শনিবার, ২৫ মে ২০২৪, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

মা-শিশু স্বাস্থ্যসেবায় আরও আন্তরিক হতে হবে : প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ১৬ মে ২০২৪, ০৬:২৩ এএম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কার্যকর জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন যা টেকসই উন্নয়নের মূল উপাদান। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে তাদের জনসম্পদে রূপান্তর করতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রী গতকাল বুধবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ‘আইসিপিডি-৩০ : জনসংখ্যাগত বৈচিত্র্য ও টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক বৈশ্বিক সংলাপ’ শীর্ষক দুদিনব্যাপী ইভেন্টের উদ্বোধনী অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন।

বুলগেরিয়া, জাপান ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) সঙ্গে এ অনুষ্ঠানের আয়োজক বাংলাদেশ।

জনসংখ্যাগত লভ্যাংশের রূপান্তর একটি সমৃদ্ধ বৈশ্বিক ব্যবস্থা তৈরি করতে সক্ষম হবে উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘এ লক্ষ্য অর্জনে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বিশেষ করে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা খাতে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের পরিমাণ ও সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করার জন্য উন্নয়ন সহযোগী ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও আন্তরিক হতে হবে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই বৈশ্বিক সংলাপ সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ জাতিসংঘে অনুষ্ঠেয় ‘সামিট অব দ্য ফিউচার’-এর জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নে সহায়ক হবে। জনসংখ্যা ও উন্নয়ন বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ সামিটের ঘোষণাপত্রে দৃঢ় রাজনৈতিক প্রত্যয় ব্যক্ত করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী ফিলিস্তিনের জনগণের জন্য অপরিহার্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার আরও কার্যকর ভূমিকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘সেখানে মানুষ ইসরায়েলি আগ্রাসন ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিদিন বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছে। আমি আশা করি, জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা সেখানে সবার বিশেষ করে নারী ও শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে জনস্বাস্থ্যসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে বিশ্বের সব মানুষের বিশেষ করে মা, শিশু ও বয়স্ক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বৈশ্বিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। একইসঙ্গে সংঘাত ও রাজনৈতিক কারণে উপদ্রুত ও বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর দিকে মনোযোগ দেওয়াও অত্যন্ত জরুরি বলে আমি মনে করি।’ এ সময় তিনি রোহিঙ্গাদের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে চাই বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং ইসরায়েলের গণহত্যা ও আগ্রাসনের ফলে নিপীড়িত ফিলিস্তিনি জনগণের কথা। বিপুল সংখ্যক নারী ও শিশু ফিলিস্তিনে আজ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, ইউএনএফপির নির্বাহী পরিচালক ড. নাতালিয়া কানেম, মালদ্বীপের সামাজিক ও পরিবার উন্নয়নমন্ত্রী আইশাথ শিহাম, কিরিবাতির নারী, যুব, ক্রীড়া ও সামাজিকবিষয়কমন্ত্রী মার্টিন মোরেত্তি, জাপানের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় উপমন্ত্রী ইয়াসুশি এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. রোকেয়া সুলতানা অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন। বুলগেরিয়া সরকারের প্রতিনিধিও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

দেশের স্বাস্থ্য খাতে তার সরকারের পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, তার সরকার দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে জনসংখ্যাকে মানবসম্পদে পরিণত করতে জাতীয় জনসংখ্যা নীতিমালা-২০১২-কে আরও হালনাগাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের ফলে দেশের মানুষের গড় আয়ু ২০২৩ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ৭২ বছর ৩ মাসে পৌঁছেছিল।

প্রধানমন্ত্রী জানান, স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে তার সরকারের চালু করা কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর মাধ্যমে মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবাসহ ৩০ প্রকারের প্রয়োজনীয় ওষুধ বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে। বর্তমানে সারা দেশে সাড়ে ১৪ হাজারেরও বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে। এ ছাড়া পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীন ৩ হাজার ২৯০টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র/পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিক থেকে মা, শিশু ও বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দেওয়া হচ্ছে।

বাল্যবিবাহ, যৌতুক ও নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমাদের মেয়েদের কেবল ভুক্তভোগী হিসেবে না দেখে তাদের পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে তৈরি করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আমরা ১ হাজার ২৫৩টি ইউনিয়ন পর্যায়ের সেবাকেন্দ্রে কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা কর্নার প্রতিষ্ঠা করেছি। পাশাপাশি ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত প্রায় ৫০ লাখ কিশোরীকে বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণের উদ্যোগ গ্রহণ এবং স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের পুষ্টি চাহিদা পূরণে দেশব্যাপী ‘স্কুল মিল’ চালু করা হয়েছে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের শ্রমশক্তির ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ নারী, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।’ এবারের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে নারী প্রতিযোগীদের অংশগ্রহণ আগের সাধারণ নির্বাচনের তুলনায় ৩৮ দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি ছিল বলে জানান তিনি।

‘জলবায়ু সংক্রান্ত পদক্ষেপ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি হ্রাস করেছে’ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মানুষকে রক্ষা করতে তার সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে, যার ফলে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের দুর্দশা কমেছে।

ইউএনএফপিএর নির্বাহী পরিচালক এবং জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ড. নাতালিয়া কানেম তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।

রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার মো. নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

বৈঠকে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার, প্রজনন স্বাস্থ্য, বাল্যবিবাহ ও নারী শিক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।

ইউএনএফপিএর নির্বাহী পরিচালক বলেন, বাংলাদেশ শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে চমৎকার সাফল্য অর্জন করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

নারীশিক্ষার প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের স্কুল পরীক্ষায় মেয়ে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ও শিক্ষা কার্যক্রমে সাফল্য উভয় ক্ষেত্রেই ছেলেদের ছাড়িয়ে গেছে। সাম্প্রতিক এসএসসি পরীক্ষায় মেয়ে শিক্ষার্থীরা নম্বর ও পাসের শতাংশে ছেলেদের ছাড়িয়ে গেছে এবং এটি আমাদের মেয়েবান্ধব নীতির জন্য সম্ভব হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে তার সরকার ১৯৮১ সালে তার দেশে ফেরার পর সংগৃহীত অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মেয়েদের শিক্ষার প্রসারের জন্য নীতি প্রণয়ন করে। এ প্রসঙ্গে তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি এবং স্কুল ফিডিং কর্মসূচি প্রবর্তনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের উল্লেখ করেন।

এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. রোকেয়া সুলতানা, পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন এবং চিকিৎসা শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব আজিজুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। বাসস

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত