শরীয়তপুর সদর উপজেলা পরিষদের নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় অন্তত ৮ জন আহত হয়েছে। ভাঙচুর করা হয়েছে দোকানপাটসহ অর্ধশতাধিক বাড়িঘর। গতকাল মঙ্গলবার রাতে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর উপজেলার তুলাসার ইউনিয়নের মৃধাকান্দি, বাইশরশি, দক্ষিণ গোয়ালদি এলাকাসহ আড়িগাঁও বাজারে বর্তমান ও সাবেক চেয়ারম্যানের সমর্থকদের মধ্যে ভাইস-চেয়ারম্যানের জয়-পরাজয় নিয়ে দফায় দফায় এসব পাল্টাপাল্টি হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
আহত ব্যক্তিরা হলেন নাজমুল শিকদার (৩২), শাহ জালাল খান (৩৫), তারা মল্লিক (২৫), মনির মাদবর (২৮), আকতার সরদার (৩৭), আবুল হাশেম ফকির (৫৫), আক্তার বেপারী (৪২) ও আতাউর বেপারী (৪২)। তাদের শরীয়তপুর সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনার পর থেকে তুলাসার ইউনিয়নে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল ফল প্রকাশের পর চশমা প্রতীকের ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী ইকবাল হোসেন রতন পরাজিত হন। আর তালা প্রতীকের ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী শাখাওয়াত হোসেন হাওলাদার বিজয়ী হন। ইকবাল হোসেন রতনের সমর্থক তুলাসার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জামাল ফকির, সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ টিপুর সঙ্গে শাখাওয়াত হোসেন হাওলাদারের সমর্থক ওই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জাহিদ ফকিরের লোকজনের মধ্যে তর্কের জেরে দেশীয় অস্ত্র ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়।
রাতভর দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি হামলা আহত হয় ৮ জন। ভাঙচুর করা হয় সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য রোজিনা আক্তারের ঘর, সারের গোডাউন, অটোগ্রেস, পাঁচটি দোকান এবং ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী রতনের কয়েকটি দোকানসহ আড়িগাঁও বাজারের বেশ কয়েকটি দোকান। এছাড়া বাদশা ফকির, সোনা মিয়া ফকির, রিপন ফকির, জাব্বার ফকির, রাজ্জাক মোড়ল, অলিল সরদার, ফজলু ফকির, শাহজাহান সরদার, সিরাজ সরদার, আলমগীর সরদার, মফিজ ছৈয়ালের বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়।
তুলাসার ইউনিয়ন পরিষদের ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য রোজিনা আক্তার বলেন, ‘জামাল ফকির ও জাহিদ ফকিরের লোকজনের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। এই সুযোগে হামলাকারীরা আমার ঘরের থাই, চানালা, দরজা, সারের গোডাউন, অটোগ্রেস ভাঙচুর করা হয়েছে। পাশাপাশি আমার পাঁচটি দোকান ভাঙচুর করে টাকা ও মালামাল নিয়ে যায়।’
নুর হোসেন ফকির বলেন, ‘আমি চেয়ারম্যান জামাল ফকিরের লোক। আমাদের বলছিল তালায় ভোট দিতে, আমি ভোট দেইনি। এ কারণে রাত সাড়ে ১২টার দিকে আমাদের বাড়িঘর কুপিয়ে ভাঙচুর করেছে। আমরা পরিবার নিয়ে ভয়ে আছি। এই হামলার বিচার দাবি করছি।’
তুলাসার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান জাহিদ ফকির অভিযোগ করে বলেন, ‘চেয়ারম্যান জামাল এবং বিএনপির নেতা টিপু দুজনে মিলে চশমা প্রতীকে নির্বাচন করে। আমার লোকজন চশমায় ভোট দেয়নি। তালা প্রতীকে ভোট দিয়েছে। তাই আমার লোকজনের বাড়িতে হামলা চালিয়েছে জামাল ও টিপুর লোকজন। আমার তিনজন লোক আহত হয়েছে। আমরা তুলাসারবাসী এখন আতঙ্কে আছি। আমরা মামলা করব।’
তুলাসার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) বর্তমান চেয়ারম্যান জামাল ফকির বলেন, ‘ঘোড়া প্রতীকের চেয়ারম্যান বিজয়ী হওয়ার পর আমরা বাইশরশি থেকে একটি বিজয় মিছিল বের করি। আড়িগাঁও বাজার আসলে জাহিদ ফকিরের লোকজন আমার লোকজনদের মারধর করে আহত করে। পরে বিভিন্ন এলাকার থেকে লোকজন এনে গভীর রাতে আমার লোকজনের ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও দোকানঘর লুটপাট করেছে। তবে চশমা প্রতীকে ভোট কম পেয়েছে এমন কোনো বিষয় নিয়ে হামলা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি। এটা মিথ্যা ও বানোয়াট।’
এদিকে সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ টিপু বলেন, ‘রাত ৯টার পর শুনি তুলাসার ইউনিয়নের রঙের বাজার এলাকায় জাহিদ ফকির ও জামাল ফকিরের লোকজন মারামারি করছে। রাত ১২টার পরে জাহিদ ফকিরের নেতৃত্বে লোকজন ককটেল ফাটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে আমার বাড়ি ঘেরাও করে। তারা আমার কয়েকজনকে মারধর করে আহত করে। পরে স্থানীয় লোকজন তাদের প্রতিরোধ করে। জাহিদ ফকিরের বাড়ি আর আমার বাড়ি চার কিলোমিটার দূরে। রাতে আমাদের বাড়িতে হামলা করবে এর উদ্দেশ্য কি? আমি এর প্রতিবাদ জানাই।’
শরীয়তপুরের পুলিশ সুপার মাহবুবুল আলম বলেন, ‘সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ফলাফলের পর তুলাসার ইউনিয়নে দুটি পক্ষ মুখোমুখি হয়। খবর পেয়ে ৪/৫ টি মোবাইল টিম ঘটনাস্থলে পাঠিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি। যে তথ্য পেয়েছি বাড়িঘর ও কিছু দোকানের সাটার ভাঙচুর করা হয়েছে। সারারাত পুলিশ অপারেশন করেছে। যেহেতু একটা ঘটনা ঘটেছে, ওই এলাকায় পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন আছে। পুরো এলাকা আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। আমরা এখনো কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেব।’
