পরিবেশ উদ্ধারে চাই বাজেট বরাদ্দ

আপডেট : ১৭ মে ২০২৪, ০৩:০০ এএম

মেঘে মেঘে অনেক বেলা হলো। তিপান্নতে পা দেওয়া বাংলাদেশের বাজেটে প্রতিবছর যে বরাদ্দ চাওয়া হয় তার সবটার সংস্থান হয় না আর আয়ের টাকা কোথায় বণ্টিত ও ব্যয়িত হয় তার সোজাসাপটা হিসাব মেলানো ভার। বাজেট যেন ব্যবসায়ীদের দাবিদাওয়া শুল্ক, ভ্যাট ও করের হার হ্রাস, ব্যবসার খরচ কমানোর দাবি, স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষার জন্য কর ছাড় যে যার মতো শুধু দাবি জানিয়ে থাকেন। কিন্তু আমজনতা ও যারা ব্যবসায়ীদের জিনিস কিনে থাকেন, তাদের আয় রোজগার কেমন, তারা কীভাবে দিন গুজরান করেন তাদের দাবি-দাওয়া বজেটের পাতায় ঠাঁই পায় না। এমন যে যাদের যেভাবে আয় করার তাতে আয়বৈষম্য তৈরি হতে পারে আর কোটারি ও সিন্ডিকেটকে আরও মোটা তাজা করা যেতে পারে। আজকাল সংসদে পুরো বাজেট পড়া হয় না, মিডিয়াই বাজেটকে জনগণ ও সরকারের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনের কাজ করে। ফলে বাজেট বাস্তবায়নে দায়দায়িত্ব বুঝে নেওয়া যায় না। 

দেশের ৭০ ভাগের বেশি মানুষ কৃষির ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। সেই কৃষকের উৎপাদিত ফল-ফসল বাজারজাতকরণে রয়েছে একটা সিন্ডিকেটসুলভ ব্যবস্থা, মধ্যস্বত্বভোগীর টালবাহানার বাজার, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারসাজি যার নেপথ্যের নায়কদের নিয়ন্ত্রণ বা প্রতিকার প্রতিবিধানের প্রস্তাব বা ব্যবস্থা বাজেটে উচ্চারিত হয় না। কৃষক এবং তার উৎপাদিত পণ্যের ভোক্তা মানিটারি পলিসি বোঝে না। মূল্যস্ফীতি গত আড়াই বছর বাংলাদেশ অর্থনীতির অন্যতম সমস্যা হিসেবে বিরাজ করছে। এটি যে অর্থনীতির রেজিলিয়েন্ট পাওয়ারকে ক্ষয় করে দিচ্ছে তার স্বীকৃতি বা স্বীকারোক্তি মানিটারি পলিসিতে থাকে না। ব্যবসায়ীরা ভ্যাট বা শুল্ক কমানোর দাবি তুলছে কাদের জন্য? ভ্যাট কমানোর ফলে দ্রব্যমূল্যের ওপর সরাসরি ইতিবাচক না হোক স্বস্তিদায়ক সুফল কি পড়ছে? এখানে মধ্যস্বত্বভোগীদের পোয়াবারোর পথ দেখানো হয়। প্রতীয়মান আয়বৈষম্য সৃষ্টি উদ্যোক্তার কুশীলবরাই মানিটারি পলিসি প্রণয়নে প্রম্পট করছে। 

সামাজিক নিরাপত্তা বলয় বাড়ানোর নামে অসহায় ও দুস্থদের তালিকা বড় হচ্ছে, কিন্তু সে তুলনায় সাহায্যের পরিমাণ বাড়ানোর পথ থাকছে না, যৌক্তিকতা খাটছে না। সাহায্য প্রার্থীদের তালিকাকরণ, বণ্টন ও সুপারিশে পলিটিক্স ঢুকে গেছে, গেড়ে বসে আছে নানান দুর্নীতি। এটা কারও উপলব্ধিতে আসছে না যে, অসহায়কে যৎসামান্য সাহায্য দিয়ে তাদের দুস্থই রাখা হচ্ছে। তাদের স্বাবলম্বী, কর্মক্ষম করে তোলা, কর্মে নিয়োগের পদক্ষেপের বিষয়ে যৎসামান্য অর্থ বণ্টনের বাজেটে চালান বা দেখানো হয়ে থাকে। এই দুস্থদের পরিবারের সক্ষম সদস্যদের চাকরির ব্যবসা কিংবা নিদেনপক্ষে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি দিলেও তাদের একটা হিল্যা হয়।

ধনী-দরিদ্র সবাইকে বিনামূল্যে বই দিয়ে তাদের মূল্যবান গাইডবই কিনতে বাধ্য করা হয়। অন্যদিকে শিক্ষককে ক্লাসে পড়ানোর জন্য শতভাগ সরকারি বেতন প্রদানের পর সেই শিক্ষকরা বিকেলে আলাদা ক্লাস/কোচিং করানোর নামে ট্যাক্সপেয়ারের ডবল পকেট কাটছে। এদের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালনের কোনো পদক্ষেপ বা কড়া উচ্চারণ বাজেটে নেই। আমজনতার চিকিৎসা ব্যয় বেড়েই চলেছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সুশাসন সংস্থাপিত হলে বিদেশে ডলার ব্যয় করতে যেতে হয় না। ডলার আয় বা সাশ্রয়ের কোসেসে এই সহজ স্বতঃসিদ্ধ উপায়টি অর্থবহ করে তোলার কর্মপরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো প্রতিশ্রুতি বাজেটে থাকে না। বাজেটে দরিদ্র কৃষকের আশ্রয়ণ, বাসস্থান, কেমিক্যাল সার ও সেচের পানির জন্য বিদ্যুতের সাবসিডি দেওয়ার প্রশ্নটি আইএমএফের শর্তকে সাক্ষী মেনে কমানো-বাড়ানো প্রকারান্তরে সমস্যাকে প্রলম্বিত করার নামান্তর। উপলব্ধির উপায়কে শানিত করতে আর সময় নেওয়া সমীচীন হবে না।      

মানুষ কেন সার্বিক (আর্থিক, ক্রয়ক্ষমতা, পুষ্টিকর খাদ্য, স্বাস্থ্য শিক্ষা, চিন্তাচেতনার) দারিদ্র্যসীমা থেকে বের হতে পারছে না? কেন কৃষক জমি চাষে খাল-বিলের প্রাকৃতিক পানি পাচ্ছে না, কেন রাসায়নিক সার ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছে, ফরমালিনসহ নানান নাশক মিশিয়ে নিজের জন্যই স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে, কেন তার স্থাবর সম্পত্তি বছর বছর অকাল বন্যা-ঘূর্ণিঝড়-প্রাকৃতিক দুর্যোগে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে? কিছু দিন পর পর কেমিক্যালের আগুনে মানুষ পুড়ে অঙ্গার হচ্ছে। এসবই প্রাণ-পরিবেশের প্রতি আমাদের বিরূপ আচরণের ফল। পরিবেশের বিরূপ আচরণের শিকার হওয়ার পথ থেকে দেশ সমাজ ও অর্থনীতিকে বাঁচানোর জন্য, ফেরানোর জন্য, অবিলম্বে প্রকৃতিবান্ধব কার্যক্রম কর্মসূচি প্রয়োজন। তিপান্ন বছরের বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক নদীর উজানের পানি আটকানোয় ভাটিতে তার সকরুণ পরিস্থিতি পদক্ষেপের শিকার হয়ে। নদ-নদীবিধৌত বাংলাদেশের প্রকৃতি, নিঃসর্গ, জীবনের মূল্যবোধ সবই খাল-নদী-বিলের সুস্থ সাবলীল গতিধারার ওপর নির্ভরশীল। নদীমাতৃক বাংলাদেশের পরিকল্পনা প্রণেতার খাল-বিল-নদী পথের সহজ যোগাযোগকে পঙ্গু করতেই সড়ক ও সেতু বানানোর কাজে এতটাই ঝুঁকে পড়েছেন যে, আমরা হয়ে উঠছি এশিয়ায় রেডি ডেনসিটিতেও মডেল। সড়ক যাত্রায় মানুষ সময় বাঁচাতে গিয়ে যত্রতত্র দুর্ঘটনায় দৈনিক ৫০-৬০ জন মৃত্যুবরণ করছে। পঙ্গুত্ব বরণ করে কর্ম অক্ষম হয়ে পড়ছে। সেই সড়কে পুড়ছে মহার্ঘ মূল্যের জ¦ালানি, বাতাসে ছড়াচ্ছে সিসা, জলবায়ুর উষ্ণতা বাড়িয়ে অভাবিত পূর্ব দুর্য়োগের সামনে দাঁড় করাচ্ছে গোটা দেশ ও সমাজকে।

বাংলাদেশের পুরো উত্তর ও মধ্যবঙ্গ মরুভূমির আবহাওয়ায় কেন? প্রধান প্রধান নদীগুলো নাব্য হারাচ্ছে, শাখা নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে, খাল-বিল নিঃশেষ হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নদীর পানি উজানে আটকিয়ে কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অংশে নানান দুর্ভোগের কারণ সৃষ্টি হয়েছে বা হচ্ছে। তিস্তা পানির প্রবাহ বহু বছর ধরে থেমে আছে। উত্তর-পূর্ববঙ্গে বড় বড় বন্যা অসম পানি বণ্টন প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট। বাংলাদেশের ফেনী নদীর পানি প্রতিবেশীর সাবরুম শহরের জন্য স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্রদানের মহানুবতা ও সম্পর্ক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার স্বপ্নের স্বীকৃতি এবং প্রতিদান অবশ্যই বাংলাদেশ প্রত্যাশা করতে পারে। বাংলাদেশের কৃষি ও প্রকৃতির প্রতি হুমকিগুলোকে বাজেটে চিহ্নিত করে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে বোঝাপড়ার পথনকশা ও অগ্রগতি বাজেটে গোপন করার অবকাশ নেই। গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি ঢালার নীতি থেকে বেরিয়ে আসা এখন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে খ্যাত সুন্দরবনে এখন আগুন লাগা শুরু হয়েছে। সেখানে জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন। বহু বছর ধরে ওপরের নদী থেকে মিষ্টি পানি আসার তীব্রতা কমে যাওয়ায় সুন্দরবনের নদীতে লবণাক্ত পানি উত্তর দিকে এগিয়ে আসার খেসারত দিতে হচ্ছে। সুন্দরবন সংলগ্ন অঞ্চলের মৈত্রী বিদুৎকেন্দ্রের বিমাতাসুলভ আচরণ দেখার আর কত বাকি? 

তিপান্ন বছরের মাথায় এসে পরিবেশবান্ধব বাজেটের দাবি অগ্রগণ্য হয়ে উঠছে। উন্নয়ন বাজেটে সড়ক ও সেতু নির্মাণের বরাদ্দ দিয়ে, খাল, নদী, বিল ধ্বংস হতে দিয়ে, আন্তর্জাতিক নদীর ন্যায্য পানির হিস্যা না আদায় করে নদীর অববাহিকাকে বিধবার বেশ ধারণ করতে দিয়ে নিজেদের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিরূপ পরিবেশ রেখে যাওয়ার মানে হয় না।

প্রকৃতির প্রতি বিরূপ আচরণ ঠেকাবার পদক্ষেপ বাজেটে উচ্চারিত হতে হবে। সমাধান হয়তো এক বছরের বাজেটে হবে না। প্রকৃতির বিরূপ আচরণ একদিনের সৃষ্টি যেমন নয় একে মোকাবিলা ও ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার প্রক্রিয়াও এক-দুদিনের কাজ নয়। পর্যায়ক্রমে পরিবেশ উন্নত করার পদক্ষেপ এখনই শুরু করা দরকার। ১৯৭২ সালে সপ্তাহের জন্য পরীক্ষমূলক চালুর পর ফারাক্কা পানি বণ্টন চুক্তিতে সম্মত হতে সময় লেগেছে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত যখন ফারাক্কার প্রবাহযোগ্য পানি তলানিতে। পানি থাকলে না তার বণ্টন চুক্তিতে আশ্বস্ত হওয়া যায়। ১৯৯৬ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশ বছর বছর কত কিউসেক পরিমাণ পানি পেয়েছে? বর্ষাকালে ফারাক্কার সব গেট খুলে দিয়ে ভরাট হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের নদীতে উপচে পড়া বন্যা কতবার হয়েছে? এসব তথ্য যাচাই এবং সবাইকে জানানোর জন্যও বাজেটে বরাদ্দ প্রয়োজন। সুন্দরবনের আগুন, বড় বড় নদী, খাল ও বিল বিনষ্ট হওয়ার শুমার প্রয়োজন। পারস্পরিক দোষারোপ করার জন্য নয়, এ শুমার বা স্টাডি কীভাবে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দিকে এগোনো যাবে তার পথনকশা নির্মাণের জন্য। পরিবেশ দূষণের ব্যাপারে বাংলাদেশকে অবশ্যই আত্মসচেতন হতে হবে। মার্কিন ভাষাতাত্ত্বিক ও সুশীল সমাজনেতা নোয়াম চমস্কি করোনা মহামারীর সময় বলেছিলেন করোনার পর মানবজাতির জন্য অপেক্ষা করছে

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ুর উষ্ণতা সৃষ্ট সমস্যার পাহাড়। এর ভয়াবহতা এত ব্যাপক যে, তথাকথিত অবকাঠামোর উন্নয়ন ভোগ করার সময় ও সুযোগ মিলবে না।

মগবাজার থেকে যে ফ্লাইওভার উত্তর দিকে গিয়েছে তার পিলারে রঙচঙ করে উপদেশ বিলানো হচ্ছে রাস্তার ফুটপাতে বা মাঝখানে যেসব গাছ ছিল সেগুলো সাবাড় করে দিয়ে তৈরি ওই পিলারের গায়ে লেখা হচ্ছে গাছ লাগান পরিবেশ বাঁচান। এসব স্ববিরোধী ও আত্মপ্রবঞ্চনামূলক পদক্ষেপ রহিতকরণের জন্যও বাজেটে বরাদ্দ প্রয়োজন।

লেখক: কলাম লেখক উন্নয়ন অর্থনীতি বিশ্লেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত