। 

যুগে যুগে বয়কট

এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বয়কট শব্দটিও জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকে। এর মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। দীর্ঘদিন (১৯৪৮-১৯৯৪) ধরে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ প্রভেদ দক্ষিণ আফ্রিকাকে পৃথক করে রাখে। ১৯৫৯ সালে শুরু হওয়া বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন ক্রমে বয়কট আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা দক্ষিণ আফ্রিকার পণ্য বয়কট করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রায় ৩৫ বছরব্যাপী চলমান সেই আন্দোলনে স্লোগান ছিল ‘লেবেল দেখে কিনুন’। এই আন্দোলনের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী, ক্রমে দেশের অভ্যন্তরে সেই আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে। প্রবল গণ জোয়ারের চাপে, ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকার ভেঙে পড়ে। 

বয়কট ইতিহাসের অভিযাত্রায় আরও একটি ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। 

১৮ বছর বয়সী কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক গায় বেয়লি বাস কন্ডাক্টর পদে চাকরির জন্য একটি সাক্ষাৎকারে হাজির হন। কিন্তু ব্রিস্টল অমনিবাস কোম্পানি কৃষ্ণাঙ্গ কর্মচারীদের নিয়োগ দিতে অস্বীকার করে। প্রতিবাদে ১৯৬৩ সালের এপ্রিল মাসে ব্রিস্টলে বয়কট আন্দোলন শুরু হয়। বর্ণবাদী নীতিকে চ্যালেঞ্জ করে চলা আন্দোলনের কয়েক মাসের মধ্যে বাস কোম্পানি তাদের নীতিতে পরিবর্তন আনে। প্রথমবারের মত রঘু বীর সিং নামক একজন অশ্বেতাঙ্গকে বাস কন্ডাক্টর হিসেবে নিয়োগ দেয় তারা। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে এই আন্দোলনকে যুক্তরাজ্যের প্রথম জাতি সম্পর্ক আইন ১৯৬৫ এর প্রধান প্রভাবক বলেও মনে করা হয়, যা জনসমক্ষে বৈষম্য নিষিদ্ধ এবং কোন ব্যক্তিকে তার "বর্ণ, জাতি, বা জাতিগত বা জাতীয় উৎসের" ভিত্তিতে ঘৃণা করাকে বেআইনি হিসেবে ঘোষণা করে।

পৃথিবীটা যখন ছোট হতে হতে মুঠোফোনে এসে বন্দী

একটু ভালো করে তাকালে দেখা যায়, সারা পৃথিবী যেন যুদ্ধ-হত্যা-সংঘর্ষে ডুবে আছে। গাজা থেকে মিয়ানমার, কাশ্মীর থেকে আফগানিস্তান, পাপুয়া নিউগিনি থেকে হাইতি, সোমালিয়া থেকে সাউথ সুদান, কিংবা ইউক্রেন থেকে রাশিয়া- প্রতিদিনই হত্যা আর দখলদারির খবর। পরিসংখ্যান বলছে, এই মুহূর্তে দুনিয়ার নানা প্রান্তে অন্তত ৩৬টি যুদ্ধ চলমান। এর বাইরে আছে জোর করে ক্ষমতা দখল করে রাখা, অবৈধ দখলদারি, একনায়কতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা।

পৃথিবীব্যাপী চলমান নৈরাজ্য ও দখলদারির খবরে মানুষ প্রভাবিত হয়। কোনো কোনো খবরে যেমন ক্ষুব্ধ হয়, আবার কোনো খবর হয়তো তাকে ভাবা ক্রান্ত করে। ফলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল অবস্থানে থেকেও ‘কিছু না কিছু করার’ উপায় খুঁজতে থাকে। কেউ ছোট কিছু করার কথা যেমন ভাবে, আবার কেউ কেউ বড় কিছু করার কথাও চিন্তা করে। এক দেশের নাগরিক অন্য দেশে গিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা তো অহরহ শুনতে পাই আমরা। অন্তর্জালের প্রসার এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে সেসব খবর মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে খুলনার কয়রার প্রান্তিক জনপদে বাস করা জনৈক আবুল খায়েরও তার হাতের মোবাইল ফোনটির সৌজন্যে ফিলিস্তিনের গাজার রাস্তায় পড়ে থাকা মৃত শিশুটির জন্য হাহাকার করে। তার মন বিক্ষুব্ধ হয়। ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়ানোর উপায় খুঁজতে থাকে সে।

বয়কট যখন বাংলাদেশে: শুধুই কি পণ্যের দখলদারির বিরোধিতা?

সম্প্রতি বাংলাদেশে এসে বয়কট এক ভিন্ন মাত্রা নিয়েছে। এ বছরের জানুয়ারি মাসের ৭ তারিখে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে। কয়েক মাস আগে থেকে সকল রাজনৈতিক দলকে (মূলত: বিএনপিকে) অন্তর্ভুক্ত করে নির্বাচন আয়োজনের জন্য নানা তোড়জোড় শুরু হয়। ঢাকায় নিয়োজিত আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ছিলেন এই দলের অগ্রগামীদের একজন। কিন্তু নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে হঠাৎ করে তিনি ছুটিতে চলে যান। কোনো ধরনের প্রতিরোধ ছাড়া সরকার আয়োজিত আরও একটি নির্বাচন সংগঠিত হয় এবং অনুমিতভাবে সেখানে আওয়ামী লীগ ও তাদের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় লাভ করেন। 

সে সময় রাজনৈতিক মহলে এই খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, হঠাৎ করে নির্বাচনের ঠিক আগে আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের চুপ হয়ে যাওয়া এবং দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পেছনে মূলত: ভারতের প্রভাব কাজ করেছে। এটি যে নিছক ধারণা নয়; বরং এর পেছনে সত্যতা যে রয়েছে সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কথা থেকে তার প্রমাণ মেলে। গত ২৮ জানুয়ারি ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার সঙ্গে এক বৈঠকের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ দেশে কিছু কিছু অপজিশন কোনো কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে মিলিত হয়ে আমাদের এখানে অস্থিতিশীল করতে চেয়েছিল। নির্বাচনটাকে ভন্ডুল করতে চেয়েছিল, সে সময় ভারত আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। সে কথা আমাদের স্বীকার করতেই হবে।’

তখন থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি (যারা মূলত:সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েঞ্জার হিসেবে পরিচিত) নির্বাচনে ভারতের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ হয়ে ‘ইন্ডিয়া আউট’ নামে একটি প্রচারাভিযান শুরু করে। তারা যে খুব সংগঠিত কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলের একনিষ্ঠ সমর্থক, সেটি প্রমাণিত না হলেও তাদের বক্তব্য পর্যালোচনা করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, তারা সবাই সরকারবিরোধী। এ বিষয়ে তারা ক্রমাগত পোস্ট ও ভিডিও বানাতে থাকেন। সেসব পোস্ট ও ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। 

প্রশ্ন হলো, চার মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই আন্দোলনের প্রভাব কতটুকু পড়েছে?

বাংলাদেশের বাজারে ভারতের পণ্য প্রবেশে কতটা প্রভাব পড়ছে সে বিষয়ক যথাযথ পরিসংখ্যান না পাওয়া গেলেও ভারতসহ নানা দেশের প্রচারমাধ্যমে এ বিষয়ক খবর বেশ ভালোভাবেই চাউর হয়েছে। ভারতের প্রধান প্রধান সংবাদমাধ্যমগুলো এ বিষয়ে অনবরত খবর প্রকাশ করেছে। সেসব খবরে মূলত বয়কটের পেছনের কুশীলব হিসেবে বিএনপিকে দায়ী করা হয়েছে। যদিও বিএনপি এই আন্দোলনের সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেনি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিবেচনায় বাংলাদেশে কি ভারতের পণ্য বয়কট আসলেই সম্ভব?

বাংলাদেশ যেন ভারতের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার

পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৫ বছরে ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই বহুগুণে বেড়েছে। সরকারি হিসাবে ২০০৮ সালে ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানি ছিল ২০০ কোটি ডলার, যা এখন দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলার এবং বাংলাদেশ এখন ভারতের চতুর্থ শীর্ষ রপ্তানির বাজার। আবার সরকারিভাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত গ্যাস আমদানি প্রায় শূন্য থেকে শত কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর বাইরে আছে সীমান্ত হাট, যার বাণিজ্যিক মূল্য অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ফেলো জয়শ্রী সেনগুপ্তর হিসাব অনুযায়ী বছরে আনুমানিক শত কোটি ডলার।

দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের এসব পরিসংখ্যানের বাইরে আছে চিকিৎসা ও বিনোদনমূলক ভ্রমণে বাংলাদেশিদের ভারতমুখীতা। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টুরিজম অ্যান্ড ট্রাভেল ম্যানেজমেন্টের ২০২৪ সালের হিসেব বলছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশিদের ভারতে যাওয়ার পরিমাণ ছিল প্রায় ১৬ লাখ। যা আগের বছরের চেয়ে ৬৪ ভাগ বেশি, যাঁদের প্রায় ৮০ ভাগই গেছেন পর্যটন ভিসায় এবং ১০ ভাগ চিকিৎসা ভিসায়। এসব বাংলাদেশিরা গড়ে মাথাপ্রতি ৬০ হাজার রুপি খরচ করেছেন, যার ফলে ডলারে মোট ব্যয় শত কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

সর্বসাম্প্রতিক সংখ্যা না জানা গেলেও, ভারতের সরকারি হিসাবে দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে ভারত ভ্রমণকারী বিদেশিদের শীর্ষে আছে বাংলাদেশিরা। এ ছাড়া দেশটিতে মাধ্যমিক স্তরের স্কুল থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার জন্য হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী প্রতিবছর পড়তে যাচ্ছে, যাদের পড়াশোনার খরচ, আবাসন ব্যয় এবং অন্যান্য খাতে বিপুল পরিমাণে ডলার খরচ হচ্ছে। 

বাংলাদেশে ভারত বিরোধিতা কি কেবলই পণ্য বর্জনের ডাক?

তবে বাংলাদেশে ভারত বিরোধিতাকে শুধুই দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে ভারতের হস্তক্ষেপকেন্দ্রীক সংজ্ঞায়িত করা উচিত হবে না। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক সংযোগ রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী। বাকি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের বৈরী সম্পর্ক মোটামুটি সবারই জানা। আগে শুধু পাকিস্তান এই তালিকায় অগ্রগণ্য থাকলেও সম্প্রতি নেপাল ও মালদ্বীপে ভারত বিরোধিতা প্রকটভাবে সামনে এসেছে। মালদ্বীপে নব নির্বাচিত সরকারের প্রচারের মূল লক্ষ্যই ছিল ‘বয়কট ভারত।’ সেই ডাক যে কাজে লেগেছে তার প্রমাণ হলো, নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট মইজ্জু ও তার দল ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করেছেন।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বন্ধুত্ব পুরোনো এবং গভীর। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত বাংলাদেশের পক্ষ নিয়েছিল। সে সময় বাংলাদেশিদেরই বড় একটা অংশ পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। সে সময় থেকেই ভারত বিরোধী তার বীজ বাংলাদেশে বিস্তার হয়ে আসছে। ফলে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সংকট সামনে এলেই বাংলাদেশে ভারত বিরোধী তার জন্য লোকের অভাব হয় না।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় চার হাজার কি.মি। দীর্ঘদিন সীমান্তে ভারত কর্তৃক একতরফা হত্যাকাণ্ড হয়ে আসছে। দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েনের পাশাপাশি জনমনে এই নিয়ে আছে ব্যাপক বিতৃষ্ণা। সম্প্রতি এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ক্রিকেট। দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রিকেট এখন ধর্মীয় উন্মাদনার চেয়ে কম নয়। ক্রিকেটে ভারতের আধিপত্য, কয়েকটি ম্যাচে বিতর্কিত আম্পায়ারিং বিশাল এক তরুণ সমর্থকগোষ্ঠীর ভারতের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা, প্রয়োজনের সময় পেঁয়াজ ও অন্যান্য পণ্য রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়াসহ আরও নানা কর্মকাণ্ড।

গত ১৫ বছর ধরে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। এ সময়ে বিজেপি ও কংগ্রেস দুটো দলই ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতার প্রশ্নে কোনো দলেরই নীতির পরিবর্তন হয়নি। ভারত যে বাংলাদেশের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করে যাচ্ছে এটি ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির বইসহ দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বক্তব্যে উঠে এসেছে। ফলে সরকার বিরোধী সমর্থকদের মধ্যে ভারত বিরোধিতা প্রকটভাবে দানা বেঁধেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাতিল করে দেওয়াতেই কি সমাধান?

বয়কটের সংস্কৃতি কি বিপজ্জনক?

বোস্টন ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের অধ্যাপক স্টিভেন আরিগ কোহ ২০২২ সালে ‘ক্যান্সেল কালচার অ্যান্ড ক্রিমিনাল জাস্টিস’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন যে, যদিও ‘ক্যান্সেল কালচার বা বয়কটের সংস্কৃতি’ নতুন কোনও বিষয় নয়, তবে  ২০১৬ সাল থেকে এটি বড় করে সামনে এসেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ‘পাবলিক শেইমিং। তবে আগের চর্চার সঙ্গে বর্তমানের চর্চার পার্থক্য হলো, এখন গোটা প্রক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করা হচ্ছে।। যদিও এক সময় উন্নত বিশ্বে উগ্র, বর্ণবাদী ও লিঙ্গবৈষম্যকারীদের বিরুদ্ধে এর প্রয়োগ বেশি দেখা যেত, কিন্তু এখন কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে এটি বেশি প্রয়োগ হচ্ছে।

এ বিষয়ে আমেরিকার বিখ্যাত আইনজীবী ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিষয়ের অধ্যাপক এলান ডেয়ারশোভিৎস উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন। তার একটি বিখ্যাত বইয়ের নাম ‘দ্য ক্যান্সেল কালচার: দ্য লেটেস্ট অ্যাটাক অন ফ্রি স্পিচ অ্যান্ড ডিউ প্রসেস’। এই বইয়ে তিনি ক্যান্সেল কালচার বা বয়কটের সংস্কৃতিকে ‘নয়া ম্যাককার্থিবাদ’ এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। জোসেফ ম্যাককার্থি ছিলেন আমেরিকার উইসকনসিনের সিনেটর। এই সিনেটর তাঁর মেয়াদে বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ‘কমিউনিস্ট পার্টি’র সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলেছিলেন। তাঁর সেই সব কার্যক্রম তখন টিভিতেও প্রচার করা হতো। যদিও তাঁর সেই সব অভিযোগ ছিল ভিত্তিহীন। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জীবন জোসেফ ম্যাককার্থি দুর্বিষহ করে তুলেছিলেন। 

ওদিকে কে কাকে কেন এবং কতটুকু বয়কট করবে সেটা কি পরিমাপ করা সম্ভব? অন্তর্জালই যখন বয়কট কর্মসূচি বিস্তারের মূল মাধ্যম, ফলে কোনো কিছুই কার্যত এখান থেকে মুছে ফেলা সম্ভব না। অথচ এরই মধ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সবাই মিলে নির্দ্বিধায় ‘লঘু পাপে গুরু দণ্ড’ বা ‘গুরু পাপে লঘু দণ্ড’ দিয়ে দিয়েছে।

আবার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জনপ্রিয়তা, তার বিরুদ্ধে প্রচারের ধরন ও ব্যাপকতার ওপর ভিত্তি করে একই ধরনের অভিযোগের জন্য ব্যক্তিভেদে আলাদা সাজা হচ্ছে। ফলে যে কাউকে যেকোনো সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘জনগণের আদালতে’ দাঁড়াতে হচ্ছে এবং কোনো ধরনের অপরাধ না করেও তার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। এটি এমন এক ‘আদালত’ যেখানে কোনো বিচারিক নিয়ম নেই, কোনো ক্ষমা নেই; কিন্তু অসীম ক্ষমতা আছে। এখানে কোনো ধরনের তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই কাউকে আক্রমণ করা যায়। আক্রমণের শিকার ব্যক্তির জীবনে যাই ঘটুক না কোনো তার জন্য আক্রমণকারীকে কোনো দায়িত্ব নিতে হয় না।

দেখা যাচ্ছে, বয়কটের সংস্কৃতি শুধু বেআইনিই নয়; বরং অন্যায্যভাবে কারও বিপন্ন করে তোলার জন্যে মোক্ষম অস্ত্র!

বয়কটে কি কাজ হয়?

এত সব আলোচনা শেষে এখন এ প্রশ্নটা করা যেতে পারে যে, বয়কট কাজ করে কিনা! 

উপরে দেওয়া উদাহরণ কিংবা অতীতে ঘটে যাওয়া নানাবিধ ঘটনার দিকে তাকালে এটি স্পষ্ট হয় যে, ভালো কিংবা মন্দ- যাই হোক না কেন, বয়কট কাজ করে। কখনো এর প্রভাব স্বল্প মেয়াদি হতে পারে, আবার কখনো বয়কটের প্রভাব তীব্র ও দীর্ঘ সময়ব্যাপী থাকতে পারে। তবে বয়কট যেহেতু প্রবলভাবে রাজনৈতিক, এ বিষয়ে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন জরুরি। কেউ বয়কটের ডাক দিলেই তাতে গা না ভাসিয়ে যাচাই-বাছাই করা জরুরি। সেই প্রয়োজন থেকেই এখন ‘ফ্যাক্ট চেকে’র মত প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। 

ফোর্বস ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক নিবন্ধে জেনিস ঘাসাম আসারি লিখেছেন, ‘যে কোনও বিষয়ে প্রতিবাদের একমাত্র উপায় কখনোই বয়কট হতে পারে না; বরং যে কোনও বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে লোকজনকে অবহিত করতে পারলে তা বয়কটের চেয়েও ভালো কাজ দিতে পারে।’ 

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিষয়ের অধ্যাপক এরিকা শানায়েত তার এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, ‘যে কোনও আন্দোলনে যদি দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র সাড়ে তিন ভাগকে যুক্ত করা যায়, তাহলে বড়সড় রাজনৈতিক পরিবর্তন আনা সম্ভব। হোক সেটা সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন কিংবা পণ্য বর্জনের মত কর্মসূচি। তাই আসারির লেখা একটি লাইন দিয়ে এই লেখাটিও শেষ করা যেতে পারে। তার মতে, ‘কোনো কাজই খুব ছোট নয়, একটি পাথর তা যতই ছোট হোক, মুক্তির পুকুরে নিক্ষেপ করা হলে তার থেকে যে লহরি সৃষ্টি হয়, আগত দিনে সামাজিক পরিবর্তন সাধনে তার অবদান অসামান্য।’

লেখক: অনুবাদক, উন্নয়নকর্মী। বর্তমানে বেলজিয়ামে ‘উন্নয়ন নীতি ও ব্যবস্থাপনা’ নিয়ে পড়ছেন। 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত