দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর খুলছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই বাংলাদেশি কর্মীদের প্রথম ব্যাচ মালয়েশিয়ায় যেতে শুরু করবে এমন খবরে অভিবাসন খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উচ্ছ্বাস বিরাজ করছে। তবে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে নতুন করে সিন্ডিকেটের থাবা ও তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর জন্য তৎকালীন মন্ত্রী-এমপিদের মালিকানাধীন এজেন্সি নিয়ে গড়ে ওঠে সিন্ডিকেট। তারা নানা অনিয়ম করায় ২০২৪ সালের ১ জুন থেকে বন্ধ হয়ে যায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। এখন সরকার পরিবর্তনের পর বিএনপিদলীয় এমপিদের মালিকানাধীন এজেন্সিসহ প্রভাবশালীদের সমন্বয়ে ২৫ সদস্যের নতুন সিন্ডিকেট গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। দলের প্রভাবশালী ও মন্ত্রণালয়কেন্দ্রীক কয়েকজন এর সঙ্গে জড়িত। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে কোনো সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার সুযোগ রাখা হয়নি। স্বচ্ছতার ভিত্তিতে কম খরচে কর্মী পাঠানো হবে। এটাই সরকারের অঙ্গীকার।’
বায়রার সদস্যদের অভিযোগ, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য নতুন করে বিএনপির পাঁচ এমপি ও এক নেতার মালিকানাধীন এজেন্সিসহ প্রভাবশালীদের ঘনিষ্ঠ ২৫টি এজেন্সি নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। অথচ তুলনামূলক কম খরচে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য এটি উন্মুক্ত থাকা উচিত, যাতে যে কেউ কর্মী পাঠাতে পারে। তারা জানান, সিন্ডিকেটে বিএনপির পাঁচ এমপি ও এক প্রভাবশালী নেতাকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চলছে। এর মধ্যে সংসদ সদস্য সফিকুর রহমান কিরণের এজেন্সির ‘মেটকো এন্টারপ্রাইজ’, আলী আজগর লবীর ‘রুপসা এন্টারপ্রাইজ’, জাহাঙ্গীর বিশ্বাসের ‘এয়ার ওয়ে ইন্টারন্যাশনাল’, শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের ‘আলম সন্স লিমিটেড’, খন্দকার আবু আসফাকের ‘খন্দকার ওভারসীজ’ ও বিএনপি নেতা গফুর ভূইয়ার ‘সুরমা ইন্টারন্যাশনাল’ রয়েছে।
বায়রার সদস্যরা বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সিন্ডিকেটে জড়িত থাকায় আদালতে অভিযুক্ত রুহুল আমিন স্বপনের লাইসেন্স বাতিল করেছে মন্ত্রণালয়। কিন্তু একটি চক্র উঠেপড়ে লেগেছে তার লাইসেন্স রক্ষায়। সরকারের একটি অংশ এর সঙ্গে জড়িত। এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি সম্পূরক চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। সেখানে তার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যাতে রুহুল আমিন স্বপন মালয়েশিয়ায় কর্মী নেওয়া শুরু হলে জনশক্তি রপ্তারি করতে পারে। এর সঙ্গে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কেউ অথবা সরকারে থাকা কারও ইন্ধন থাকতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ২৫ জনের সিন্ডিকেটে থাকা একজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটি চক্র ২৫ জনের সিন্ডিকেট গড়তে চাইছে। সিন্ডিকেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য ৫ মিলিয়ন মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত (প্রায় ১৭ কোটি টাকা) পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছে। এজেন্সি মালিক কয়েকজন এমপি, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট মহলের কতিপয় ব্যক্তিকে সম্পৃক্ত করে পূর্ববর্তী সিন্ডিকেটের হোতারাই নতুন করে এই সিন্ডিকেট গঠনের চেষ্টা করছেন। এর সঙ্গে আওয়ামী লীগপন্থি কিছু ব্যক্তিও নামে-বেনামে যুক্ত রয়েছেন। এর পেছনে মূল কারিগর হিসেবে কাজ করছেন মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত দাতুশ্রী আমিন নূর ও রুহুল আমিন স্বপন। এখানে সিন্ডিকেট হলে ২৫টি লাইসেন্সের অন্তর্ভুক্তিতে প্রথমেই ১৭ কোটি টাকা করে মোট ৪২৫ কোটি টাকা পাচার হবে। তাদের মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ কর্মী যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে এ খাতে পাচার হবে আরও প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। রেমিট্যান্স আসা শুরু হবে পরে। এর আগেই দেশ থেকে বড় অঙ্কের টাকা পাচার হয়ে যাবে।
বিএনপিদলীয় এমপি ও নেতারা অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত জুন মাসে মালয়েশিয়া সফর করেছেন। দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। প্রধানমন্ত্রী চান স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে। যারা এটি চান না, তারা সরকারের উদ্যোগকে বিতর্কিত করতে এমন কথা বলছেন। আসলে এসব অভিযোগ সঠিক নয়। নতুন করে সিন্ডিকেট করার সুযোগ নেই। কেউ এমনটা করতে চাইলে আমরা তার সঙ্গে থাকব না। কারণ আমরা নিজ এলাকার মানুষকে পাঠাব। তাদের কাছ থেকে বেশি টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই।
বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য সফিকুর রহমান কিরণ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত বছর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে এজেন্সি মালিকদের কাছে আবেদন আহ্বান করে। তাতে ১০টি ক্রাইটেরিয়া দেওয়া হয়। এগুলো যারা দিতে পেরেছে, তাদেরকে সরকার অনুমতি দিয়েছে। আমিসহ ৪২৩ জনকে মন্ত্রণালয় অনুমতি দিয়েছে। এখানে সিন্ডিকেশনের সুযোগ নেই। তবে এই তালিকা তৈরি করতে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের স্বচ্ছতা ছিল কি না, তার তদন্ত হতে পারে। আমিও চাই স্বচ্ছতা, যাতে কর্মীরা কম টাকায় মালয়েশিয়া যেতে পারেন। স্বচ্ছতা না থাকলে ব্যয় বাড়বে।’
জানা গেছে, মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ১০টি নির্ধারিত ক্রাইটেরিয়ায় রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা করার ঘোষণা দেয়। এ নিয়ে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়। কিন্তু ওই সময় ১০টি নির্ধারিত ক্রাইটেরিয়ার মধ্যে সাতটি পূরণকারী ২৬০টি এবং ছয়টি পূরণকারী ১৬৩টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করা হয়। তখন তিন থেকে চারটি ক্রাইটেরিয়া শিথিল করে মোট ৪২৩টি এজেন্সিকে নির্বাচন করা হয়। অথচ শুরুতে সব এজেন্সিকে ১০টি ক্রাইটেরিয়া পূরণ করেই আবেদন করতে বলা হয়েছিল। পরে ক্রাইটেরিয়া শিথিল করা হলেও এ বিষয়ে কোনো প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি এবং অন্যান্য বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিকে পুনরায় আবেদন করার সুযোগও দেওয়া হয়নি। ফলে প্রায় ২ হাজার বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বর্তমান সরকার নীতিগতভাবে পূর্বের ১০১ এজেন্সির সিন্ডিকেট-সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুন করে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও সমঅধিকার ভিত্তিক একটি তালিকা করার দাবি জানিয়েছেন এজেন্সি মালিকরা।
যেভাবে শুরু মালয়েশিয়ার সিন্ডিকেটের : ২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য মাত্র ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি নির্দিষ্ট বলয় (সিন্ডিকেট) তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় স্থগিত হওয়া শ্রমবাজার পুনর্ব্যক্ত করতে গিয়ে ২০২২ সালে ২৫টি এবং পরবর্তীতে তা বাড়িয়ে ১০১টি এজেন্সিতে উন্নীত করা হয়। তবে অভিযোগ থাকে যে, প্রায় দেড় হাজার বৈধ এজেন্সির মধ্যে মাত্র এই নির্দিষ্ট কয়েকটি এজেন্সির হাতে পুরো বাজারটি কুক্ষিগত রাখা হয়। এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যে মালয়েশিয়াভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান (যেমন আইটি সিস্টেম সরবরাহকারী) ও বাংলাদেশের প্রভাবশালী রাজনীতিক ও জনশক্তি রপ্তানিকারকদের যোগসাজশের অভিযোগ ওঠে।
এদিকে মালয়েশিয়া শ্রমবাজার নিয়ে গঠিত চক্রে ঢুকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত আওয়ামী লীগের চার সাবেক সংসদ সদস্যের (এমপি) এজেন্সিসহ মোট ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করেছে সরকার। আদালতে এসব এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জশিট) গৃহীত হওয়ায় গত ১৯ জুলাই রবিবার প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে লাইসেন্স প্রত্যাহারের কথা জানানো হয়েছে। বাতিল হওয়া এজেন্সির মধ্যে আছে আওয়ামী লীগের সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তাফা কামালের স্ত্রী ও মেয়ের মালিকানাধীন দুটি এজেন্সি অরবিটালস এন্টারপ্রাইজ ও অরবিটাল ইন্টারন্যাশনাল। ঢাকা-২০ আসনের সংসদ সদস্য বেনজীর আহমেদের আহমেদ ইন্টারন্যাশনাল, ফেনী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীর স্নিগ্ধা ওভারসিজ লিমিটেড এবং ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদউদ্দিন চৌধুরীর ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল। এর মধ্যে আরও আছে জনশক্তি খাতের আলোচিত ব্যবসায়ী নূর আলীর ইউনিক ইস্টার্ন প্রাইভেট লিমিটেড এবং মালয়েশিয়া সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য রুহুল আমিন ওরফে স্বপনের ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনাল।
এদিকে চলতি মাসে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। গত ৩০ জুলাই কুয়ালালামপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে খুলে গেছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। দুই দেশের ঐকমত্যের ভিত্তিতে সব খাতের শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই বাংলাদেশি কর্মীদের প্রথম ব্যাচ মালয়েশিয়ায় যেতে শুরু করবে। একই সঙ্গে আগের সিন্ডিকেট ও অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো নতুন তালিকায় রাখা হবে না।’
তিনি বলেন, ‘যারা ফ্যাসিবাদী কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত, যারা অনৈতিক কর্মকা- করেছিল, যারা সিন্ডিকেটের অংশ ছিল, তাদের কেউ নতুন তালিকায় থাকবে না। মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিষয়টি নিশ্চিত করবে।’ মাহদী আমিন বলেন, ‘আগস্টের শেষ সপ্তাহ নাগাদ বাংলাদেশি কর্মীদের প্রথম ব্যাচ মালয়েশিয়ায় যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম ধাপে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে মালয়েশিয়াকে অনুরোধ করা হয়েছে। এতে ব্যয় কমানো, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
