টাকা ধার দিয়ে ব্যাংক খাতের তারল্য-সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। নানা অনিয়ম ও খেলাপির কারণে তারল্য-সংকটে হিমশিম খাচ্ছে ব্যাংকগুলো। এ নিয়ে ব্যবসায়ীরাও অভিযোগ করেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বারবার নীতি পরিবর্তনের কারণে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। গত রবিবার নিলামে ৪২টি ব্যাংক ও ৪টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) রেপো ও তারল্য সুবিধার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ১৭ হাজার ৯২ কোটি ৪ লাখ টাকা ধার নিয়েছে। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, গত রবিবার বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক রেপো এবং অ্যাসিউরড লিকুইডিটি সাপোর্ট ফ্যাসিলিটির (এএলএসএফ) নিলাম হয়। ওই নিলামে এক দিন ও সাত দিন মেয়াদি রেপো সুবিধার আওতায় ২৬টি ব্যাংক ও ৪ এনবিএফআই মোট ৯ হাজার ২৩২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে। এ ছাড়া এক দিন মেয়াদি এএলএসএফের আওতায় ১৬টি পিডি ব্যাংক মোট ৭ হাজার ৮৫৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকার টাকার ঋণ পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে। এক দিন ও সাত দিন মেয়াদি রেপো এবং এএলএসএফের সুদের হার ছিল যথাক্রমে ৮ দশমিক ৫, ৮ দশমিক ৬ ও ৮ দশমিক ৫ শতাংশ।
সাম্প্রতিককালে ১৫ মে ৩৬টি ব্যাংক ও ১টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ১৩ হাজার ৮৫ কোটি টাকা ধার দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগের দিন ১৪ মে তিন শরিয়াহ ব্যাংকসহ ৪১ ব্যাংক ও ৪ আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ১৩ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা ধার দেওয়া হয়।
এর আগে ব্যাংকগুলো রেকর্ড পরিমাণ টাকা ধার নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে। মার্চে এক দিনে ৩২ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা ধার নেওয়ার রেকর্ড রয়েছে সম্প্রতি। তারও আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এক দিনে সর্বোচ্চ ২৪ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা ধারের রেকর্ড ছিল গত ২৭ ফেব্রুয়ারি।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, সরকারি ট্রেজারি বিলের ক্রমবর্ধমান সুদের হার ও নীতি হার বৃদ্ধির কারণে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে তারল্য-সংকট তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো ব্যাংক এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তারল্য সহায়তা নিয়ে ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ করছে। কারণ ট্রেজারি বিলের সুদহার ১১ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, তারল্য-সংকটের মধ্যে ব্যাংকগুলো কয়েক মাস ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তারল্য সহায়তা পাচ্ছে। আগামী জুলাই থেকে রেপোর মাধ্যমে তারল্য সহায়তা প্রতিদিনের পরিবর্তে সাপ্তাহিক হবে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, একীভূতকরণ আতঙ্ক ও আস্থার সংকটে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো থেকে আমানত তুলে নেওয়া হচ্ছে। আবার উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণেও আমানত ভাঙার প্রবণতা বেড়েছে। একই কারণে কমে গেছে নতুন আমানত আসাও। এতে সার্বিক ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি তারল্য-সংকটে নাজুক অবস্থা দেখা যাচ্ছে শরিয়াহভিত্তিক আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকে। প্রায় দুই মাস ধরে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকে নগদ টাকার সংকট রয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন নানা শ্রেণিপেশার গ্রাহক। অনেকেই চিকিৎসাসহ জরুরি প্রয়োজনে টাকা তুলতে গিয়েও ফিরছেন হতাশ হয়ে। ক্যাশ টাকা না থাকায় চাহিদানুযায়ী সেবা দিতে পারছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা।
এ ছাড়া বেসরকারি খাতের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হওয়া পদ্মা ব্যাংক গ্রাহকের টাকা দিচ্ছে কিস্তিতে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পদ্মা ব্যাংকের একটি শাখার ম্যানেজার বলেন, মার্জারের ঘোষণার পর থেকে গ্রাহকরা প্রচুর টাকা তোলেন। যদিও গ্রাহক টাকা তুলতে এলে ফেরত যাচ্ছেন না। ছোট পরিমাণ যাদের, তাদের দিয়ে দিচ্ছি। তবে যাদের চাহিদা বেশি তার অর্ধেক বা তার চেয়ে কম করে দিচ্ছি।’ একীভূত হওয়ার খবরের শুরুতে টাকা তোলার এই চাপটা বেশি ছিল। এখন তা কিছুটা কমে গেছে। তবে ব্যাংকটির গ্রামপর্যায়ের বিভিন্ন শাখায় টাকা দিতে সমস্যা হচ্ছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
এ ছাড়া বেসরকারি সিটি ব্যাংকের সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের একীভূত হওয়ার খবরে ব্যাংকটি থেকে ইতিমধ্যে অনেকে আমানত তুলে নিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে বেসিক ব্যাংকও চরম তারল্য-সংকটে পড়ে। এর বাইরে একীভূতকরণ আতঙ্কে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) থেকেও আমানত তুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
অপরদিকে ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ব্যাংক কী কী কাজ করে, সে বিষয়ে জানতে চেয়েছে ঢাকায় অবস্থানরত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধিদল। এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রেপোর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে ধার দেওয়ার বিষয়ে জানানো হলে কেন এ ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়, সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে এই পদ্ধতি বন্ধের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
